একা থাকলে আবার এই সূক্ষ্ম নাচটা ভেঙে পড়ে। দর্শক নেই কোনো। তোমার অভিনয়কে ধরে রাখার মতো বাহ্যিক কোনো তাল নেই। কেউ নেই তোমাকে আশ্বস্ত করার যে, তুমি ঠিক আছ। কেউ নেই মুগ্ধ করার, কেউ নেই বোঝানোর। কেউ নেই, যে তোমার দিকে তাকিয়ে তোমাকে একটা সাময়িক স্বস্তির অনুভূতি ফিরিয়ে দেবে। মুখোশ সবসময় নাটকীয়ভাবে খসে পড়ে না, সিনেমার মতো নয় ব্যাপারটা। কখনো কখনো মুখোশ শুধু অকেজো হয়ে যায়, কারণ পরে রাখার কোনো কারণ থাকে না। আর তখন তার নিচ থেকে যা বেরোয়, তা অচেনা লাগে, অস্বস্তি হয়। থাকে শুধু তোমার নিজের শ্বাসের শব্দ। থাকে চিন্তার সেই ভেতরমুখী স্রোত, যা দিনের বেলা শব্দের তলায় চাপা থাকে। থাকে এখানে থাকার অনুভূতি, সাজসজ্জা ছাড়া, অলংকার ছাড়া, ভূমিকা ছাড়া। শুধু তোমার অস্তিত্বের সত্যটা, যা ভেতরের দিকে চাপ দেয়। আর তা বিশাল মনে হতে পারে, ভয়ংকর রকমের বিশাল।
এখান থেকেই আসল যাত্রা শুরু। জনসমক্ষে বড়ো বড়ো কথায় নয়। বই থেকে ধার-করা জ্ঞানে নয়। সত্য নিয়ে সুন্দর ভাষণে নয়। বরং সেই উন্মুক্ত ঘরে, যেখানে তুমি ছাড়া কেউ নেই, আর আছে শুধু সেই অবশিষ্ট, যা অভিনয়ের পর্দা নামলে মঞ্চে পড়ে থাকে। প্রথমদিকে এটা প্রায় অসহ্য লাগতে পারে। নীরবতা যেন খুব জোরে বাজছে, যেমন কানে তালা লাগার পর একটা ভোঁ শব্দ থাকে, তেমন। স্থিরতা যেন খুব প্রশস্ত, কোনায় কোনায় অন্ধকার। ঘরটা ভরা মনে হতে পারে এমন সব জিনিসে, যেগুলি তুমি শুনতে চাওনি কোনোদিন। চিন্তা ঘুরতে শুরু করে, একটার পেছনে আরেকটা, সারি বেঁধে, দরজা বন্ধ না করলে ঢুকতেই থাকবে। পুরোনো শোক নড়ে ওঠে, যেমন ভূমিকম্পের পর দেয়ালে চিড় ধরে, তেমনভাবে, আস্তে আস্তে কিন্তু অনিবার্যভাবে। ভুলে-যাওয়া ব্যথাগুলি উঠে আসে সেসব জায়গা থেকে, যেখানে বছরের পর বছর আগে তুমি সেগুলি জমা রেখে দিয়েছিলে, তারপর সেগুলোকে আর কখনো স্পর্শ না করার জন্য তার ওপরেই একটা গোটা জীবন দাঁড় করিয়ে ফেলেছিলে। তুমি হঠাৎ লক্ষ করো, তোমার দক্ষতার তলদেশে বিষণ্নতা আছে। তোমার উজ্জ্বলতার তলায় একটা ক্লান্তি আছে, যা ঘুমোলেও সারে না। তোমার কত হাসিই ছিল আসলে টিকে থাকার কৌশল, না হাসলে পাছে কেউ জিজ্ঞেস করে বসে, কী হয়েছে, আর সেই প্রশ্নের উত্তর দেবার শক্তিই তো ছিল না তোমার। তোমার কত ব্যস্ততাই ছিল আসলে নিজের কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা, যত দ্রুত দৌড়োবে, ভেতরের গলাটা তত কম শোনা যাবে।
নির্জনতায় তোমার বুকের ভেতরের সেই নিশ্চুপ ফাটল থেকে তোমাকে সরিয়ে দেবার কেউ নেই। টানটান উত্তেজনাটা শুষে নেবার কেউ নেই। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক চালিয়ে-যেতে-পারা তোমার সেই সংস্করণ, যে ভেতরে থেকে নিজের জীবনটাকে ছুঁয়েও দেখে না, তাকে দেখে তালি দেবার কেউ নেই। এখানে কাউকে প্রভাবিত করার দায় নেই। কাউকে ব্যাখ্যা দেবার নেই। কাউকে সুস্থ হয়ে ওঠার নাটক দেখানোর নেই। থাকে শুধু ভেতরের আবহাওয়া, কখনো ঝড়, কখনো শূন্য মাঠ, কখনো ভেজা মাটির গন্ধ। থাকে পোশাকহীন আত্মা। থাকে সাজসজ্জাহীন অস্তিত্বের ঘর, যেখানে আসবাবপত্র কম, কিন্তু প্রতিটি জিনিস সত্যি।
আর আমরা যেহেতু নিজেদের কাছ থেকে পালাতে এত পাকা, তাই এই ঘরের সাথে প্রথম দেখাটা আগুনে হাত দেবার মতো লাগতে পারে। আমরা ব্যথা থেকে সরে আসতে খুবই দক্ষ, আমাদের এই দক্ষতা প্রায় শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আমরা জানি, কীভাবে ফোনে হাত বাড়াতে হয় ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন বুকে কিছু-একটা চাপ দেয়। জানি, কীভাবে কাজে, পরিকল্পনায়, উচ্চাশায়, সম্পর্কে, আড্ডায় আর কোলাহলের দিকে পালাতে হয়। জানি, কীভাবে ব্যস্ত থাকতে হয়, এতটাই ব্যস্ত যে, হৃদয় স্পষ্ট করে কিছু বলার সুযোগই পায় না। জানি, কীভাবে ব্যস্ততাকে জীবন্ত থাকার সমার্থক বানিয়ে ফেলতে হয়, উত্তেজনাকে অর্থ বলে চালিয়ে দিতে হয়। যা আমরা প্রায়ই জানি না, তা হলো, কিছুই করার নেই, শুধু সাক্ষী হয়ে থাকো, আর দেখো, এই অবস্থায় কীভাবে টিকে থাকতে হয়। কীভাবে স্থিরতায় বসে থাকতে হয় তাকে শূন্যতা না বলে। কীভাবে যা ওঠে, তাকে সঙ্গে সঙ্গে চেপে না দিয়ে, ভোঁতা না করে, অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে না দিয়ে, শুধু অনুভব করতে হয়।
যদি সহ্য করে থেকে যাও, কিছু-একটা ঘটে। ধীরে ধীরে, প্রায় টের পাওয়া যায় না, এমনভাবে। চিন্তার ঘূর্ণিটা তার জোর খানিক হারায়, থামে না, কিন্তু গতি কমে। নীরবতায় প্রথম যে-আতঙ্ক উঠেছিল, তার প্রান্তগুলি একটু নরম হয়, কোনাগুলি গোল হতে শুরু করে। পালিয়ে যাবার তাড়না একলাফে মিলিয়ে যায় না, কিন্তু তাকে আর আগের মতো প্রশ্নহীনভাবে মানা হয় না; একটু থামো, একটু দেখো, সত্যিই কি পালাতে হবে? হৃদয়ের চারপাশে যে-বর্ম ছিল, তা একটু আলগা হয়। নিজেকে তুমি যে-গল্পগুলি বার বার বলে এসেছ, তুমি কে, তোমার কী নেই, কোনটা আর ঠিক হবে না, অন্যরা তোমার সাথে কী করেছে, তুমি কী হতে পারতে কিন্তু হওনি, সেগুলি ধীরে ধীরে নিজেদের চেহারা দেখায়: ওসব স্রেফ গল্প, আসল সত্তা নয়। ওরা এখনও কষ্ট দিতে পারে, এখনও গুরুত্বপূর্ণ ঠেকতে পারে। কিন্তু ওরা আর সমগ্র আকাশ নয়, একটু মেঘ, যা যায় আসে।
তখন যা পড়ে থাকে, তা মসৃণ নয়, কারও সামনে তুলে ধরার মতোও নয়। কাঁচা, অসম্পূর্ণ, এলোমেলো, কিন্তু অদ্ভুতভাবে জীবন্ত। তোমার সেই অংশ, অভিনয়ের জগতে কোনোদিন ঠাঁই যার হয়নি। যে ভান করতে জানে না, যে হাসতে পারে না, যখন ভেতরে জমে ওঠে কান্না, যে চুপ থাকে, যখন সবাই কথা বলছে, কারণ তার বলার মতো কিছু নেই, মানে সত্যিই নেই, জোর করে বানাতেও সে পারে না। ভঙ্গুর, হ্যাঁ, কিন্তু সত্যও। আর এই কাঁচা সত্তার মধ্যেই টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে-পড়া তুমি আবার একটু একটু করে একজায়গায় আসতে শুরু করো। সব ব্যথা সেরে যায় বলে নয়, বরং তুমি আর নিজের গভীর থেকে নির্বাসিত নও বলে। সেই গহিন নির্জন পথ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ছিল না। জীবনের কাছেই ফিরিয়ে দেবার জন্য ছিল। কারণ নিজেকেই যদি লুকিয়ে রাখো, তাহলে অন্য একজন মানুষের সাথে সত্যিকারের দেখা হবে কী করে? নিজের হৃদয়ের সামনে দাঁড়াতে যদি অস্বীকার করো, তাহলে সৎভাবে ভালোবাসবে কীভাবে? নিজের আদি-সত্তার সাথে উপস্থিত থাকতে না পারলে, আরেকজনের সামনে উপস্থিত হবে কী দিয়ে?
নির্জনতা তখন সেই কক্ষ হয়ে ওঠে, যেখানে ছড়িয়ে-পড়া অংশগুলি একে একে ফেরে। সেখানে তুমি ক্ষমা করতে শুরু করো, ওরকম কোনো মেকি অর্থে নয়, যেখানে তুমি ঘোষণা দিচ্ছ, সব ঠিক হয়ে গেছে, বরং গভীর অর্থে, যেখানে তুমি নিজেকে আর ছেড়ে যাচ্ছ না। সেইসব সত্তার প্রতি একটু কোমল হতে শুরু করো, যাদের একদিন তুমি নিজেই প্রত্যাখ্যান করেছিলে—সেই ভয়-পাওয়া বাচ্চাটিকে, সেই রাগী কিশোরটিকে, সেই হতাশ তরুণটিকে। বুঝতে শুরু করো, তুমি তোমার ক্ষত নও, যদিও ওগুলি তোমাকে গড়ে দিয়েছে। তোমার অতীত নও, যদিও সে তোমার গায়ে দাগ রেখে গেছে। তোমার ব্যর্থতা নও, যদিও সেগুলি থেকে শিখেছ। এমনকি শুধু তোমার সুস্থ হওয়ার গল্পও নও, যদিও তা গুরুত্বপূর্ণ। তুমি সেই সাক্ষী, যে এসব ঋতু দেখেছে, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত, সব এসেছে গেছে তোমার ভেতর দিয়ে, আর তুমি রয়ে গেছ।
এই চেতনা চুপচাপ। পৃথিবীর হট্টগোলের সাথে পাল্লা দেয় না। কোনো মহান দাবি নিয়ে নিজেকে পরিচয় করায় না, "আমি তোমার আত্মা, আমি তোমার সারসত্তা", এরকম কিছুই বলে না। চুপচাপ থাকে, প্রতিরোধ, বিভ্রান্তি, মনোযোগের অবিরাম বাহিরমুখী ছোটাছুটি, এসবের তলায় সে চুপচাপ। অপেক্ষা করে যতক্ষণ না তুমি নিজের সঙ্গকে বোঝা ভাবা বন্ধ করে পবিত্র আশ্রয় হিসেবে দেখতে শুরু করো। আর যখন তুমি সেটা করো, যখন বর্তমান মুহূর্তের সাথে লড়াই করা থামাও, যখন নিজের উপস্থিতির সত্যকে ঠেলে সরানো বন্ধ করো, তখন কিছু-একটা ওঠে। ভোরের মতো ওঠে, জোর করে না, অনিবার্যতায়। আলো ছড়ায়। শ্বাস গভীর হয়। রাতের যে-আধিপত্য ছিল, সেটা শিথিল হতে শুরু করে।
যুগে যুগে মানুষ এই কারণেই মরুভূমিতে গেছে, গেছে অরণ্যে, গুহায়, পাহাড়ে, নির্জন আশ্রমে। তারা জীবন থেকে পালাচ্ছিল না। জীবনের অতিরিক্ত শব্দ বাদ দিয়ে তার মধ্যে ঢুকছিল। ভ্রমের স্তর খসাচ্ছিল। 'কেউ একজন' হয়ে থাকার চাপের বাইরে গিয়ে সেই জায়গায় ঢুকছিল, যেখানে 'শুধু থাকা' আবার অনুভব করা যায়। একাকিত্ব শূন্যতা নয়, পূর্ণতা। বিশৃঙ্খলা বাদ দিলে যে-স্বচ্ছতা থাকে, তা। বাহুল্য সরিয়ে দিলে যে-সংযোগ পড়ে থাকে, তা। এখানেই অন্তর্দৃষ্টি তর্কের মধ্যে নয়, নীরবতার মধ্যে নিজেকে জড়ো করে। এখানেই পবিত্রতা বজ্রপাত ছাড়া কথা বলে। প্রজ্ঞা তথ্য হিসেবে নয়, স্বীকৃতি হিসেবে আবির্ভূত হয়, মনে হয়, আরে, এ তো আমি জানতাম, শুধু ভুলে গিয়েছিলাম।
সব নাম ঝরে গেলে: দুই
লেখাটি শেয়ার করুন