নাদব্রহ্ম ও শব্দব্রহ্মের সম্পর্ক কারণ ও ফল, বীজ ও বৃক্ষ, নীরবতা ও ধ্বনির মতো। নাদব্রহ্ম হলো আদি স্পন্দন—চেতনার অনাহত গুঞ্জন; শব্দব্রহ্ম হলো সেই স্পন্দনের প্রকাশিত রূপ—চেতনার সৃষ্টিশীল ধ্বনি। একটিতে ব্রহ্ম নীরব আত্মপ্রকাশ, অন্যটিতে তিনি সক্রিয় বিশ্বপ্রকাশ। দুটোই শেষপর্যন্ত একই সত্যের দুই দিক—চেতনার নিঃশব্দ গভীরতা ও তার উচ্চারিত প্রতিধ্বনি।
তন্ত্র ও কাশ্মীর শৈব দর্শনের ব্যাখ্যায় নাদব্রহ্ম মানে কেবল শ্রবণযোগ্য ধ্বনি নয়; এটি সেই সূক্ষ্ম স্পন্দন, যেখান থেকে শব্দ ও নীরবতা দুটোই উদ্ভূত। অভিনবগুপ্ত বলেন, “নাদঃ কুণ্ডলিনী শক্তিঃ প্রণবস্বরূপিণী”—অর্থাৎ, নাদই কুণ্ডলিনীশক্তি, যিনি প্রণব বা ওঁ-কারধ্বনির রূপে প্রকাশিত। এই কুণ্ডলিনীশক্তিই চেতনার অন্তর্গত কম্পন, যিনি নিজেকে ধ্বনি ও নীরবতার লীলায় প্রকাশ করেন। তাই বেদকে যখন বলা হয় নাদব্রহ্মস্বরূপ, তখন এর মানে দাঁড়ায়—বেদই সেই অনন্ত চেতনার অনন্ত কম্পন, যে-কম্পন থেকে বিশ্ব ও মন উভয়েরই জন্ম।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই নাদব্রহ্ম ধারণা আরও এক ধাপ গভীর। এখানে বলা হয়, প্রথমে ব্রহ্ম নিস্তরঙ্গ ও নির্গুণ অবস্থায় ছিলেন—সেই নিস্তরঙ্গ চেতনা নিজেই “ওঁ-কার” রূপে কম্পিত হন। ওঁ-কার ধ্বনি থেকেই সৃষ্টির সূচনা, তাই “ওঁ” শব্দকে বলা হয় “প্রণব”—অর্থাৎ “আদি নাদ”। তাই বলা হয়, “ওঁ ইতি এতদক্ষরং ব্রহ্ম”—এই ওঁ-ই ব্রহ্ম। এই ওঁ-কার থেকেই সমস্ত বেদের মন্ত্র উদ্ভূত; সেই কারণেই বেদকে বলা হয় নাদব্রহ্মরূপা।
এখানে “নাদব্রহ্ম” ও “শব্দব্রহ্ম” আসলে একই তত্ত্বের দুই দিক। “নাদ” হলো ব্রহ্মের অনাহত স্পন্দন—অব্যক্ত ও মৌন; আর “শব্দ” হলো তার প্রকাশিত রূপ—যেখানে সেই অনাহত স্পন্দন ভাষা, মন্ত্র ও শব্দে প্রকাশিত হয়েছে। তাই বলা হয়—“শব্দব্রহ্ম থেকে পরব্রহ্মে উত্তরণ”—অর্থাৎ শব্দের ধ্বনির মধ্য দিয়ে নীরব চেতনার উপলব্ধি। বেদ সেই উত্তরণের সেতু—যা শব্দের, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরেই নীরব ব্রহ্মের উপস্থিতি।
তাই “বেদা নাদব্রহ্মরূপা” কোনো নির্দিষ্ট শাস্ত্রবাক্য নয়, বরং এক গভীর দার্শনিক সিদ্ধান্ত। এটি বলে যে, বেদ মানে কেবল পাঠ্যগ্রন্থ নয়; তারা জীবন্ত চেতনার ধ্বনিরূপ বিকাশ। বেদপাঠ বা শ্রবণ মানে তাই কেবল বাক্য-উচ্চারণ নয়, বরং সেই শব্দের মধ্য দিয়ে নিজের চেতনার উৎসে ফিরে যাওয়া। কারণ শব্দই পথ, শব্দই প্রকাশ, আর শব্দের অন্তর্গত নীরবতাই চূড়ান্ত মুক্তি। সৃষ্টি যেমন শব্দে শুরু হয়, তেমনি মুক্তিও শব্দের মধ্য দিয়েই নীরবতায় মিশে যায়। শব্দই চেতনার প্রথম কম্পন, আর বেদ সেই চেতনার চিরন্তন প্রতিধ্বনি—যেখানে নাদই ব্রহ্ম, আর ব্রহ্মই নাদ।
অনাহত স্পন্দন ও আহত স্পন্দন—এই দুই পরিভাষা ভারতীয় নাদযোগ, তন্ত্র ও শব্দব্রহ্ম দর্শনের এক মৌলিক দ্বৈততা বোঝায়, যা চেতনার অন্তর্জাত ও বহির্জাত ধ্বনি-প্রবাহর পার্থক্য প্রকাশ করে। এই দুই স্তর একে অপরের পরিপূরক—অনাহত স্পন্দন হলো চেতনার নিঃশব্দ, আদি কম্পন, আর আহত স্পন্দন হলো সেই কম্পনের বাহ্যিক প্রতিধ্বনি, যা শব্দ, বাক্ ও ভাষার জগতে প্রকাশিত হয়।
তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে, “নাদম্ অনাহতং ধ্যায়েত্”—সাধক যেন সেই নাদের ধ্যান করে, যা আঘাত ছাড়াই শোনা যায়। “আহত” শব্দের আক্ষরিক অর্থ “আঘাতপ্রসূত”, অর্থাৎ দুটি বস্তুর সংঘর্ষে উৎপন্ন শব্দ। যখন বায়ু, কণ্ঠ, জিহ্বা ও জড় পদার্থের সংস্পর্শে শব্দ হয়—যেমন বাদ্যযন্ত্রে তার বা তবলার মাথা আঘাত পেলে ধ্বনি সৃষ্টি হয়—তা হলো আহত নাদ। কিন্তু অনাহত নাদ কোনো সংঘর্ষে জন্মায় না; এটি চেতনার অভ্যন্তরীণ অনুনাদ—যা হৃদয়ের গভীরে, কুণ্ডলিনীর উত্থানপথে, মেরুদণ্ডের কেন্দ্রীয় নাড়ি (সুষুম্না) বরাবর শোনা যায়।
দার্শনিকভাবে, অনাহত স্পন্দন হলো ব্রহ্মচেতনার আদিস্পন্দন। এটি সেই স্তর, যেখানে চেতনা এখনও শব্দ, অর্থ বা ভাবের রূপ নেয়নি; কেবল নিজের অস্তিত্বে তরঙ্গিত হচ্ছে। এই নীরব তরঙ্গকেই বলা হয় “নাদব্রহ্ম”—অপ্রকাশিত শব্দ। এটি এমন ধ্বনি, যা শ্রবণেন্দ্রিয়ের সীমার বাইরে—অন্তর্মুখ ধ্যানে অনুভবযোগ্য, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ অযোগ্য।
অন্যদিকে, আহত স্পন্দন হলো শব্দব্রহ্মের কার্যরূপ। যখন অনাহত চেতনা বহির্মুখ হয়ে প্রকাশ পায়, তখন তার স্পন্দন বায়ু ও পদার্থের সংস্পর্শে “আঘাতপ্রসূত” শব্দে পরিণত হয়। এই শব্দই আমাদের কথাবার্তা, সঙ্গীত, ধ্বনি ও ভাষার জগৎ। এটি চেতনার প্রকাশমান শক্তি—বিমর্শশক্তির রূপ, যা অর্থ, রূপ ও ভাব সৃষ্টি করে।
এই দুই স্তরকে যোগশাস্ত্র বলে “অন্তঃনাদ” ও “বহিঃনাদ।” অন্তঃনাদ বা অনাহত নাদ হলো চেতনার নীরব অনুরণন, যা হৃদয়, কণ্ঠ ও ভ্রূমধ্যের কেন্দ্রে অনুভূত হয়। বহিঃনাদ বা আহত নাদ হলো শারীরিক ধ্বনি, যা শ্রবণেন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে। এই দুইয়ের সম্পর্ক কারণ ও ফলের মতো—অনাহত স্পন্দন কারণ, আহত স্পন্দন তার প্রকাশ।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, অনাহত নাদ হলো অবচেতনের কম্পনক্ষেত্র—যেখানে ভাব ও অনুভূতি শব্দে পরিণত হওয়ার আগেই তরঙ্গরূপে থাকে। আহত নাদ হলো সচেতন প্রকাশ—যেখানে সেই অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ চিন্তা ও ভাষায় রূপান্তরিত হয়। ইউং-এর দৃষ্টিতে, অনাহত নাদ আত্মার archetypal resonance, আর আহত নাদ সেই resonance-এর symbolization।
কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর মনস্তত্ত্বের গভীরতম স্তরে যেমন “সামূহিক অচেতন” (Collective Unconscious) ধারণাটি মানবচেতনার আদিম ও সার্বজনীন স্তরকে উন্মোচিত করে, তেমনি ভারতীয় দর্শনের শব্দব্রহ্ম তত্ত্ব চেতনার আদি ও মৌলিক স্পন্দনের দর্শন। এই দুই ধারার সংলাপে এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি হয়—যেখানে পশ্চিমের মনস্তাত্ত্বিক প্রত্নরূপ (Archetype) এবং ভারতের আধ্যাত্মিক শব্দব্রহ্ম একে অপরকে আলোকিত করে।
ইয়ুং দেখিয়েছিলেন, প্রতিটি মানুষের গভীরে এমন এক সামূহিক স্তর আছে, যেখানে সমস্ত মানবজাতির অভিজ্ঞতার প্রত্নচিহ্ন জমা থাকে—একে তিনি বলেছিলেন “আদিম প্রত্নরূপের ক্ষেত্র” (Archetypal Field)। অন্যদিকে, ভারতীয় চেতনা-দর্শনে বলা হয়েছে, সমস্ত সৃষ্টির মূলে আছে শব্দব্রহ্ম—যে-শব্দ কোনো ভাষাগত বাচন নয়, বরং মহাজাগতিক চেতনার অনাদি স্পন্দন। এই দুই ধারাকে মিলিয়ে দেখা যায়, চেতনা নিজের ভিতরেই এক ধ্বনিময় প্রত্নরূপিক কম্পনে স্পন্দিত।
এই ঐক্যের ব্যাখ্যায় দুটি নাদের ধারণা মুখ্য—অনাহত নাদ এবং আহত নাদ। অনাহত নাদ অর্থাৎ ‘আঘাতহীন ধ্বনি’—এটি এমন এক অন্তঃস্থিত কম্পন, যা কোনো সংঘর্ষ বা বাহ্যিক ঘর্ষণ ছাড়াই চেতনার গভীরে প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হয়। যোগশাস্ত্র ও তন্ত্রে অনাহত নাদকে বলা হয়েছে পরা শব্দ, অর্থাৎ শব্দের আদিতম, সর্বোচ্চ ও অব্যক্ত রূপ। এটি কানে শোনা যায় না, অনুভব করা যায় অন্তঃস্থভাবে, যেমন ধ্যানমগ্ন সাধক অনুভব করেন হৃদয়ের গভীরে এক অনির্বচনীয় ধ্বনির প্রবাহ—যা সৃষ্টির পূর্বপ্রবাহ, অনাদি অনন্ত স্পন্দন। এই অনাহত নাদই মহাজাগতিক চেতনার শ্বাস, যার মধ্যে সম্ভাবনা হিসেবে নিহিত থাকে সমস্ত রূপ, সমস্ত ভাষা, সমস্ত প্রতীক। এটি কোনো নির্দিষ্ট রূপ নয়, বরং রূপের সম্ভাবনার আধার—যেখানে সব কিছু এখনও অপ্রকাশিত, কিন্তু প্রস্তুত।
ইয়ুং-এর মনস্তত্ত্বে অনাহত নাদকে বোঝানো যায় archetypal resonance হিসেবে—আত্মার সেই আদিম অনুরণন, যা সমগ্র মানবতার অন্তঃস্থলে সুপ্ত। এটি সামূহিক অচেতনের মৌলিক কম্পন, যেখানে প্রত্নরূপগুলি নিঃশব্দে আন্দোলিত হয়। এই প্রত্নরূপগুলি ভাষা ও সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে; তারা চেতনার শিকড়ে স্থিত সেই নীরব ধ্বনি, যেখান থেকে মানবচিন্তা, স্বপ্ন, পৌরাণিক কল্পনা ও ধর্মচেতনা উদ্ভূত হয়। অনাহত নাদ তাই এক প্রাক-মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা—চেতনার অব্যক্ত ও অরূপ উৎস, যা মানব-অস্তিত্বের প্রতিটি স্তরে প্রতিধ্বনিত।
যখন এই অনাহত স্পন্দন ভাষা, রূপ বা প্রতীকের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তা আহত নাদ হয়ে ওঠে—‘আঘাতজাত ধ্বনি’। এটি সেই ধ্বনি, যা সংঘর্ষ, কম্পন বা সংস্পর্শের ফলে জন্মায়—যেমন কথার শব্দ, মন্ত্র, সঙ্গীত, প্রকৃতির শব্দ, কিংবা মনের ভাবের উচ্চারণ। ভারতীয় দর্শনে এটি ব্যক্ত শব্দ, বৈখরী শব্দ, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। আহত নাদ হলো অনাহত নাদের প্রতীকী রূপ—অব্যক্ত চেতনার এক ভাষাগত ও রূপময় অভিব্যক্তি। যখন কবি গভীর অন্তর্দাহ বা প্রেমের অনুভূতিকে শব্দে প্রকাশ করেন, সেই শব্দ কেবল বাহ্যিক নয়—এটি তাঁর অন্তরের অনাহত স্পন্দনের প্রতীকায়ন। তেমনি যখন সাধক মন্ত্র উচ্চারণ করেন, তখন তাঁর মুখের ধ্বনি বাহ্যিক হলেও উৎস সেই অন্তর্গত অনাহত নাদ, যা ধ্বনি ও নীরবতার সীমা মুছে দেয়।
ইয়ুং-এর মনস্তত্ত্বে এই প্রক্রিয়াই প্রতীকায়নের (symbolization) রূপ—যেখানে অচেতন প্রত্নরূপ চেতনার মঞ্চে স্বপ্ন, প্রতীক বা শিল্পের রূপে প্রকাশিত হয়। এটি অনাহত থেকে আহতের গতি—অব্যক্ত থেকে ব্যক্তের যাত্রা। এই দুই স্তর চেতনার পরস্পর বিরোধী নয়; বরং একে অপরের সম্পূরক। অনাহত হলো কারণ—অসীম, অব্যক্ত, নিরাকার চেতনা; আহত হলো কার্য—তার প্রকাশিত রূপ, সসীম ও উপলব্ধ। একে অপরের মধ্যে প্রবাহমান সম্পর্ক রয়েছে, যেমন ঢেউ ও সাগর, আলো ও দীপ্তি, বা ভাব ও ভাষার মধ্যে আছে।
এই দর্শন আমাদের শেখায়, মানবচেতনা কখনও বিচ্ছিন্ন নয়—তার গভীরে নিত্য ধ্বনিত হচ্ছে সেই মহাজাগতিক অনাহত নাদ, যে নাদই সমস্ত অভিজ্ঞতা ও প্রকাশের উৎস। ইয়ুং যেমন দেখিয়েছিলেন যে, প্রতিটি মানব-আত্মা মূলত এক মহাসত্তার প্রতিচ্ছবি, তেমনি শব্দব্রহ্ম তত্ত্ব বলে—প্রত্যেক জীবের মধ্যে একই নাদ, একই ব্রহ্মস্পন্দন ক্রিয়াশীল। আহত নাদ সেই অভ্যন্তরীণ সুরের প্রকাশ; তাই মানুষের ভাষা, কবিতা, সংগীত বা প্রার্থনা সবই আসলে সেই অনাহত নাদেরই বহুবিধ প্রতিধ্বনি।
শেষপর্যন্ত বোঝা যায়, অনাহত ও আহত নাদ একে অপরের বিপরীত নয়, বরং একই চেতনার দুই ধারা। অনাহত হলো নীরবতার নাদ, আহত তার বাচনের সুর। অনাহত বলে, “আমি আছি”—আহত বলে, “আমি প্রকাশিত।” দুইয়ে মিলে সৃষ্টি, চেতনা ও ভাষার এক অনন্ত নৃত্য গঠন করে। এই নৃত্যই শব্দব্রহ্মের পরম রহস্য—যেখানে নীরবতা ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়, ধ্বনি আবার নীরবতায় ফিরে যায়; যেখানে আত্মা ও বিশ্ব, শূন্যতা ও পূর্ণতা, চিন্তা ও প্রকাশ এক অখণ্ড পরম অনুরণনে মিলিত হয়।
তন্ত্রে বলা হয়েছে, অনাহত নাদের সাধনা মানে চেতনার উৎসের দিকে ফেরা—যেখানে ধ্বনি, চিন্তা, ইন্দ্রিয় ও শ্বাস সব মিলিয়ে একাকার হয়। যখন সাধক সেই অন্তর্নিহিত নাদ শুনতে শুরু করে, তখন বহির্জগতের শব্দ ম্লান হয়ে যায়, মন স্থির হয়, আর চেতনা নিজের আদিস্বরূপে জাগে। এই অবস্থায় আহত শব্দ ধীরে ধীরে লীন হয় অনাহত শব্দে—এটাই নাদযোগের চূড়ান্ত একতা।
অতএব, অনাহত ও আহত স্পন্দনের মধ্যে পার্থক্য আসলে চেতনার গতি ও দিকের পার্থক্য। অনাহত স্পন্দন হলো অন্তর্জাত, নিস্তব্ধ, আদি ও আকাশময়; আহত স্পন্দন হলো বহির্মুখ, গতিশীল, সীমিত ও শারীরিক। একটিতে চেতনা নিজের মধ্যে অনুরণিত, অন্যটিতে সে নিজেকে প্রকাশ করছে।
উভয়ই একই চেতনার দুই ধাপ—অনাহত হলো নীরব ব্রহ্ম, আহত হলো প্রকাশিত ব্রহ্ম। যখন সচেতন মন আহত স্পন্দনকে অতিক্রম করে অনাহত নাদের স্তরে পৌঁছায়, তখন শব্দ ও নীরবতা এক হয়ে যায়, এবং মানুষ উপলব্ধি করে সেই চিরন্তন সত্য—চেতনা নিজেই শব্দ, শব্দই চেতনা।
নাদযোগ হলো ভারতীয় যোগ ও তন্ত্রশাস্ত্রের এমন এক গভীর সাধনা, যেখানে শব্দ বা নাদকে উপলক্ষ্য করে চেতনার আদি উৎসে ফিরে যাওয়া হয়। “নাদ” শব্দের অর্থ অনুনাদ, ধ্বনি, বা কম্পন, আর “যোগ” মানে মিলন বা ঐক্য। ফলে “নাদযোগ” আক্ষরিক অর্থে হলো চেতনার ধ্বনি-স্রোতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া—যেখানে সাধক বহির্জগতের শব্দ থেকে ক্রমে অন্তর্জগতের নিস্তব্ধ অনাহত নাদের দিকে অগ্রসর হয়, এবং সেই চেতনার অনুরণনের সঙ্গে মিশে যায়।