সে পশমের মতো নরম সেই আকাশটাকে আমার মাথার উপর টেনে দেয়। তার হাত আর আমার কাঁধের মাঝখানে আলোর ছোটো ছোটো কণারা নেচে ওঠে—মুহূর্তেই জন্মায়, আবার মুহূর্তেই নিভে যায়।
“ব্যথা লাগছে?”
আমি আস্তে বলি, এটা তোমার সঙ্গে যেন আমার একান্ত শবে-কদর—সেই রাত, যখন ভাগ্য ত্বকের ওপর লেখা হয়, যখন ফেরেশতারা নেমে আসে দু-জন মানুষের মাঝের এই সামান্য ফাঁকে এবং বিস্মিত হয়ে দেখে, এত অল্প জায়গায় এত আলো কীভাবে ধরে। কুরআনে বলা হয়েছে, শবে-কদর হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ—“লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর।” আর দুটো হৃদয়ের মাঝখানের একমুহূর্তও কি হাজার বছরের চেয়ে কম মূল্যবান?
সে অজান্তেই আমাকে ভেঙেও দিয়েছে, আবার গড়েও তুলেছে—এমন চুমু খেয়ে, যা একই সঙ্গে আরোগ্যও আনে, ভাঙনও আনে; এমন আলিঙ্গনে, যা একই সঙ্গে আতঙ্কও জাগায়, প্রশান্তিও দেয়।
গালিবের কবিতাতেও যেন এই একই সত্য প্রতিধ্বনিত হয়: ক্ষত আর উপশম দুটোই এসেছিল একই মুখ নিয়ে; আজও বুঝে উঠতে পারিনি, কাকে কৃতজ্ঞতা জানাব।
তাই দু-জনকেই ধন্যবাদ দাও। ক্ষতকে ধন্যবাদ দাও, কারণ সে ভেতরে একটি ফাটল খুলে দিয়েছে। আর মলমকে ধন্যবাদ দাও, কারণ সে শিখিয়েছে—সেই ফাটল কখনও ভুল ছিল না; সেটাই ছিল জানালা, যেখান দিয়ে আলো ভেতরে ঢোকে। ক্ষতহীন মানুষ যেন এক বন্ধ ঘর—বাইরে থেকে হয়তো সুন্দর, কিন্তু ভেতরে অন্ধকারে ঢাকা। ক্ষতই সেই ঘরের প্রথম জানালা—বেদনাময়, রক্তাক্ত, তবু জানালা। আর যে-আলো সেই জানালা দিয়ে ঢোকে, সে জানালার রক্তাক্ত ইতিহাস মনে রাখে না; সে শুধু ঘরটিকে ভরে তোলে আলোর উপস্থিতিতে। তখন ঘরটাও ভুলে যায়, সে কোনোদিন অন্ধকারে ছিল। এটাই নেয়ামত—যখন ক্ষত আলোর পথ হয়ে ওঠে, তখন সে আর কেবল ক্ষত থাকে না; সে হয়ে যায় মিহরাব, যেদিকে মুখ ফিরিয়ে প্রার্থনা সোজা কিবলার দিকে পৌঁছে যায়।
মীর তকি মীরের কবিতার আবহেও যেন এই কথাই শোনা যায়: ক্ষতের সবচেয়ে বড়ো অহংকার এই যে, সে সাক্ষ্য দেয়—এখানে কোনো একদিন সত্যিই কারও স্পর্শ এসে লেগেছিল।
সে জানতে চায়, কোন চাঁদের টানে তাঁর ভেতরে জোয়ার ওঠে; সে চায় নিজের সত্তাকে তাঁর ভাটা-জোয়ারের ছন্দের সঙ্গে মেলাতে। অথচ সে বুঝতে পারে না, সে নিজেই জোয়ার, নিজেই তটের বালি, নিজেই সেই সমুদ্র; কেবল একটিমাত্র তরঙ্গের প্রেমে পড়ে নিজের অসীমতাকে ভুলে গেছে, আর ভেবেছে—এই ছোট্ট ঢেউটুকুই আমার সমগ্র সত্তা।
মীরের কবিতার আবহে যেন শোনা যায়: যে-সমুদ্র ভালোবাসার জন্য একটি তরঙ্গের খোঁজ করে, সে এখনও বুঝে ওঠেনি, প্রতিটি তরঙ্গ আসলে সমুদ্রের নিজেরই নিজের কাছে উচ্চারিত স্বীকারোক্তি।
শঙ্কর হয়তো এখানে মৃদু হেসে বলতেন, এটাই অধ্যাস: তরঙ্গ নিজেকে সমুদ্র থেকে পৃথক ভাবছে। অথচ তরঙ্গ ও সমুদ্রের মধ্যে প্রকৃত কোনো ভেদ নেই; ভিন্নতা কেবল নামের, রূপের; সারতত্ত্বে তারা একই জল। অদ্বৈত বেদান্ত এই সত্যকে বিবর্তবাদ বা আভাসিক প্রকাশের ভাষায় বোঝায়: সমুদ্র থেকে তরঙ্গ উঠলে সমুদ্রের কিছু হারায় না; সোনা দিয়ে অলংকার গড়লে সোনার স্বরূপ বদলে যায় না; তেমনি ব্রহ্ম থেকে জগৎ প্রকাশিত হলেও ব্রহ্মের কোনো ক্ষয় ঘটে না। জগৎ ব্রহ্মেরই এক আভাস, এক প্রকাশমান রূপ—যেমন দড়িতে সাপের ভ্রম দেখা দিলেও দড়ি বদলে যায় না, তেমনি জগৎও ব্রহ্মকে বদলায় না। তরঙ্গ সমুদ্রের বাইরে কিছু নয়; সে সমুদ্রেরই এক ভঙ্গি, এক লীলা, এক নৃত্য। তাই প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মধ্যে যে-বিচ্ছেদের অনুভূতি জাগে, সেটিও শেষপর্যন্ত এক আভাসমাত্র, এক লীলাময় বিভ্রম—সত্তার গভীরে কোথাও কোনো বিচ্ছেদ নেই।
নিচের কিছু অংশ ধীরে পড়ো, তাড়াহুড়ো করে নয়। যেন প্রতিটি বাক্য তোমার ভেতরে একটি আলাদা দরজা খুলে দেয়, আর প্রতিটি দরজার ওপারে আরেকটি নীরব কক্ষ অপেক্ষা করে আছে। এর কারণ, কিছু সত্য আছে, যেগুলো একবারে বোঝা যায় না; সেগুলোকে শ্বাসের মতো গ্রহণ করতে হয়, বিরতির মতো বহন করতে হয়, এবং ধীরে ধীরে হৃদয়ের রক্তে মিশতে দিতে হয়।
কখনো কখনো এমন ঘটে: একদিন এক অচেনা মানুষ আসে, আর তোমার ভেতরের এমন এক স্তর তার ভেতরের এমন এক স্তরকে চিনে ফেলে, যার সঙ্গে তোমার আগে কোনো ভাষায় পরিচয় ছিল না, অথচ অদ্ভুতভাবে মনে হয়—এ চিনতে ভুল হওয়ার নয়। যেন সে নতুন নয়, বরং বহুদিনের হারানো কোনো সুর, যা হঠাৎ আবার শোনা গেল। সে তোমার কাছে শুধু চোখের দূরত্বে বা শরীরের সান্নিধ্যে আসে না; সে এসে দাঁড়ায় এমন এক অন্তরঙ্গ স্থানে, যা নিঃশ্বাসেরও ভেতরে, যেখানে মানুষ সাধারণত কাউকে পৌঁছতে দেয় না। কুরআনের ভাষায়, “আমরা তার শাহরগ থেকেও নিকটে”—এই নৈকট্য কেবল আল্লাহ্র সত্তাগত নৈকট্যের কথা বলে না; কখনো কখনো সেই রহস্যময় নৈকট্যের একটি ক্ষীণ প্রতিফলনও মানুষের মধ্যে অনুভূত হয়। তখন মনে হয়, কোনো মানুষ হঠাৎ মানুষ-থাকার সীমা ছাড়িয়ে একটি উপস্থিতিতে পরিণত হয়েছে।
মনে হয় যেন তোমার বুকের হাড়গুলো কেবল শরীরকে রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়নি; তারা যেন বহু আগে থেকেই একটি শূন্য, অপেক্ষমাণ ঘরকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল। এতদিন সেই ঘরটি খালি ছিল, অথচ তুমি জানতেই না, কী অনুপস্থিত। তারপর একদিন এই মানুষটি এসে সেই ভেতরের শূন্যতায় নীরবে বসে পড়ে, আর তখন ঘরটি প্রথম বার বুঝতে পারে, তার অস্তিত্বের কারণ ছিল এই আগমন, এই পূর্ণতা, এই অদৃশ্য বসে-পড়া। যেমন একটি বীণার তার বছরের পর বছর টানটান হয়ে থাকে—নীরব, স্তব্ধ, অনুচ্চারিত, কিন্তু সত্যিকার অর্থে সে কখনোই মৃত নীরবতায় ছিল না; সে ছিল প্রতীক্ষায়। যখন একদিন কোনো আঙুল তাকে স্পর্শ করে, তখন সে শব্দ তোলে, আর সেই শব্দে প্রকাশ পায়: সে এতদিন চুপ ছিল না, সে অপেক্ষা করছিল। নীরবতা আর অপেক্ষা বাইরে থেকে একরকম মনে হতে পারে, কিন্তু তাদের অন্তর্গত সত্য ভিন্ন। নীরবতা শূন্যতার মতো; অপেক্ষা পূর্ণতার মতো। অপেক্ষা জানে, কেউ আসবে। কখন আসবে, কোন রূপে আসবে, কোন নামে আসবে, তা সে জানে না; কিন্তু আগমনের সত্য সে জানে।
হয়তো এই কারণেই কিছু মানুষকে আমরা কেবল মানুষ বলে অনুভব করি না। মনে হয়, তারা যেন তাদের সঙ্গে আরও কিছু বহন করে এনেছে—একটি হালকা, অদৃশ্য, কিন্তু নিশ্চিত আলোকরেখা; যেন তাদের কণ্ঠে আরেকটি সুর আছে, তাদের উপস্থিতিতে আরেকটি রহস্য আছে। মনে হয়, তারা হয়তো একটি ফেরেশতা বহন করে, অথবা নিজেরাই কোনো ফেরেশতাময় কাজের বাহক হয়ে এসেছে। গীতায় কৃষ্ণ বলেন, যখন ধর্মের হানি ঘটে, যখন অধর্ম বেড়ে ওঠে, তখন তিনি যুগে যুগে আবির্ভূত হন—রক্ষার জন্য, ধ্বংসের জন্য, পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য।
এই আবির্ভাবকে আমরা প্রায়ই বৃহৎ ঐতিহাসিক মুহূর্তে, বিশ্ব-বদলে-দেওয়া অবতারে কল্পনা করি। কিন্তু হয়তো সেই অবতরণ কেবল যুগান্তরের মহাকাব্যিক পরিসরেই ঘটে না; হয়তো মানুষের একান্ত জীবনেও ঘটে তার ছোট, নিভৃত, কিন্তু নির্ধারক রূপে। কখনো একটি মুখ হয়ে, কখনো একটি কণ্ঠ হয়ে, কখনো একটি স্পর্শ হয়ে, কখনো একটি বাক্য হয়ে। যখন একজন ক্লান্ত, ভেঙে-পড়া, পথহারা মানুষ হঠাৎ এমন কারও সাক্ষাৎ পায়, যে তাকে নিজের অজান্তে আবার ভিতরে ফিরিয়ে দেয়, তখন কি সেটাও একধরনের অবতরণ নয়? সুফিরা হয়তো বলবেন, যখন আত্মা পথ হারায়, তখন আল্লাহ্ তাকে পরিত্যাগ করেন না; তিনি কারও না কারও রূপে সাহায্য পাঠান। কখনো সেই সাহায্য মানুষ হয়ে আসে, কখনো বাতাসে একটি ইশারা হয়ে, কখনো একটি বইয়ের লাইন হয়ে, কখনো ঘুম আর জাগরণের মাঝের কোনো স্বপ্ন হয়ে।
এই আগমন সবসময় কোমল হয় না। অনেকসময় ফেরেশতার কাজ আদর করা নয়, উদ্ধার করা; আর উদ্ধার কখনো কখনো ভাঙনের মধ্য দিয়েই আসে। এই সত্যের এক গভীর উদাহরণ মুসা (আ.) ও খিজিরের কাহিনি। খিজির যা করেন, তা প্রথম দৃষ্টিতে নির্মম, অন্যায়, এমনকি অগ্রহণযোগ্য মনে হয়। নৌকা ভেঙে দেওয়া—ক্ষতি। এক বালকের মৃত্যু—অসহনীয় রহস্য। একটি দেয়াল মেরামত করা—অদ্ভুত, অর্থহীন শ্রম। মুসা প্রশ্ন করেন, প্রতিবাদ করেন, ব্যথিত হন। কারণ তাৎক্ষণিক দৃষ্টিতে করুণা সবসময় করুণার মতো দেখায় না। কিন্তু পরে স্পষ্ট হয়: যা ভাঙা হয়েছিল, তা বৃহত্তর বিপদ থেকে রক্ষার জন্য; যা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা ভবিষ্যতের অনিষ্ট ঠেকানোর জন্য; যা গড়ে দেওয়া হয়েছিল, তা অদেখা কল্যাণ সংরক্ষণের জন্য। অর্থাৎ রহস্যময় দয়া প্রায়ই মানুষের বোধের ঠিক বাইরে কাজ করে। ফেরেশতার কাজও তেমন হতে পারে। সে সবসময় তোমাকে যা চাইছ তা দেয় না; বরং যা তোমাকে বাঁচাবে, তা-ই দেয়—যদিও সেই দান প্রথমে আঘাতের মতো লাগে। সে ভেঙে দেয় এমন কিছু, যাকে তুমি আশ্রয় ভেবেছিলে; সরিয়ে দেয় এমন কিছু, যাকে তুমি প্রয়োজন মনে করেছিলে; আর তৈরি করে এমন কিছু, যার মূল্য তুমি তখনো বুঝতে শেখোনি।
এই কারণেই কিছু বিচ্ছেদ পরে আশীর্বাদ বলে বোঝা যায়। কিছু হারানো পরে রক্ষা বলে ধরা পড়ে। কিছু প্রত্যাখ্যান পরে পথনির্দেশ হয়ে ওঠে। কিন্তু মানুষ সেই মুহূর্তে তা দেখে না। সে কাঁদে, অভিযোগ করে, প্রশ্ন তোলে, যেমন মুসা করেছিলেন। কারণ তাৎক্ষণিক চোখের একটি সীমা আছে; হৃদয়েরও একটি সময় লাগে। পরে, অনেক পরে, মানুষ ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারে—যে-দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেটি তাকে বন্দি হওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল; যে-সম্পর্কটি ভেঙে গিয়েছিল, সেটি তাকে এমন এক নির্ভরতা থেকে সরিয়েছিল যা তার আত্মাকে ক্ষয় করছিল; যে-শূন্যতা এসেছিল, সেটাই তার ভেতরে নতুন গ্রহণক্ষমতা তৈরি করেছিল। তখন বোঝা যায়, প্রতিটি ক্ষত নিছক শাস্তি ছিল না; অনেক ক্ষতই ছিল সুরক্ষা, পুনর্গঠন, পুনর্নির্দেশ।
ফেরেশতার শিক্ষা তাই প্রায়ই ব্যথায় মোড়ানো থাকে। সে সরাসরি এসে বলে না, “আমি তোমাকে রক্ষা করতে এসেছি।” বরং সে এমন এক অভিজ্ঞতা এনে দেয়, যার মধ্য দিয়ে তোমার পুরোনো চামড়া ফেটে যায়। কারণ যা সহজে আসে, তা সহজে চলে যায়; কিন্তু যা কষ্টের ভিতর দিয়ে আসে, তা হাড়ে গেঁথে যায়, রক্তে বসে যায়, চরিত্রে রূপ নেয়। মুক্তোর মতো—ঝিনুকের শরীরে ঢুকে পড়া সামান্য একটি বালুকণা প্রথমে কেবল যন্ত্রণা। কিন্তু সেই যন্ত্রণাকে ঘিরে ঘিরে স্তর জমে, সুরক্ষা জমে, রূপ জমে, দীপ্তি জমে, আর শেষে যা জন্মায়, তাকে আমরা সৌন্দর্য বলি। অথচ সেই সৌন্দর্যের গভীরে আছে দীর্ঘ সহ্য, নিঃশব্দ অস্বস্তি, আর ব্যথাকে রূপান্তর করার এক অদৃশ্য প্রক্রিয়া। ফেরেশতার শিক্ষাও তেমন—তা ব্যথাকে অস্বীকার করে না; তা ব্যথার ভেতরেই অর্থ বুনে দেয়।
শূন্যের সপ্তক: ১৭
লেখাটি শেয়ার করুন