শৈব কালী: চুয়ান্ন



মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, ভৈরবী ভাবমোক্ষণ বা আবেগিক বিমোচন বা আবেগিক রেচন (cathartic release)-এর প্রতীক—যেখানে দীর্ঘদিনের দমিত ভয়, রাগ, দুঃখ ও যন্ত্রণা হঠাৎ ভেঙে বেরিয়ে আসে এবং সেই উন্মোচনের মধ্য দিয়েই মানসিক মুক্তি ঘটে। ইউং-এর ভাষায়, এটি ছায়ার সংহতিসাধন বা ছায়া সত্তার সমন্বয় (shadow integration)—অর্থাৎ, নিজের ভেতরের আলো ও অন্ধকার, উভয় দিককেই মেনে নিয়ে এক অখণ্ড সত্তা হিসেবে বিকশিত হওয়ার প্রক্রিয়া—নিজের অন্ধকার অংশকে চেতনার আলোয় আনতে পারা। ভৈরবী সেই অন্তর্গত শুদ্ধির আগুন, যা মানুষের মনকে গভীরতম স্তরে পরিবর্তন করে। তিনি শিখিয়ে দেন—ভয়কে দমন নয়, বরং তার মুখোমুখি হয়ে তাকে অতিক্রম করাই মুক্তির পথ।

ভৈরবী হলেন চেতনার রক্ষাকারিণী অগ্নি—যিনি একদিকে ধ্বংস করেন অজ্ঞান, আর অন্যদিকে জাগিয়ে তোলেন মুক্তির দীপ্তি। তিনি কেবল ভয়ঙ্কর নন, তিনি মাতৃস্বরূপা—যিনি নিজের উগ্রতায় সন্তানকে রক্ষা করেন, শুদ্ধ করেন, জাগিয়ে তোলেন। তাঁর অগ্নি হলো প্রেমেরই রূপ, যা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তার চিরজ্যোতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

ধূমাবতী: ইনি হলেন শূন্যতার দেবী, চেতনার সেই স্তর, যেখানে সমস্ত রূপ, গতি ও পরিচয় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়—শুধু থাকে নিস্তব্ধ অস্তিত্বের ধোঁয়াটে পরিসর। তিনি সৃষ্টি-চক্রের অন্তিম পর্যায়, যেখানে জগতের সব প্রকাশ বিলীন হয়ে থাকে সম্ভাবনার আকারে। তাঁর ধূসর, শ্মশানময় প্রতীক প্রকৃতপক্ষে এক গভীর দর্শন—রূপ ও জীবনের ক্ষয়ই হলো চেতনার বিশ্রাম এবং এই বিলয়েই নিহিত পুনর্জন্মের সম্ভাবনা। ধূমাবতী তাই ধ্বংসের নয়, বরং অবসানের মধ্যের নীরব পূর্ণতার প্রতীক।

অদ্বৈত বেদান্তে এই স্তর বোঝায় নিত্যশূন্য ব্রহ্মচেতনার অভিজ্ঞতা—যেখানে রূপ, কর্ম, ধারণা, আনন্দ সব বিলীন, অথচ অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ। এখানে চেতনা নিজের অরূপ স্বরূপে স্থিত—যেমন ঢেউ থেমে গেলেও সাগর রয়ে যায়। এই শূন্যতা কোনো অভাব নয়, বরং সমস্ত সম্ভাবনার উর্বর ক্ষেত্র। উপনিষদে পাচ্ছি, “অসঙ্গো হ্যয়ং পুরুষঃ” (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৪.৩.১৫, ৪.৩.১৬, ৪.৪.২২)—"এই পুরুষ (আত্মা) নিশ্চয়ই সঙ্গহীন (অনাসক্ত)।" অর্থাৎ, চেতনা কখনও কোনো রূপে আবদ্ধ নয়; ধূমাবতী সেই অরূপ চেতনার অনুপস্থিতির মধ্যেও উপস্থিতির অনুভূতি।

কাশ্মীর শৈব দর্শনে ধূমাবতী হলেন তিরোভাবশক্তি—শক্তির অন্তর্মুখী অবস্থা, যেখানে তিনি নিজের আলোকে গোপন করে গভীর স্থিতিতে প্রবেশ করেন। এই অবস্থায় চেতনা সব প্রকাশ প্রত্যাহার করে নিজের গভীরে বিশ্রাম নেয়। তিরোভাব মানে লুকিয়ে যাওয়া নয়, বরং আত্মসমাহিত বিশ্রাম—যেখানে শক্তি আত্মপ্রকাশের বদলে আত্মস্মরণে নিবিষ্ট। ধূমাবতী তাই “অলৌকিক নিস্তব্ধতার দেবী”—তিনি শেখান, জগতের উচ্ছ্বাসের পেছনে যে নীরবতা আছে, সেটিই প্রকৃত চেতনা।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ধূমাবতী existential emptiness-এর প্রতীক—অর্থাৎ সেই অবস্থার, যেখানে মানুষ সমস্ত অর্থ, উদ্দেশ্য বা পরিচয় হারিয়ে এক গভীর নীরবতার মুখোমুখি হয়। এটি কোনো হতাশা নয়, বরং অস্তিত্বের মূল শূন্যতার প্রতি জাগরণ। আধুনিক মানসিক বিশ্লেষণে একে বলা হয় “radical acceptance of nothingness”—অর্থাৎ, অর্থহীনতার মধ্যেও শান্তি খুঁজে পাওয়া। ধূমাবতীর শিক্ষাই এ-ই—জীবনের সমস্ত অভাব, ক্ষতি ও একাকিত্ব আসলে চেতনারই এক রূপ, যা আমাদের গভীরতম সত্তার দিকে ফেরায়।

ধূমাবতী হলেন সেই অন্তিম মাতৃরূপ, যিনি চেতনার পরিসর থেকে সমস্ত রং, শব্দ ও রূপ মুছে দিয়ে রেখে দেন নিখাদ উপস্থিতি। তিনি সময়ের অবশেষ, তবুও সময়ের পটভূমি; তিনি শূন্যতার দেবী, কিন্তু সেই শূন্যতার মধ্যেই মহাশক্তির গর্ভ—যেখান থেকে আবার নতুন সৃষ্টির উদ্‌ভব হয়।

বগলামুখী: ইনি হলেন নিবারণ ও স্থিতির দেবী—চেতনার সেই শক্তি, যিনি সমস্ত ক্রিয়া, চিন্তা ও শব্দের প্রবাহকে থামিয়ে দেন। তাঁর ক্ষমতা হলো থামিয়ে দেওয়া, স্তব্ধ করা, মনকে নিজের অন্তরে ফিরিয়ে নেওয়া। তাই তিনি কেবল ধ্বংসের প্রতীক নন; বরং অন্তর্মুখী জাগরণের দেবী, যাঁর শক্তি হলো introspection—মনের নিজের গভীরে প্রত্যাবর্তন। তাঁর স্তব্ধতা মানে নিস্তব্ধতা নয়; বরং চেতনার কেন্দ্রে ফিরে যাওয়া, যেখানে মন আর বাহ্য বস্তু বা শব্দের দ্বারা বিচলিত হয় না।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে, বগলামুখী প্রত্যাহার ও মনসংযমের প্রতীক। এটি যোগসূত্রের পঞ্চম অঙ্গের অবস্থার মতো—যেখানে ইন্দ্রিয়গণ বহির্বিশ্ব থেকে সরে গিয়ে নিজের উৎসে মিলিয়ে যায়। যেমন নদী সমুদ্রে ফিরে যায়, তেমনি মন নিজের আকর্ষণ ও ক্রিয়া থেকে সরে চেতনার নীরব কেন্দ্রে বিশ্রাম নেয়। এই অবস্থায় চিন্তা থেমে যায়, কিন্তু চেতনা নিস্তেজ হয় না; বরং আরও জাগ্রত হয়ে ওঠে—যেখানে জানা, চিন্তা ও ভাবের পার্থক্য মুছে যায়।

কাশ্মীর শৈব দর্শনে বগলামুখী হলেন শক্তির নিঃশব্দ অবস্থা, যেখানে স্পন্দ থেমে যায়, কিন্তু চেতনা জাগ্রত থাকে। এটি কোনো জড়তা নয়; বরং সর্বোচ্চ স্থিতি—“স্পন্দোপশমঃ শিবঃ”, অর্থাৎ স্পন্দের থেমে যাওয়াই শিবচেতনার প্রকাশ। এই অবস্থায় শক্তি আর ক্রিয়াশীল নয়, তিনি আত্মবিম্বে স্থিত—যেমন সাগর স্থির, কিন্তু তার গভীরে অসীম গতি লুকিয়ে আছে। এই নিবারণ মানেই আত্মার বিশ্রাম; চেতনা নিজের সীমাহীন নিস্তব্ধতায় ফিরে যায়।

বগলামুখী কালী হলেন চেতনার এমন এক প্রতীকী শক্তি, যা মনের প্রতিক্রিয়াশীল প্রবৃত্তিকে স্থির করে দেয়। তিনি সেই মুহূর্তের দেবী, যখন মন হঠাৎ থেমে যায়—কোনো সিদ্ধান্ত, রাগ, বা উদ্বেগে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে কেবল দেখে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় জ্ঞানীয় নিস্তব্ধতা (cognitive stillness)—অর্থাৎ, মনের ভেতরের শব্দ ও তাড়না সাময়িকভাবে থেমে যায়, কিন্তু সচেতনতা হারায় না।

এটা কোনো চিন্তা-শূন্য অবস্থা নয়; বরং এমন এক শান্ত সচেতনতা, যেখানে মন নিজের চলাফেরাকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ কিছু বলল—আপনি রেগে উঠলেন। সাধারণত রাগ তৎক্ষণাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে; কিন্তু বগলামুখীর এই অন্তর্গত স্থিরতা তখন এক ক্ষুদ্র বিরতি আনে। আপনি বুঝতে পারেন—“রাগ উঠছে”—এবং সেই বোঝাই আপনাকে রাগে ডুবে যেতে বাধা দেয়। এটিই হলো মননশীল স্থগিতকরণ (mindful suspension)—প্রতিক্রিয়া না দিয়ে দেখা, বিচার না করে দেখা, কিছু না বদলে দেখা।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে বলেন অধিজ্ঞানীয় সচেতনতা (metacognitive awareness)—অর্থাৎ, এমন এক স্তরের সচেতনতা, যেখানে মন নিজের কাজকে নিরপেক্ষভাবে দেখতে শেখে। এই দেখার ফলে চিন্তা ও আবেগ আর “আমি”-কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; বরং “আমি” তা পর্যবেক্ষণ করতে শেখে। ফলে মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে, কথাবার্তা ও আচরণে সংযম আসে, এবং ভিতরে জন্ম নেয় গভীর মনোসংযম।

শাস্ত্রীয় ভাষায়, বগলামুখী শত্রুর মুখ স্তব্ধ করেন—তবে সেই শত্রু বাইরের কেউ নয়, বরং নিজের ভেতরের অস্থিরতা, আতঙ্ক, ও তাড়াহুড়ো। তাঁর শক্তি নিবারণ—যা ক্রিয়ার অন্ধ প্রবাহকে থামিয়ে চেতনার স্পষ্টতা ফিরিয়ে আনে। তাই তিনি নীরবতার দেবী নন, বরং সচেতন স্থিরতার দেবী। তাঁর নীরবতা ঘুম নয়, দুর্বলতাও নয়; বরং এমন এক সক্রিয় উপস্থিতি, যেখানে মন শান্ত, কিন্তু জেগে আছে।

এইভাবেই বগলামুখী কালী মানুষের মানসিক জীবনে সেই অন্তর্গত নিয়ামক শক্তি—যিনি প্রতিক্রিয়ার তীব্রতার মাঝে স্থিরতা শেখান, উত্তেজনার মধ্যে বুদ্ধির দীপ্তি জাগান, আর মনের শব্দের ভিতর থেকে গভীর নীরবতার সুর প্রকাশ করেন। তাঁর প্রতীক আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যখন মন থেমে যায়, তখনই সত্য দেখা যায়; আর সেই স্থির সচেতনতাই বগলামুখীর আসল চেতনা।

বগলামুখী হলেন চেতনার অন্তর্গত নীরবতার প্রতীক—যিনি শেখান, প্রকৃত স্থিতি কোনো বাহ্যিক নীরবতা নয়, বরং অন্তর্দৃষ্টির সমাহিত শান্তি। তিনি সেই শক্তি, যিনি সমস্ত শব্দ, চিন্তা ও ক্রিয়া থামিয়ে মানুষকে তার অন্তরের কেন্দ্রে ফিরিয়ে নেন, যেখানে নিঃশব্দ চেতনা চিরজাগ্রত থাকে।

যোগসূত্র-এ পতঞ্জলি মুনি যোগকে আটটি ধাপে বা অঙ্গে ভাগ করেছেন, যাকে বলা হয় অষ্টাঙ্গ যোগ। এটি মানুষের চেতনা ও আচরণকে বহির্জগত থেকে অন্তর্জগতের গভীরে নিয়ে যাওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যোগসূত্র (২.২৯)-এ বলা হয়েছে—"যম নিয়ম আসন প্রাণায়াম প্রত্যাহার ধারণা ধ্যান সমাধয়োঽষ্টাওঙ্গানি।" অর্থাৎ, যোগের আট অঙ্গ হল—যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি।

প্রথম অঙ্গ যম হলো নৈতিক সংযম বা আত্মশাসন। এটি পাঁচটি নীতির সমষ্টি—অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ। অহিংসা মানে কোনো প্রাণীর প্রতি কষ্ট না দেওয়া, সত্য মানে বাক্য ও চিন্তায় সত্যনিষ্ঠ থাকা, অস্তেয় মানে অন্যের প্রাপ্য নিজে গ্রহণ না করা, ব্রহ্মচর্য মানে ইন্দ্রিয়সংযম ও শক্তির সংরক্ষণ, আর অপরিগ্রহ মানে অপ্রয়োজনীয় সম্পদ ও ভোগলালসা ত্যাগ।

দ্বিতীয় অঙ্গ নিয়ম, যা ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা ও সাধনার নির্দেশ দেয়। এখানেও পাঁচটি নীতি আছে—শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর-প্রণিধান। শৌচ মানে বাহ্য ও অভ্যন্তরীণ শুদ্ধতা, সন্তোষ মানে যা আছে তাতে তৃপ্ত থাকা, তপঃ মানে আত্মশুদ্ধির জন্য ধৈর্য ও ত্যাগ, স্বাধ্যায় মানে শাস্ত্র অধ্যয়ন ও আত্মচিন্তন, আর ঈশ্বর-প্রণিধান মানে ঈশ্বর বা পরমচেতনার প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ।

তৃতীয় অঙ্গ আসন, যার অর্থ স্থিতিশীল ও প্রশান্ত শরীর। পতঞ্জলি বলেছেন, “স্থিতসুখমাসনম্‌”—যে-আসন স্থির ও সুখকর, সেটিই যোগের উপযুক্ত আসন। আসনের উদ্দেশ্য শরীরকে ধ্যানের উপযোগী করে তোলা, যাতে দেহের অস্থিরতা মনকে বিঘ্নিত না করে।

চতুর্থ অঙ্গ প্রাণায়াম, অর্থাৎ শ্বাস নিয়ন্ত্রণ। প্রাণ বা জীবনশক্তির প্রবাহ যখন শ্বাসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন মন শান্ত হয়, চেতনা স্থির হয়। শ্বাসের গতি ও মনের গতি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত; তাই শ্বাস ধীর হলে মনও শান্ত হয়।

পঞ্চম অঙ্গ-প্রত্যাহার, মানে ইন্দ্রিয়নিবর্তন—ইন্দ্রিয়গণকে বহির্জগত থেকে সরিয়ে নিয়ে চেতনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। যেমন কচ্ছপ বিপদে নিজের অঙ্গ টেনে নেয়, তেমনি মনও ইন্দ্রিয়ের টান থেকে সরে নিজের অন্তর্গত স্থিতিতে ফিরে যায়। এটি ধ্যানের প্রস্তুতি।

ষষ্ঠ অঙ্গ-ধারণা, মানে মনকে এক বিন্দুতে স্থির করা। মন তখন বিচলিত নয়, একটি নির্দিষ্ট চিন্তা, শব্দ বা প্রতীকেই নিবিষ্ট। মনোসংযমের এই একাগ্রতা ধ্যানের প্রথম ধাপ।

সপ্তম অঙ্গ-ধ্যান, অর্থাৎ একাগ্র মনোযোগের ধারাবাহিক প্রবাহ। এখানে চিন্তা, চিন্তন ও চেতনা একাকার হয়ে যায়। পতঞ্জলি বলেন, “তত্র প্রত্যয়একতানতা ধ্যানম্‌”—যখন মন এক বস্তুতে অবিচ্ছিন্নভাবে স্থির থাকে, সেটিই ধ্যান।

অষ্টম ও শেষ অঙ্গ-সমাধি, অর্থাৎ চেতনার চূড়ান্ত ঐক্য। এখানে জ্ঞাতা, জ্ঞান ও জ্ঞেয়ের ভেদ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। মন নিজের পরিচয় হারিয়ে কেবল সত্যের প্রতিফলন হয়ে থাকে—যেমন স্বচ্ছ আয়নায় শুধু প্রতিফলন থাকে, কিন্তু কোনো পৃথক সত্তা থাকে না। এই অবস্থাতেই যোগের পূর্ণতা, যেখানে ব্যক্তি আত্মা মিশে যায় পরম চেতনার সঙ্গে।

এই অষ্টাঙ্গ যোগ একটিমাত্র যাত্রার আটটি ধাপের মতো—শুরু হয় নৈতিক সংযম ও শৃঙ্খলা থেকে, শেষ হয় সমাধিতে, যেখানে মানুষ নিজের অন্তরের অনন্ত চেতনার সঙ্গে এক হয়ে যায়। বেদান্ত ও শৈব দর্শনের আলোকে, এই আট অঙ্গ বস্তুত চেতনার ক্রমান্বয়ে পরিশুদ্ধ ও অন্তর্মুখী হয়ে অদ্বৈত ব্রহ্মচেতনার ঐক্যে পৌঁছানোর ধারা, যেখানে বগলামুখীর স্থিরতা, ভুবনেশ্বরীর চিদাকাশ, ও কমলার পূর্ণতা একত্রে মিলিত হয়ে আত্মজাগরণের পরিণতি সম্পূর্ণ করে।

মাতঙ্গী: ইনি হলেন অন্তর্গত বাক্‌শক্তির দেবী—চেতনার সেই স্তর, যেখানে জ্ঞান, শব্দ ও অর্থ একত্রে প্রবাহিত হয়। তিনি সেই শক্তি, যিনি মনের গভীর নীরবতা থেকে শব্দের জন্ম ঘটান—যেখানে বাক্‌ আর কেবল উচ্চারণ নয়, বরং চেতনার সৃজনশক্তির প্রতিধ্বনি। তাঁর অবস্থান ভাষা, সংগীত, জ্ঞান ও কল্পনার সীমানায়; তাই তাঁকে বলা হয় “অন্তঃবাক্‌রূপা দেবী”—যিনি বাহিরের শব্দের আগে অন্তরের নাদ রূপে প্রকাশিত হন।