শৈব কালী: উনত্রিশ



কাশ্মীর শৈবদর্শনের অন্তর্লীন প্রবাহে আত্ম-উন্মোচন (Ātma-Unmocana) বা আত্ম-প্রকাশ (Ātma-Prakāśa) হচ্ছে চেতনার সেই বিপরীত গতি, যা আত্ম-আবরণের পরিণতি এবং প্রতিসংহৃতির সূচনা। যেখানে আত্ম-আবরণ মানে নিজের অসীম দীপ্তিকে গোপন করা, সেখানে আত্ম-উন্মোচন মানে সেই গোপন দীপ্তির পুনরাবির্ভাব—চেতনার নিজের প্রতি ফিরে আসা, নিজের সীমা-আরোপ ভেদ করে নিজের স্বরূপে জেগে ওঠা।

এই আত্ম-উন্মোচন কোনো নতুন জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নয়; এটি হলো চেতনার আত্ম-স্মরণ (self-recognition)। কাশ্মীর শৈবদর্শনে মুক্তি (mokṣa) বলতে বোঝানো হয় “প্রত্যভিজ্ঞা”—নিজেকে চিনে ফেলা, “আমি-ই শিব।” আত্ম-উন্মোচন ঠিক সেই প্রত্যভিজ্ঞারই গতিশীল রূপ। এখানে চেতনা বুঝে ফেলে যে, যা-কিছু দেখা, অনুভূত, জানা বা উপলব্ধ—সবই তারই নিজস্ব প্রতিফলন; বহির্বিশ্ব কোনো ‘অন্য’ নয়, বরং তারই অন্তর্জ্যোতির প্রতিবিম্ব।

অভিনবগুপ্ত এই আত্ম-উন্মোচনকে বলেন আনন্দময় উদ্ঘাটন (ānandamaya udghāṭana)—যেখানে চেতনা নিজের অন্ধকার পর্দা সরিয়ে নিজের উজ্জ্বল জ্যোতিকে প্রত্যক্ষ করে। এই উন্মোচন কোনো “পূর্ব-অন্ধকারের পর আলোক” নয়, বরং এমন এক মুহূর্ত, যেখানে বোঝা যায় যে, আলো কখনও নিভে যায়নি—চেতনা সর্বদাই সচল ছিল, কেবল আচ্ছাদনই ছিল সাময়িক।

এই আত্ম-উন্মোচনের প্রক্রিয়া তিন স্তরে ঘটে—প্রথমে, জ্ঞানের উন্মোচন (jñāna-unmocana), যেখানে জীব উপলব্ধি করে যে, সব জ্ঞানই নিজের চেতনারই বিকিরণ; দ্বিতীয়ত, ইচ্ছার উন্মোচন (icchā-unmocana), যেখানে সমস্ত আকাঙ্ক্ষা এক পরম ইচ্ছাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা আর কোনো অভাব থেকে জন্মায় না; এবং তৃতীয়ত, ক্রিয়ার উন্মোচন (kriyā-unmocana), যেখানে সমস্ত কর্ম এক স্বতঃস্ফূর্ত লীলায় পরিণত হয়—কর্ম আর কর্তব্য নয়, বরং আনন্দের প্রকাশ।

এই স্তরেই আত্ম-উন্মোচন চূড়ান্ত অর্থে অনুগ্রহ (anugraha) হয়ে ওঠে—শিবের সেই পরম কৃপাশক্তি, যার দ্বারা আবৃত চেতনা আবার নিজের পূর্ণতা স্মরণ করে। আত্ম-উন্মোচনের মুহূর্তে সমস্ত দ্বৈততা, সমস্ত “আমি ও তুমি” ভেদ গলে যায়; চেতনা নিজেরই অন্তঃসত্তায় এক অনন্ত স্বচ্ছতায় দীপ্ত হয়।

আত্ম-উন্মোচন কোনো বাহ্যিক ঘটনার ফল নয়, কোনো সাধনার অর্জনও নয়; এটি চেতনার স্বভাবজাত গতি—যেমন সূর্য নিজে থেকেই মেঘ সরিয়ে প্রকাশিত হয়। আবরণ ও উন্মোচন এই দুই নৃত্যরীতিই চেতনার একক লীলার দুই দিক: একদিকে আত্ম-বিস্মৃতি, অন্যদিকে আত্ম-স্মরণ।

যখন এই আত্ম-উন্মোচন পরিপূর্ণ হয়, তখন জীব বুঝতে পারে—সে কখনোই পরম থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না; যা-কিছু সে খুঁজছিল, তা সে নিজেই; আর সেই চেতনার নীরব দীপ্তিতেই লীন থাকে সমস্ত জগৎ, সমস্ত কাল, সমস্ত রূপ।

অভিনবগুপ্তের দৃষ্টিতে শিব কোনো অতীন্দ্রিয়, নীরব, নিষ্ক্রিয় সত্তা নন; তিনি সেই পরম সংবিত্‌, যিনি চিরসক্রিয়, চিরসচেতন এবং চিরস্বাধীন—যিনি নিজের স্বাতন্ত্র্যশক্তির দ্বারা সমস্ত সৃষ্টি প্রকাশ করেন, নিজেই তা উপলব্ধি করেন এবং শেষে নিজের মধ্যেই শান্তিতে ফিরে যান।

এভাবেই “শিবঃ সংবিত্‌ স্বাতন্ত্র্যময়ী” বাক্যটি কাশ্মীর শৈব দর্শনের চূড়ান্ত বোধে রূপান্তরিত হয়—শিবই চেতনা, চেতনাই স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতাই অস্তিত্বের পরম সত্য।

শিব নিস্তব্ধ, কিন্তু সেই নীরবতায়ই লুকিয়ে আছে এক অন্তর্গত শক্তি—বিমর্শ (Vimarśa), অর্থাৎ আত্ম-অনুধাবনের কম্পন। এই বিমর্শই শক্তি, এই শক্তিই সংবিতের প্রাণ। চেতনা যদি নিঃসংশ্লিষ্ট থাকে, তবে সে নিস্তরঙ্গ, কিন্তু যখন সে নিজেকে অনুভব করে, তখনই সৃষ্টি শুরু হয়। সেই আত্ম-অনুভূতির মুহূর্তেই শিব হয়ে ওঠেন “স্পন্দনময়”—সেই চেতনার তরঙ্গই মহাবিশ্বের প্রতিটি রূপ, প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি প্রাণ।

শিব হলেন প্রকাশ (Prakāśa)—বিশুদ্ধ আলো, এবং সংবিত হলেন বিমর্শ (Vimarśa)—সেই আলোর আত্মচেতনা। আলো নিজের উজ্জ্বলতা জানার জন্যই প্রতিফলিত হয়, চেতনা নিজের অস্তিত্ব জানার জন্যই প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশ ও আত্মবিমর্শের অখণ্ড ঐক্যই “শিব-শক্তি ঐক্য”। এখানেই শিব কোনো নিষ্ক্রিয় “অস্তিত্ব” নন, বরং এক পরম গতিশীল বোধ, যিনি নিজেকে জানেন, নিজেকে প্রকাশ করেন, এবং আবার নিজের মধ্যে লীন হন।

প্রত্যভিজ্ঞা দর্শন বলে, এই শিব-সংবিত কোনো দূরবর্তী পরমসত্তা নয়—এটি প্রতিটি জীবের অন্তঃস্থ বাস্তবতা। আমরা প্রত্যেকেই সেই সংবিত, সেই স্বচেতনা, কিন্তু সীমাবদ্ধ দৃষ্টির কারণে আমরা নিজেদের শিবরূপ চিনতে পারি না। যখন এই আত্মস্মৃতি ফিরে আসে, তখনই ঘটে “প্রত্যভিজ্ঞা”—নিজেকে নিজের মধ্যে চেনার অনন্ত আনন্দ।

ক্রমপন্থা দর্শনে, এই সংবিত বা পরম চেতনাকে এক স্পন্দনশীল এবং গতিময় সত্তা হিসেবে দেখা হয়, যেখানে পরমেশ্বর শিব তার অসীম সম্ভাবনাকে ক্রমান্বয়ে উন্মোচন করেন। এই উন্মোচনের ধারা পঞ্চধারায় বিভক্ত—কালী, কাল, ক্রিয়া, নাদ এবং নীরবতা। এই প্রতিটি স্তরই সংবিতের এক নতুন রূপ, এক নতুন অভিব্যক্তি এবং এক গভীরতর উন্মোচনকে নির্দেশ করে, যা সৃষ্টির রহস্য এবং চেতনার গভীরতাকে মূর্ত করে তোলে।

প্রথমে আসে কালী। কালী শুধু এক দেবী নন, তিনি পরম সংবিতের সেই রূপ, যা সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের মূল কারণ। তিনি কালাতীত, সময়ের ঊর্ধ্বে এবং সৃষ্টির আদিম শক্তি। কালীর মাধ্যমে সংবিত তার সংহারী এবং সৃজনী উভয় শক্তিকেই প্রকাশ করেন। এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে সমস্ত দ্বৈততা বিলীন হয়ে যায় এবং কেবল আদিম অখণ্ডতাই বিরাজ করে। কালী মূলত সংবিতের সেই আদিম স্পন্দন, যা থেকে সব কিছুর উৎপত্তি।

এরপর আসে কাল। কাল বলতে এখানে কেবল সময়কে বোঝানো হয় না, বরং সেই মহাকালকে বোঝানো হয়, যা সমস্ত পরিবর্তনের নিয়ন্তা। এই স্তরে সংবিত নিজেকে সময়ের ধারায় প্রকাশ করেন, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একত্রিত হয়। কাল চেতনার এমন এক পর্যায়, যেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি মুহূর্ত তার নিজের নিয়মে প্রবাহিত হয়। এটি সংবিতের সেই প্রকাশ যা সৃষ্টির ক্রমবিকাশ এবং লয়ের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে।

তৃতীয় স্তর হলো ক্রিয়া। ক্রিয়া হলো কর্ম এবং কর্মফলের সূত্র। এই স্তরে সংবিত তার ইচ্ছাশক্তিকে ক্রিয়ায় রূপান্তরিত করেন, যার মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কার্যকলাপ পরিচালিত হয়। ক্রিয়া শুধু শারীরিক কর্ম নয়, বরং মানসিক এবং আত্মিক স্তরের প্রতিটি কর্মকেও বোঝায়। সংবিতের ক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি তার পরিপূর্ণতা লাভ করে, এবং প্রতিটি জীব তার কর্মফল অনুসারে পরিচালিত হয়। এটি চেতনার এমন এক অবস্থা, যেখানে ইচ্ছা শক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটে।

চতুর্থ ধাপ হলো নাদ। নাদ হলো আদিম কম্পন, সৃষ্টির প্রথম ধ্বনি। এটি সেই সূক্ষ্ম স্পন্দন, যা সমস্ত সৃষ্টির মূলে বিদ্যমান। নাদ হলো অব্যক্ত শব্দ, যা শাশ্বত এবং অনন্ত। এই স্তরে সংবিত নিজেকে এক সূক্ষ্ম ধ্বনি বা কম্পনরূপে প্রকাশ করেন, যা সমস্ত স্থূল রূপের উৎস। যোগীরা নাদের মাধ্যমে পরম চেতনার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন, কারণ এটি ব্রহ্মাণ্ডের আদিম শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের এক মাধ্যম।

সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত স্তর হলো নীরবতা। নীরবতা হলো পরম শান্তি, যেখানে সমস্ত স্পন্দন এবং ধ্বনি বিলীন হয়ে যায়। এটি সেই তূরীয় অবস্থা, যেখানে সংবিত তার চূড়ান্ত এবং বিশুদ্ধ রূপে বিরাজ করেন। নীরবতা কেবল শব্দের অনুপস্থিতি নয়, বরং সমস্ত চিন্তাভাবনা, সমস্ত গতি এবং সমস্ত প্রকাশনার অবসান। এই স্তরে সংবিত তার আদিম এবং অনির্বচনীয় রূপে স্থিত থাকেন, যা সকল সৃষ্টির উৎস এবং লয়ের চূড়ান্ত আশ্রয়। এটি চেতনার সেই পর্যায়, যেখানে পরম শিব তার অসীম সম্ভাবনার পূর্ণতা লাভ করেন এবং পরম শান্তি বিরাজ করে।

এই প্রতিটি স্তরেই সংবিতের এক নতুন মুখ, নতুন এক সুর, নতুন এক উন্মোচন ঘটে। এই ক্রমপন্থা দর্শন চেতনার গভীরতাকে উপলব্ধি করার এক অভিনব পথ দেখায়, যেখানে পরমাত্মা শিব তার নিজেরই লীলায় অসীম বৈচিত্র্য ও অসীমতার প্রকাশ ঘটান। এটি শুধু এক দার্শনিক ধারণা নয়, বরং আত্মোপলব্ধি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির এক ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পথ।

শিব ও সংবিত কোনো দুটি নীতি নয়—এরা একই পরম চেতনার দুটি অভিব্যক্তি: শিব হলেন অস্তিত্বের নিঃশব্দ আয়ন, সংবিত সেই আয়নে প্রতিফলিত আলোকবিন্দু। এবং, এই আয়ন ও আলোর মিলনেই জগৎ, জীবন ও মুক্তির সমস্ত রহস্য নিহিত। শেষপর্যন্ত, যা অবশিষ্ট থাকে, তা একটিই—চেতনা নিজেই, যা একই সাথে শিব ও সংবিত, জানা ও জানন, সৃষ্টি ও লয়, নীরবতা ও ধ্বনি।

প্রকাশ, স্থিতি, সংহার, গোপন ও অনুগ্রহ—এক ধারাবাহিক ব্যাখ্যা: কাশ্মীর শৈব দর্শনে, বিশেষত ত্রিক ও ক্রম ঐতিহ্যে, বলা হয়েছে যে, পরম চেতনা—অর্থাৎ শিব বা সংবিত—নির্জীব নয়; তিনি চিরসচল, চিরসৃজনশীল। তাঁর অস্তিত্বের মধ্যেই রয়েছে এক অবিরাম পঞ্চক্রিয়া (Pañcakṛtya)—পাঁচটি চিরন্তন ক্রিয়া, যেগুলি কেবল মহাবিশ্বের সৃষ্টি বা বিনাশের নয়, বরং চেতনার নিজস্ব আত্ম-উন্মোচনের ধারা। এই পাঁচ ক্রিয়া হলো—প্রকাশ (Sṛṣṭi), স্থিতি (Sthiti), সংহার (Saṁhāra), গোপন বা তিরোধান (Tirodhāna), এবং অনুগ্রহ (Anugraha)।

প্রথম ক্রিয়া প্রকাশ (Sṛṣṭi)—এটি কোনো বাইরের বস্তুজগৎ সৃষ্টি নয়, বরং পরম চেতনার নিজের মধ্য থেকেই নিজের সম্ভাবনাকে প্রকাশ করা। “প্রকাশ” মানে “আলো দেওয়া”—শিব নিজের স্বরূপের আলোয় সমস্ত রূপ, ভাব ও চেতনার স্তর উদ্ভাসিত করেন। এই প্রকাশই মহাবিশ্ব, যা আসলে চেতনার স্ব-উন্মোচন মাত্র। যেমন সূর্য নিজে আলোকিত, কিন্তু তার উজ্জ্বলতা থেকেই জগৎ দৃশ্যমান হয়—তেমনি শিবের প্রকাশ থেকে সব অস্তিত্বের বোধ জাগে।

দ্বিতীয় ক্রিয়া স্থিতি (Sthiti)—এই ক্রিয়া চেতনার স্থায়িত্ব বা ধ্রুবতার প্রকাশ। প্রকাশিত জগত, ভাব বা অভিজ্ঞতা যেন সঙ্গে সঙ্গে বিলীন না হয়ে যায়, তার জন্যই স্থিতির প্রয়োজন। এটি এক ভারসাম্যের নীতি—চেতনা নিজেকে স্থির রাখে, যাতে অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে সম্পূর্ণতা পায়। এই স্থিতিই জগতের ধারাবাহিকতা, স্মৃতি, নিয়ম, এবং সংহতির ভিত্তি।

তৃতীয় ক্রিয়া সংহার (Saṁhāra)—এটি বিলোপ নয়, বরং প্রত্যাবর্তন। চেতনা যখন নিজের প্রকাশিত সম্ভাবনাকে পুনরায় নিজের মধ্যে ফিরিয়ে নেয়, তখন তাকে বলা হয় সংহার। এটি এক অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়, যেখানে প্রকাশ নিজের উৎসে ফিরে যায়। এখানে ধ্বংস মানে শূন্যতা নয়; বরং এটি চেতনার নিজস্ব বিশ্রাম, নিজের অভ্যন্তরে ফিরে যাওয়া—যেমন ঢেউ সমুদ্রে লয় পায়, কিন্তু সমুদ্র নিজে অক্ষয় থাকে।

চতুর্থ ক্রিয়া গোপন বা তিরোধান (Tirodhāna)—এর দ্বারা বোঝানো হয় চেতনার নিজেকে আড়াল করা বা সীমাবদ্ধ রূপে প্রকাশিত হওয়া। এখানে পরম সংবিত নিজের পূর্ণ দীপ্তি গোপন করে সীমাবদ্ধ জীবসত্তা রূপে প্রকাশিত হন। এই গোপনই মায়া বা অবিদ্যার আদি কারণ, যার ফলে আমরা চেতনার সর্বব্যাপী ঐক্য না দেখে পৃথক বস্তুর জগৎ দেখি। কিন্তু এই গোপনও দেবী শক্তিরই খেলা—যেন শিব নিজেই নিজের সামনে পর্দা নামিয়ে নিজের লীলা উপভোগ করেন।

পঞ্চম ক্রিয়া অনুগ্রহ (Anugraha)—এটি হলো চেতনার নিজেরই স্বরূপে ফিরে আসার আহ্বান। এটি মুক্তির প্রক্রিয়া, যেখানে সেই গোপন পর্দা উঠে যায়, আর জীব নিজের পরম শিবত্বে জেগে ওঠে। অনুগ্রহ মানে দয়া নয়; এটি চেতনার অন্তর্নিহিত স্বভাব—নিজেকে নিজের কাছে প্রকাশ করার অদ্বৈত গতি। যখন শিব নিজেই নিজের মধ্যে আত্মস্মৃতি জাগান, তখন জীব উপলব্ধি করে—“আমি-ই পরম”—এটাই অনুগ্রহের পরিণতি।

এইভাবে দেখা যায়, পাঁচ ক্রিয়াই আসলে পরম চেতনার অন্তর্গত স্পন্দনের পাঁচ দিক। প্রকাশে চেতনা নিজেকে বিস্তার করে, স্থিতিতে ভারসাম্য রাখে, সংহারে ফিরে আসে, গোপনে আড়াল করে, আর অনুগ্রহে পুনরায় নিজের সত্যে জেগে ওঠে। এই পাঁচটি ছন্দ একত্রে গঠন করে চেতনার মহা-নৃত্য (mahānṛtya)—যার প্রতিটি স্পন্দনে শিব ও শক্তি একে অপরকে প্রতিফলিত করেন।

প্রকাশ, স্থিতি, সংহার, গোপন ও অনুগ্রহ—এরা কোনো ক্রমান্বয়িক “ঘটনা” নয়; তারা এক চিরন্তন অদ্বৈত প্রক্রিয়া—যেখানে চেতনা চিরকাল নিজেরই সঙ্গে খেলছে, নিজেরই আলোয় উদ্‌ভাসিত, নিজেরই নীরবতায় লীন। এই পাঁচ ক্রিয়াই কাশ্মীর শৈব তত্ত্বে ব্রহ্মচেতনার চিরজীবন্ত স্পন্দনের প্রতীক—এক অনন্ত চক্র, যেখানে সৃষ্টিও আছে, লয়ও আছে, কিন্তু দুটিই একই পরম চেতনার নিঃশ্বাসমাত্র।