সেই ভীতিকর অভিনব স্থিরতায়, হয়তো জীবনে প্রথম বার, তুমি অনুভব করতে শুরু করো এমন কিছু, যা তোমার নিজের জীবনের কাহিনি বা গল্পের আঘাতে নড়ে না। এ এক শান্ত চেতনা, স্মৃতি এসে আছড়ে পড়ে তার গায়ে, কিন্তু সে হেলে পড়ে না। ক্ষতের আগেও সে ছিল, ক্ষত দেখা দেওয়ার পরেও আছে। সে অহমের সম্পত্তি নয়, অহমের নাটকের অংশ নয়। তবু, অহম যতটা তোমার বলে মনে হয়েছে সারাজীবন, তার চেয়েও বেশি অন্তরঙ্গভাবে এই চিরন্তন চেতনাই তুমি। একবার ছুঁয়ে ফেললে, যদিও খুব ক্ষণিকের জন্য, একটা মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্য, তোমার ভেতরের কোনো জায়গায় একটা নিশ্চয়তা জন্মায়, যা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না: বাইরের জীবনে তুমি যা খুঁজে বেড়াচ্ছিলে, তা আসলে কখনও হারায়নি। শুধু ভয়ের তলায়, শব্দের তলায়, আর যথেষ্টক্ষণ চুপ করে না থাকার অভ্যেসের তলায় চাপা পড়ে ছিল।
শূন্যতায় চিরকাল থাকতে হবে, এমন নয়। এটা ঘর নয়, পারাপার। একটা সেতু, একটা সংকীর্ণ পথ, যা দিয়ে পার হতে হয়, কিন্তু যেখানে বসতি গড়তে হয় না। ক্ষেত পরিষ্কার হয়ে যায়, পুরোনো খোলস ভাঙে, পাত্র খালি হয়। যা সত্যের পথে তোমার সাথে যেতে পারবে না, তা সরে যায়। আর তারপর, সেই পরিষ্কার হয়ে-যাওয়া জায়গা থেকে অন্য কিছু জন্ম নিতে শুরু করে।
যা ওঠে, তা হলো উপস্থিতি।
আড়ম্বর নেই, শিঙ্গাধ্বনি নেই, আকাশ থেকে আলোর কোনো রশ্মিও নেই। উপস্থিতি চুপচাপ এসে বসে, যেন সে বরাবরই এখানে ছিল, শুধু তুমি এতক্ষণ এতটা নড়াচড়া করছিলে যে, ওকে দেখতে পাওনি। উন্মোচনের পর, সেই বিপুল নীরবতার পর, পুরোনো গল্পগুলি তাদের জোর হারানোর পর, যা থাকে, তা ফাঁপা নয়। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা স্থিরতা। শ্বাস গভীর হয়। শরীর নিরাপত্তা অনুভব করে, যেমন বাড়ি ফিরলে দরজা বন্ধ করে বালিশে মুখ গুঁজলে যে-আরাম, ঠিক সেরকম একটা শারীরিক স্মৃতি। চোখ নরম হয়। যে-পৃথিবীটা আগে সাধারণ লাগত, রোজকার, একঘেয়ে, সেটা হঠাৎ একটু অন্যরকম আলোয় ভেসে ওঠে।
একটা পাতা।
একটা হাত।
একটা বাটি, ভাতের, চায়ের, যা-ই হোক।
দেয়ালে পড়া বিকেলের আলো।
গ্লাসের ভেতর জল, স্রেফ জল, কিন্তু দেখলে চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না।
পায়ের আওয়াজ, তোমার নিজের, খালি পায়ে মেঝের ওপর।
একটা দরজা, চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
ছায়ার ভেতরে একটা শীতলতা।
ঠান্ডা হাওয়ায় নিঃশ্বাসের উষ্ণতা।
বাইরে কিছু বদলায়নি। রাস্তা সেই রাস্তা, ঘর সেই ঘর। অথচ সবটা অন্যরকম, কারণ যে দেখছে, সে আর পুরোনো ফিল্টারে আটকে নেই। সময়কে আর পুরোপুরি সেই প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয় না, যাকে হারিয়ে দিতে হবে। বর্তমান মুহূর্তটা আর উদ্বেগ থেকে উদ্বেগে ছুটে যাবার করিডোর মনে হয় না। বাসযোগ্য মনে হয়। যথেষ্ট মনে হয়। এটাই আসল শুরু, অমূর্ততার ভেতরে পালিয়ে যাওয়া না, বরং যা এখানে আছে, তার সাথে অন্তরঙ্গ হওয়া।
তুমি খেয়াল করতে শুরু করো, কত বার নিজের সত্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলে। কত বার মুহূর্তটাকে ছেড়ে অতীতে ফিরে গিয়েছিলে। সেই কথাটা কেন বলেছিলাম, সেই কাজটা না করলে কী হতো। কত বার ভবিষ্যৎকে আগেভাগে দখল করতে গিয়ে বর্তমানটা হাত থেকে ফসকে গেছে। কত বার ভয় তোমাকে তোমার নিজের কাছ থেকেই সরিয়ে দিয়েছে। কত দ্রুত আনন্দ পিছলে গেছে, কারণ মনোযোগ অন্য কোথাও, পরের পরিকল্পনায়, পরের চিন্তায়। কত গভীরভাবে তুমি দৃশ্যমান হতে চেয়েছ, শুধু অন্যদের কাছে নয়, নিজের চেতনায়ও। উপস্থিতি এসব দেখায়, দোষ না দিয়ে, আঙুল না তুলে। শুধু আলো ফেলে, আর তুমি দেখো। এ কোনো সচেতন প্রয়াস নয়, এ শুধু থাকা, শুধু দেখা, শুধু টের পাওয়া।
এই উপস্থিতি শুধু চারপাশের পৃথিবীর প্রতি মনোযোগ নয়। সেই সত্তার প্রতিও সচেতনতা, যে নিরন্তর সচেতন। সাক্ষীর দিকে ঘুরে তাকানো, আত্মমগ্ন হয়ে পড়ার জন্য নয়, বরং আরও পরিষ্কার দেখার জন্য। চিন্তার তলায়, মনের যে-কোনো অবস্থার তলায়, যে-কোনো ভূমিকার আড়ালেও আছে এমন কিছু, যা নড়ে না। পরিস্থিতির সাথে ওঠানামা করে না, তুমি খুশি থাকো বা কাঁদো, সে একই জায়গায়। এ ঠিক বস্তু নয়, ধরা যায় না, মাপা যায় না। এ সেই খোলা মাঠ, যেখানে মনের সব জিনিস এসে একে-একে দেখা দেয়, চিন্তা, স্মৃতি, ভয়, আশা, কিন্তু মাঠটা সেসবের কোনোটা নয়। সেই নীরব দর্শক। সেই "আমি আছি", যার ওপরে পরে হাজার বিশেষণ এসে জমে, ভালো, খারাপ, সফল, ব্যর্থ, সুন্দর, কুৎসিত, কিন্তু "আছি"-টুকু কোনো বিশেষণ ছাড়াই পূর্ণ।
একবার এটা টের পেলে জীবন অন্যরকম হয়। বাসন মাজাটা আর শুধু বাসন মাজা থাকে না, হাতে জলের ছোঁয়া, সাবানের ফেনা, থালার মসৃণ পিঠ, সব কিছু একটু বেশি স্পষ্ট লাগে। কারও কথা শোনাটা আর শুধু শব্দ-বিনিময় থাকে না, তুমি শুনতে পারো, কথার পেছনে কী আছে, গলার স্বরে কোথায় কাঁপুনি। চুপচাপ পাশে বসে থাকাটা সঙ্গ হয়ে ওঠে। নীরবতা আর হুমকি নয়, একটা ঘর, দরজা খোলা, ঢুকলেই হয়। সাধারণ জিনিসগুলো, রান্নাঘরে ভাতের গন্ধ, জানালায় শিউলিফুলের ছায়া, চায়ের কাপে ধোঁয়া, এগুলোর ভেতরে একটা পবিত্রতা দেখা দিতে শুরু করে, যা আগে চোখে পড়ত না। অস্তিত্বকে পবিত্র হতে অলৌকিক হতে হয় না। শুধু দেখতে হয়, গ্রহণ করতে হয়, স্পর্শ করতে হয়। এ এক চর্চার ব্যাপার।
এই উপস্থিতি আমি আর পৃথিবীর মাঝের সীমারেখাগুলি নরম করে দেয়। সেই তীক্ষ্ণ বিচ্ছিন্নতা, আমি এখানে, পৃথিবী ওখানে, তা পুরোনো জোর হারায়। বাইরের দিকে তাকিয়ে তুমি আর নিজেকে শুধু একটা শরীরের খাঁচায় বন্দি আলাদা প্রাণী ভাবো না। আছে শ্বাস, শব্দ, অনুভূতি, গতি, নীরবতা, আর আছে সেই চেতনা, যা এসবকে ধরে আছে। সেই ধারণ করার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম আনন্দ থাকে, নাটকীয় নয়, লাফিয়ে ওঠা নয়, কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই। যেমন শীতের সকালে রোদ পিঠে লাগলে যে-আরাম, তেমন, বড়ো কিছু নয়, কিন্তু সত্যি। এটা আসে, যখন প্রতিরোধ আলগা হয়, যখন সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করার চাপটা একটু সরে, যখন মনোযোগ এত নরম হয় যে, সে যা দেখে, তাকে বদলাতে, বিচার করতে, দখল করতে না চেয়ে শুধু ভালোবাসতে পারে।
উপস্থিতি জটিল কোনো বিশ্বাসব্যবস্থা চায় না। বড়ো বড়ো বই পড়ার দরকার নেই, গুরুর পায়ে বসার দরকার নেই, যদিও সেসবও মূল্যবান হতে পারে। উপস্থিতি চায় শুধু মনোযোগ। নিয়ন্ত্রণের শক্ত, সংকীর্ণ মনোযোগ নয়, যত্নের ধৈর্যশীল মনোযোগ। যেমন মনোযোগ দেওয়া হয় হাঁটা শিখছে, এমন বাচ্চাকে—পড়ে গেলে ওঠাও, কিন্তু ভয়ে ধরে রেখো না। যেমন দেওয়া হয় আহত কুকুরকে—আস্তে হাত বাড়াও, জোর কোরো না। যেমন দেওয়া হয় এমন অবয়বকে, যার সামনে কথা বলার দরকার নেই, শুধু থাকলেই যথেষ্ট। তুমি যখন জীবনকে এই মনোযোগ দাও, জীবন তখন আক্ষরিক ভাষার বাইরে নানাভাবে কথা বলতে শুরু করে। অন্তর্দৃষ্টিতে, শরীরের জানায়, হঠাৎ পেটে যে-চাপটা লাগল, সেটাও একটা বার্তা, কাকতালীয় সময়ে সমাপতনে, এমন স্বচ্ছতায়, যেটা হঠাৎ এসে পড়ে, আর যার ব্যাপারে তর্ক লাগে না। পৃথিবী তখন যন্ত্রের মতো কম, আয়নার মতো বেশি মনে হয়, কিন্তু সে আয়না তোমার অহংকার দেখায় না, তোমার সারাংশ দেখায়।
তুমি বাঁচো কম প্রতিক্রিয়ায়, আর বেশি সাড়ায়। অভ্যেসের পুতুল হিসেবে নয়, বরং শ্রোতা হিসেবেই বেশি। উপস্থিতি জেগে উঠেছে বলেই অন্তরের পথটি ফুল-বিছানো হয় না। উপস্থিতি সব কিছু দেখায়, সুন্দর যেমন দেখায়, তেমনি কুৎসিতও। রাগ, শোক, হিংসা, একাকিত্ব, ক্ষোভ, ভয়, পুরোনো দুঃখ, পুরোনো লজ্জা, সব কিছু আলোকিত হয়। উপস্থিতি বাছবিচার করে না। সুন্দরকে ভেতরে নেবে আর কঠিনকে দরজায় রেখে আসবে, এরকম না। সব কিছুকে সমানভাবে গ্রহণ করে, সব কিছু দেখে। আর গভীরভাবে দেখা পাবার মধ্যেই ব্যথা অনুভবে রূপান্তরিত হতে শুরু করে।
জোর করে ঠিক করা হয় বলে নয়, অস্বীকারও করা হয় বলে নয়, দ্রুত কোনো সুন্দর আধ্যাত্মিক মোড়কে পেঁচিয়ে "সব ঠিক আছে" বলে চালিয়ে দেওয়া হয় বলে নয়। ব্যথা বদলায়, কারণ অবশেষে তার সাথে সত্যিকারের দেখাটি হয়। কেউ তাকে ফেরায়নি, কেউ তাকে চুপ করায়নি, কেউ তাকে অন্য নামে ডাকেনি। তুমি বুঝতে শুরু করো, অনুভূতিগুলি শত্রু নয়, দূত। অস্বস্তি ব্যর্থতার সাক্ষ্য নয়, ফেরার আহ্বান। প্রতিটি ট্রিগার এক-একটা দরজা। প্রতিটি ক্ষত এক-একটা জানালা। উপস্থিতির আসল কাজ শান্তির মুহূর্তে নয়, প্রতিরোধের মুহূর্তে। তুমি কি রাগের ভেতরেও জেগে থাকতে পারো? ভয়কে মেনে না নিয়ে তার পাশে বসতে পারো? নিঃসঙ্গতায় ফোনের দিকে না দৌড়ে থাকতে পারো? নিজের চিন্তা শুনতে পারো, কিন্তু প্রত্যেকটারই নয়, বরং বেছে বেছে দু-একটার হাত ধরে পথ চলতে পারো? এখানেই উপস্থিতি কাগজের পাতা ছেড়ে বাস্তব হয়।
এটাই পরিশোধনের আগুন। বিনষ্ট করে না, স্বচ্ছ করে। ধীরে, কোমলভাবে, কিন্তু অবিশ্রান্ত ধরনে, আর পুড়িয়ে দেয় যা-কিছু মিথ্যে। বাকি থাকে যা আরও সৎ, আরও ভঙ্গুর, আরও জীবন্ত। আর তখন সত্তার আরেকটা স্তর নিজেকে দেখাতে শুরু করে।
সব নাম ঝরে গেলে: চার
লেখাটি শেয়ার করুন