দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

সব নাম ঝরে গেলে: তিন



সেই নীরবতার মধ্যে আশ্চর্য একটা জিনিস ঘটে। আত্মাকে শুনতে শুরু করো, শব্দে নয়, একটা জানায়। নির্দেশ হিসেবে নয়, ভেতরমুখী একটা দিকনির্দেশ হিসেবে, যেমন পাখি জানে, কোনদিকে দক্ষিণ, ঠিক তেমন, ব্যাখ্যা ছাড়া। একধরনের অনুভব যে, তোমার মধ্যে যা সবচেয়ে সত্য, তা হারায়নি, শুধু স্তব্ধ হয়ে ছিল, শব্দের তলায় চাপা ছিল, ভয়ের তলায়, আর যথেষ্টক্ষণ স্থির না থাকার অভ্যেসের তলায়। আর হয়তো জীবনে এই প্রথম তুমি অনুভব করো, শুধু থাকাটাই যথেষ্ট হতে পারে। এমন নয় যে, উচ্চাশা খারাপ, বা পরিশ্রম মূল্যহীন। বরং বলা হচ্ছে, তোমার বেঁচে থাকার অধিকার তোমার উৎপাদনশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে নয়। প্রতি ঘণ্টায় নিজের দাম প্রমাণ করতে হবে না তোমাকে। শ্বাস নেওয়ার অধিকার উপার্জন করতে হবে না। শুধু আছ, এটুকু সত্যই যথেষ্ট। তুমি কিছু অর্জন করার আগেই তোমার জীবিত থাকার মধ্যে একটা মর্যাদা নিহিত আছে, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।

তবু অন্তরের পথ, যদি তুমি সত্যিই ওতে হাঁটতে থাকো, বেশিদিন কোমল থাকে না। মায়ের কোলের মতো নয় এটা, মাঝে মাঝে সে মায়ের মতো আদর করে, কিন্তু মাঝে মাঝে সে ডাক্তারের মতো কঠোর, যে জানে, ওষুধটা তেতো হলেও খাওয়া দরকার। একাকিত্ব একবার সৌন্দর্য দেখিয়ে দিলে, তারপর তোমার লুকিয়ে-রাখা বা লুকিয়ে-থাকা জিনিসগুলোও দেখাতে শুরু করে। শুধু শান্তি নয়, ছায়াও। স্মৃতি ফেরে—সেই সন্ধেটা, যখন তুমি চুপ করে ছিলে, অথচ বলা দরকার ছিল; সেই সকালটা, যখন তুমি চলে গিয়েছিলে, অথচ থাকা উচিত ছিল। পুঁতে-রাখা অনুভূতি মাটি ফুঁড়ে ওঠে। যে-আকাঙ্ক্ষাগুলি তুমি অস্বীকার করেছিলে—নিজের কাছে, অন্যদের কাছে, সেগুলি দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করে। আফসোস দেখা দেয়। লজ্জা, শোক, ভয়, নিঃসঙ্গতা, পুরোনো রাগ, এগুলি তুমি সত্যের দিকে মুখ ফিরিয়েছ বলে মিলিয়ে যায় না। উলটো, তুমি নিজেকে ভোলানো বন্ধ করেছ বলেই ওরা আরও স্পষ্ট হয়।

এখানেই অনেকে পিছু হটে। নিজের অন্তরের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায়, ভেতরে উঁকি দেয়, তারপর মনে করে, না, একে সামলানো যাবে না। মনে হয়, আমি এত ভাঙা, এত ক্ষতিগ্রস্ত, আরও এগোলে পুরোটাই ভেঙে পড়বে। ব্যথা উঠে আসছে মানেই আমি ব্যর্থ হচ্ছি, ভুল পথে যাচ্ছি, এরকম মনে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় এর উলটোটাই সত্য। ব্যথার ভেসে ওঠাটাই সততার শুরু। এটা পতনের চিহ্ন নয়, ফেরার চিহ্ন। একাকিত্বে যা উঠছে, তা উঠছে, কারণ অবশেষে সে এমন একটা জায়গা পেয়েছে, যেখানে তাকে দেখা হবে কোমলতায়, তাড়িয়ে দেওয়া হবে না। এসব ভুল পথে যাবার লক্ষণ নয়। এসব সেই ব্যথা, যা আসে, যখন তুমি নিজের কাছে পুরোনো মিথ্যাগুলি আর বলতে পারো না, আর সেই না-পারাটাই আরোগ্যের শুরু।

সুস্থ হওয়াটা সবসময় উজ্জ্বল আলোয় ভেসে ওঠা নয়। আমরা ভাবি, আরোগ্য মানে ভালো লাগা, আলো দেখা, হালকা বোধ করা। কিন্তু সবসময় তা নয়। কখনো তা আসে ভাঙনের চেহারায়; তুমি ভেবেছিলে, এ তোমাকে ধরে আছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এ আসলে গভীর ফাটলের ওপর দাঁড়-করানো অস্থায়ী মাচা। কখনোবা সুস্থ হওয়া কোমল আলো নয়, জরুরি আঁধার। যা সত্য ছিল না, তা ফেটে যেতে শুরু করে; যা কাঁপতে শুরু করে, তা আসলে কাঁপার দরকারই ছিল। ভয় হয়, স্বাভাবিক। কিন্তু কাঁপুনির মধ্যেও যদি দাঁড়িয়ে থাকো, যদি ভেতরের পৃথিবী নড়ে উঠলেই পালিয়ে না যাও, তাহলে ধ্বংসস্তূপের নিচে কিছু দেখা দিতে শুরু করে। শব্দের তলায়, ভয়ের তলায়, গল্পের আড়ালে—এক নীরবতা, যা ফাঁকা নয়, যার একটা গভীরতা আছে। একটা বিস্তার, যা শূন্য নয়, জীবন্ত। একটা উপস্থিতি, যা বানানো নয়, প্রাচীন।

এ-ই শূন্যতার প্রান্তসীমা।

এখানে তুমি ধারণা দিয়ে পৌঁছোও না। আধ্যাত্মিক পরিভাষার মোড়কে একে গৃহপালিত বানানো যায় না। এই কথাটাও আসলে ভাষা দিয়েই বলছি, সেই একই বিড়ম্বনা থেকে যাচ্ছে, কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। যখন যা মিথ্যা ছিল, তা ভাঙতে শুরু করে, তখন তুমি এতে পড়ে যাও, নিজের ইচ্ছেয় নয়, মাধ্যাকর্ষণে। ভাষা এখানে এসে হোঁচট খায়। চিন্তা আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে। যে-মন সব কিছুতে লেবেল লাগিয়ে গুছিয়ে রাখতে অভ্যস্ত, এটা ভালো, ওটা খারাপ, এটা আমার, ওটা তোমার, সে এমন জায়গায় এসে পৌঁছোয়, যেখানে কোনো লেবেল কাজ করে না। গল্পের ওপর দাঁড়ানো আত্মসত্তা আলগা হতে শুরু করে। এ আর শাসনযোগ্য অন্তর্দৃষ্টির রাজ্য নয়। এ হচ্ছে সেই বিন্দু, যেখানে তুমি উত্তর জমানো বন্ধ করো, আর প্রশ্নের মধ্যেই গলে যেতে শুরু করো।

একাকিত্ব তোমাকে এর জন্য প্রস্তুত করে। বাইরের শব্দ সরায়। সামাজিক মুখোশ আলগা করে। তোমাকে এনে দাঁড় করায় তোমার নিজের অস্তিত্বের কিনারায়, যেখানে একদিকে—তুমি যা চেনো, অন্যদিকে—তুমি জানো না, কী আছে। আর সেই কিনারায় ধরার মতো খুব কম স্থানই থাকে। কোনো ভূমিকাই আর যথেষ্ট নয়। কোনো বিশ্বাসই আগের মতো শক্ত নয়। কোনো পরিচয়ই পুরোপুরি ধরতে পারে না, কী হচ্ছে। প্রশ্ন তখন আর এ নয় যে, তুমি এটা ব্যাখ্যা করতে পারো কি না। প্রশ্ন হলো, তুমি থাকতে পারবে কি না—ওই খোলা বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে, তাকে তাড়াতাড়ি কিছু-একটা দিয়ে ভরাট না করে? মনকে সংজ্ঞায়িত করতে, নিয়ন্ত্রণ করতে, সমাধান বের করতে বাধ্য করার অভ্যেস ছাড়তে পারবে? বিশ্বাস করতে পারবে যে, নীরবতা অনুর্বর নয়, সে শুধু অপেক্ষা করছে সঠিক সময়ের?

প্রতিটি প্রকৃত ভেতরযাত্রায় এমন একটা মুহূর্ত আসে, যা পরোক্ষভাবে শেখানো যায় না। শুধু ব্যাখ্যায় ধরা যায় না। এতে ঢুকতে হয়। এটা আবেগের সান্ত্বনায় আলোকিত নয়, মিষ্টি চিন্তার কোমলতায় মোড়ানো না। এটা প্রশস্ত, শীতল, সাজসজ্জাহীন, ঠিক শীতের সকালে খোলা মাঠের মতো, যেখানে কুয়াশা আছে, কিন্তু লুকোনোর জায়গা নেই। আধ্যাত্মিক পুরস্কার হিসেবে আসে না এটা; আসে স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে, যেমন দুপুরের পর সন্ধে আসে, ফসল তোলার পর শীত আসে। এটাই শূন্যতা: শুধু বইয়ের পাতায় পড়া রূপক নয়, বরং তোমার বানানো জীবনের নিচে বিছিয়ে-থাকা সীমাহীন নীরবতার মুখোমুখি দাঁড়ানো।

ভ্রমগুলি ঝরে পড়ার পর, সামাজিক পরিচয়ের মুখোশ আলগা হতে শুরু করার পর, কিছু-একটা চেতনার কিনারায় চাপ দিতে থাকে। একধরনের স্থিরতা, যা এত বিশাল যে, হাত দিয়ে ধরা যায় না, যেন দাঁড়িয়ে আছ সাগরের সামনে, আর ঢেউ গুনতে গিয়ে বুঝতে পারছ, গোনাটাই অর্থহীন। এ আরামের নীরবতা নয়। এ সেই নীরবতা, যা তোমার নিজেকে জানার সব পরিচিত ছাঁচকে গলিয়ে দেয়। মন তাই ভয় পায়। তুমি নিজেকে যা বলে চিনে এসেছ সারাজীবন—ভালো ছাত্র, পরিশ্রমী মানুষ, ভালো বন্ধু, কঠিন শৈশবের শিশু, সব আলগা হতে শুরু করে। অহম্‌ অনুভব করে, সীমানাগুলি নরম হচ্ছে, আর সেটাকেই সে বিপদ বলে বোঝে, কারণ অহম্‌ বিপদ ছাড়া আর কিছু বুঝতে জানে না। সে চায়, যা ঘটছে, তার একটা নাম দিতে, বাক্সবন্দি করতে, আবার নিশ্চিততার পাকা রাস্তায় ফিরে যেতে।

কিন্তু শূন্যতায় পালানোর কোনো গলি নেই। আছে শুধু একটা আহ্বান—থেকে যাও। ব্যাখ্যা ছাড়া। কাহিনি ছাড়া। এমন কোনো নামের আড়াল না খুঁজে, যা রহস্য থেকে তোমাকে বাঁচাবে। শুধু থেকে যাও, যতক্ষণ না যা মিথ্যা ছিল, তা নিজেই দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে বসে পড়ে।

শূন্যতা অহমের কাছে মৃত্যুর মতো লাগে, এজন্য নয় যে, তোমার সত্যিকারের কিছু-একটা ধ্বংস হচ্ছে, বরং এজন্য যে, সব নকল জিনিস, সব ধার-করা কাঠামো, সব কৃত্রিম ভিত্তি সেখানে দুর্বল হতে শুরু করে। তুমি বুঝতে পারো, তোমার জীবন যতটা বাইরের শব্দের ওপর দাঁড়িয়েছিল, ততটাই দাঁড়িয়েছিল ভেতরের গল্পের ওপরও। উচ্চাশা, আত্ম-ছবি, আত্মরক্ষা, ভয়, আর এমন সব ক্ষুধা, যা আসলে ছদ্মবেশে সমগ্রতার খোঁজ ছিল—এসবের কিনারা ক্ষীণ হতে শুরু করে। তুমি আর সেই বাচ্চা নও, যে মা-বাবার মুখে "ভালো হয়েছে" শুনতে চায়। সেই কর্মী নও, যে পদোন্নতিতে নিজের মূল্য খোঁজে। সেই প্রেমিক নও, যে অন্য কারও চোখে নিজের পূর্ণতা দেখতে চায়। সেই আহত মানুষ নও, যে ব্যথাকেই পরিচয়পত্র বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে ঘুরছে। তুমি কেবল উপস্থিত। কিন্তু সেই নিরাভরণ উপস্থিতিতে আসতে হলে অনেক কিছুকেই মরতে দিতে হয়, যেতে দিতে হয়।

শূন্যতা শাস্তি নয়, পরিত্যাগও নয়। এমন নয় যে, মহাবিশ্ব তোমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এটা অন্ধকার গর্ভ, যেখানে ভ্রম খুলে ফেলা হয়, আর সারাংশ বেরিয়ে আসে। সান্ত্বনা দেওয়া তার কাজ নয়, পথ খোলাই তার কাজ। আত্মসমর্পণ চায় তোমাকে যোগ্য প্রমাণ করার জন্য নয়, চায় তোমাকে ছেড়ে দেবার জন্য, যা কখনোই তোমার আসল সত্য ছিল না। তোমার নাম তুমি শূন্যতায় নিয়ে যেতে পারবে না। তোমার ট্রফি, তোমার ক্ষত, তোমার যত্নে-রক্ষিত অভিযোগ, তোমার আধ্যাত্মিক পরিচয়, উত্তরাধিকারে পাওয়া বিশ্বাস, নিজের প্রতি অহংকার বা লজ্জা, কিছুই সঙ্গে নেওয়া যায় না। ঢুকতে হয় খালি হাতে, অতীতহীন, ভবিষ্যৎহীন, ছবিহীন, এতটাই খোলা যে, শুধু থাকাটুকুই বাকি থাকে।

তবু সেখানে যা অপেক্ষা করে, তা ‘মৃত’ অর্থে শূন্য নয়। সেখানে এক নীরবতা আছে, যা কথা না বলে ধরে রাখে, আর সেই ধরে রাখাটাই আরোগ্য। সে শোক ধরে। সৌন্দর্যও ধরে। লজ্জা ধরে, কোমলতাও ধরে। আতঙ্ক ধরে, আকাঙ্ক্ষাও ধরে। অনুতাপ ধরে, ধরে আনন্দও। কোনোটাকে অন্যটার চেয়ে বেশি পছন্দ করে না, কোনোটাকে ফেরায়ও না। শুধু গ্রহণ করে, আত্মস্থ করে। তোমার বাঁচার জন্য যত্ন করে পালিশ-করা সেই প্রতিচ্ছবিকে না, তার নিচে যে-সত্তা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, তাকে প্রতিফলিত করে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *