দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

সব নাম ঝরে গেলে: এক



দিগন্তে আলোফোটার ঠিক আগের মুহূর্তটা অদ্ভুত। ব্যাখ্যা করা কঠিন, কারণ সেটা ঠিক রাতও নয়, সকালও নয়, দুটোর মাঝখানে ঝুলে-থাকা একটা সময়, যার নিজস্ব কোনো নাম নেই। কাকের ডাক তখনও শুরু হয়নি। রাস্তায় রিকশার ঘণ্টি বাজেনি। পাড়ার মসজিদ থেকে আজান আসেনি। তুমি হয়তো এমনিতেই চোখ মেলেছ, অ্যালার্মের আগে, কোনো স্বপ্নের জের ধরে হয়তো, বা মশার কামড়ে, কে জানে; আর দেখছ, ঘরের ছাদটা অন্ধকারে আবছা, জানালার ফাঁক দিয়ে একটু একটু ধূসর আলো ঢুকছে। সেই ফাঁকটুকুতে একরকমের নীরবতা নেমে আসে, যাকে ঠিক শূন্য বলা যায় না। ও কেমন যেন! কেউ যেন ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে, দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু নিঃশ্বাসটা টের পাওয়া যাচ্ছে।

সেই নীরবতার ভেতরে একটা ওজন আছে, একটা উপস্থিতি, যেন বাতাস নিজেই কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু তার ভাষা নেই, তাই শুধু গায়ে এসে লাগছে একটু অন্যরকম করে। সেই বার্তা এতটাই সূক্ষ্ম, এতটাই ভঙ্গুর যে, দিনের প্রথম হর্ন বাজলেই, প্রথম ফোন কাঁপলেই, সব মুছে যাবে চিরকালের মতো। ভোরের ঠিক আগের ওই স্থিরতায়, যখন প্রতিদিনের দায়িত্বগুলি এখনও তোমার নাম ধরে ডাকেনি, যখন পৃথিবী এখনও তোমার কাছে কিছু চাওয়া শুরু করেনি, তখন ওই ম্লান আলোর ভেতরে, রাত আর সকালের মাঝের ওই টানা নিঃশ্বাসের মতো বিরতিতে, একটা উপস্থিতি থাকে। সে তোমার ওপর চাপায় না নিজেকে। চিৎকার করে না। জাঁকজমক নেই, নাটক নেই। সে শুধু আছে, যেন অস্তিত্বের কোনো খুব পুরোনো, খুব গভীর অংশ তোমার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে খুব আস্তে কিছু বলতে চাইছে, যা শুধু ওই মুহূর্তেই বলা সম্ভব, যখন রোজকার জীবনের যন্ত্রপাতি এখনও চালু হয়নি।

আর সে কী চায়? সে চায়, তুমি যেন আবার ঘুমিয়ে না পড়ো। শুধু চোখের ঘুম নয়, আরেক ঘুম আছে, যেটার কথা কেউ বলে না, কিন্তু আমাদের জীবনের বেশিরভাগই তার ভেতরেই তলিয়ে যায়। অভ্যেসের ঘুম—প্রতিদিন সকালে একই পথে হেঁটে যাওয়া, একইভাবে চা বানানো, একই রাস্তা ধরে অফিসে যাওয়া, কিছুই খেয়াল না করে। প্রতিক্রিয়ার ঘুম—কেউ কিছু বললেই রেগে যাওয়া, বা চুপ হয়ে যাওয়া, বা হেসে ফেলা, যন্ত্রের মতো, ভাবার আগেই। বিভ্রান্তির ঘুম—ফোন স্ক্রল করতে করতে দুইঘণ্টা গায়েব, কী দেখলে, মনেও নেই। নিরন্তর বাইরের দিকে ছুটে চলার ঘুম—পরের কাজ, পরের মিটিং, পরের ডেডলাইন, পরের ছুটির পরিকল্পনা, সবসময় পরের ‘কিছু’। সেই উপস্থিতি চায় না, তুমি এত তাড়াতাড়ি সেই জগতে ফিরে যাও, যে-জগৎ তোমাকে ব্যস্ত রাখে ঠিকই, কিন্তু জাগিয়ে রাখে কি?

তোমার ভেতরে কিছু সত্য লুকিয়ে আছে। পৃথিবী যখন চেঁচামেচি করে, তখন সেগুলি মুখ খুলতে পারে না। তোমার বুকের ভেতর কিছু স্পন্দন আছে, যেগুলি তুমি নিজেই চাপা দিয়ে রেখেছ—কখনো জেনে, কখনো না জেনে, কখনো বেঁচে থাকার তাগিদে। তোমার অস্তিত্বের মধ্যে কিছু অর্থ আছে, যা চিন্তা, কর্তব্য, ভূমিকা, অভিনয়, শব্দ আর কোলাহলের ভিড় ঠেলে নিজের রাস্তা করে নিতে পারে না। ওরা আসে মৃদুস্বরে। ওরা আসে দিন পুরোপুরি গড়ে ওঠার আগে, সেই ফাঁকে। ওরা আসে তখনই, যখন পৃথিবী কিছুক্ষণ থামে, চুপ করে, যেন তোমার ভেতরের জীবনটাও একটু মনে করতে পারে—তারও একটা স্বর আছে।

ওদের শুনতে হলে কেন স্থির হতে হয়? কেন ওরা নীরবতার জন্য অপেক্ষা করে? কারণ তোমার ভেতরে এমন কিছু জায়গা আছে, যেগুলি শুধু তখনই খোলে, যখন বাইরের কোনো কিছুই তোমার মনোযোগকে নিবদ্ধ করে রাখে না। হৃদয়ের কিছু ঘর আছে, যেখানে ভান করে ঢোকা যায় না, তুমি যতই চেষ্টা করো, দরজা খুলবে না, যতক্ষণ না তুমি সত্যিই খালিহাতে এসে দাঁড়াচ্ছ। আত্মার কিছু দিক আছে, যা অবিরাম নজরদারির নিচে বাঁচতে পারে না, ঠিক যেমন কিছু গাছ ছায়ায় ভালো হয়, রোদে পুড়ে যায়।

তোমার নামের নিচে আরেকটা সত্তা আছে। রোজকার অভ্যেস, ইনস্টাগ্রামের বায়ো, তুমি যা যা ভূমিকা ধারণ করতে শিখেছ, সব সরিয়ে দিলে সে দেখা দেয়। পৃথিবীর সামনে তোমার যা যা ভূমিকা—ভালো ছেলে, দক্ষ কর্মী, বোঝাপড়ার মানুষ, তাদের সবার নিচে আরেকটা উপস্থিতি আছে, যা প্রশংসা বা নিন্দা দিয়ে বানানো কিছু নয়। তাকে লাইকের সংখ্যায় মাপা যায় না। তোমার সিভি যতই লম্বা বা সমৃদ্ধ হোক, সে তাতে নিজেকে খুঁজে পায় না। তোমার উপযোগিতা, খ্যাতি, দক্ষতা, সৌন্দর্য, ক্ষত, অর্জন, কোনোটাই তাকে সংজ্ঞায়িত করে না। সে থাকে এসবের নিচতলায়, যেমন পুকুরের গভীরে থাকে ঠান্ডা স্থির জল, ওপরে বাতাস যতই ঢেউ তুলুক, ওই তলটা নড়ে না। জীবন তোমাকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার আগে থেকেই সে সেখানে থাকে, আর থেকে যায়…চুপচাপ।

এই গভীরতর উপস্থিতি তোমার সেই অংশ নয়, যে জানে, কীভাবে ইমেলের উত্তর দিতে হয়, মিটিংয়ে সঠিক সময়ে সঠিক কথাটি বলতে হয়, প্রত্যাশা পূরণ করতে হয়, আর গ্রহণযোগ্য থাকার জন্য নিজেকে বার বার ঠিক করে নিতে হয়। এটা সেই তুমিও নয়, যে রাত দুটোয় স্ক্রল করে অন্যের জীবন দেখে, তুলনা করে, মনে মনে হিসাব কষে, কে কতটা এগিয়ে গেল। এটা তোমার সেই সংস্করণটিও নয়, যে খুশি করতে, মানিয়ে নিতে, নিজেকে বাঁচাতে আর উপস্থাপন করতে এত অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, তার আর মনেও পড়ে না, কবে থেকে এটা শুরু হয়েছিল। এটা তোমার আরও পুরোনো সত্তা। আরও চুপচাপ। আরও ধৈর্যশীল, আরও গভীরে বসে-থাকা, আরও অন্তর্লীন।

যে স্বপ্ন দেখে, সত্যিকারের স্বপ্ন, ঘুমের মধ্যে নয়, জেগে থেকে। যে ব্যথা পায় এমন জায়গায়, যেখানে ব্যান্ডেজ লাগানো যায় না। যে মনে রাখে এমন জিনিস, যেগুলি তুমি ভুলে যেতে চেয়েছ বার বার। যে আকুল হয় এমন কিছুর জন্য, যার নাম তুমি জানো না। তোমার প্রথম স্মৃতি যখন এখনও গল্পের রূপ নেয়নি, তখনও সে ছিল। আর তোমার সব উপাধি, সব ভূমিকা, সব বাক্য, যেগুলি দিয়ে তুমি নিজেকে বর্ণনা করছ ফেইসবুকে, আড্ডায়, নিজের মনে—সব ঝরে পড়ে গেলেও সে থাকবে। এ-ই সেই সত্তা, যাকে পৃথিবী সবচেয়ে কম চেনে, বরং পৃথিবীই তাকে সবচেয়ে সহজে ডুবিয়ে দেয়, শব্দে, কাজে, প্রত্যাশায়, তুলনায়। আর তাই তাকে বেশিরভাগ সময় খুঁজে পাওয়া যায় শুধু একা থাকলে।

সেই সত্তা ভিড়ে বের হয় না। অন্যদের সামনে মুখ সাজানোর সময় সে নিজেকে মেলে ধরে না। তুমি যখন বোঝা বাড়াতে চাইছ, প্রশংসিত হতে চাইছ, দলের অংশ হতে চাইছ, তখন তাকে শোনা যায় না, কারণ তুমি বাইরের দিকে এত জোরে ছুটছ যে, ভেতরের ফিসফাস হারিয়ে যাচ্ছে হর্নের শব্দে। সে জন্মায় একাকিত্বে। পরিষ্কার হয় নীরবতায়। সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা দেয় তখন, যখন অভিনয় দেখার কোনো দর্শক নেই, মেনে চলার কোনো স্ক্রিপ্ট নেই, পালন করার কোনো সামাজিক ছন্দ নেই। এই কারণেই ভেতরের দিকে ফেরাটা পালানো নয়, ফিরে আসা। জীবন থেকে চলে যাওয়া নয়, বরং জীবনের সেই গোপন কেন্দ্রে প্রত্যাবর্তন, যেখান থেকে সব কিছু আবার সত্যি হয়ে ওঠে। অন্তরের পথ পৃথিবীকে অস্বীকার করার পথ নয়। এটা সেই জেদ যে, তুমি পৃথিবীর মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে নিজের গভীরতম সত্তা থেকে সারাজীবন বিচ্ছিন্ন থাকতে রাজি নও।

তাই কিছুক্ষণ কল্পনা করো, কোনো তত্ত্বের দিকে নয়, একটা জায়গার দিকে তোমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোনো বইয়ের পাতার দিকে নয়, বরং তোমার নিজের ভেতরের এক ভূমির দিকে, যা তুমি চেনো, কিন্তু সেখানে যেতে তুমি ভুলে গেছ। কল্পনা করো, তুমি ঢুকছ এমন একটা জায়গায়, যেখানে নীরবতা নিজেই শ্বাস নিচ্ছে, যেখানে সত্য অন্ধকারের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে জড়ো করছে নিজেকে, যেখানে আত্মা তার কাজের ইউনিফর্ম খুলে রেখে দিয়ে নিজের মুখটা দেখাতে শুরু করছে। এটা কোনো বাইরের বস্তু অর্জনের যাত্রা নয়। এটা স্মরণ করার যাত্রা—যা একদিন জানতে, তা আবার মনে করা। নতুন কেউ হওয়ার দরকার নেই, বরং তুমি যা নও, তা সরিয়ে দেখতে শেখা, যতক্ষণ না যা সবসময় ছিল, তা আবার দেখা যায়। এটা একা থাকার যাত্রা, হ্যাঁ, তবে তা নির্বাসন হিসেবে একা থাকা নয়। এটা ফিরে আসার যাত্রা। শূন্যতার দিকে তাকানোর যাত্রা, তা থেকে পিছিয়ে আসার যাত্রা নয়। এটা সেই বিভ্রম আলগা করে দেবার যাত্রা যে, তুমি হয়তো কখনো সত্যি সত্যিই ভালোবাসা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলে। এটা এই আবিষ্কারের যাত্রা যে, অন্তরের পথ কোনো সরু, ব্যক্তিগত গলি নয়, এটাই সেই চওড়া রাস্তা, যা দিয়ে আত্মা নিজের বাড়ি ফিরে যায়।

আমরা একলা থাকতে ভয় পাই, যতটা স্বীকার করি, তার চেয়ে ঢের বেশি ভয় পাই। কিন্তু ভয়টা খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, তা আসলে নীরবতাকে নিয়ে নয়। নীরবতা অসহ্য, ব্যাপারটা তা-ও নয়। ব্যাপারটা হলো, নীরবতা আমাদের টিকিয়ে রাখার সব সাজানো ব্যবস্থা সরিয়ে দেয়, আর সেই উন্মুক্ত অবস্থাটায় আমরা অভ্যস্ত নই। অন্যদের সাথে থাকলে আমরা নিজেদের একরকম করে গড়তে পারদর্শী।

ছোটোবেলা থেকে শিখেছি, কোন জিনিস বললে বাহবা পাওয়া যায়, কোন ভঙ্গিতে দাঁড়ালে নিরাপদ, সুতীব্র ভাঙনের মধ্যেও কীভাবে চা বানাতে বানাতে সব ঠিক আছে, এমন মুখ করতে হয়। কোন অংশটা নরম করতে হয় মানুষের সামনে, কোনটা লুকিয়ে রাখতে হয় পকেটে, আর কোন সংস্করণটা বের করলে সামাজিক জীবনে খুব বেশি ঝামেলা ছাড়া চলা যায়। এমনকি যাদের ভালোবাসি, যাদের কাছে সবচেয়ে খোলামেলা থাকার কথা, তাদের সামনেও আমরা নিজেদের সম্পাদনা করে যাই। একটু ঠিক করে নিই এটা, একটু নরম করি ওটা। নিজেকে এমন একটা ভাষায় অনুবাদ করি, যা সহজে গিলতে পারা যায়, যাতে কেউ বিরক্ত না হয়, কেউ ভয় না পায়, কেউ সরে না যায়।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *