মাকাম-ই-রিদা: সন্তুষ্টির আগুন
রিদা—যেখানে আত্মা আর প্রতিবাদ করে না, বরং আগুনকে স্বাগত জানায়—কারণ আগুনই পরিশোধন।
‘আমি’ শব্দের প্রেমে পড়ার আগে, অস্তমিত সূর্যের রঙে মুগ্ধ হওয়ার আগে, পাখির গানে হারিয়ে যাওয়ার আগে—তোমার মধ্যেই পড়েছিলাম প্রথম। আর পড়তে পড়তে আবিষ্কার করলাম—মাটি নেই; শুধু একটা আকাশ—যা আমার নিচে অপেক্ষা করছিল সবসময়, অতল গহ্বরের ছদ্মবেশে।
এখানে "পড়া" দুটো অর্থে কাজ করে—প্রেমে পড়া আর পতন। প্রেমের প্রথম স্পর্শে মানুষ মনে করে, সে পড়ে যাচ্ছে—মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের তলা থেকে। কিন্তু আসলে মাটি কখনও ছিল না—ছিল আকাশ, অতল গহ্বরের ছদ্মবেশে। যাকে পতন ভেবে ভয় পেয়েছিলাম, সেটা ছিল উড্ডয়ন—কেবল দিকটা উলটো ছিল।
ফখরুদ্দিন ইরাকি ছিলেন হামাদানের একজন সুফি কবি। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লামাআত’—যার অর্থ ‘ঐশী আলোকচ্ছটা’ বা দিব্য ঝলক—তিনি রচনা করেন সদরুদ্দিন কুনাউইর সান্নিধ্যে/সোহবতে। কুনাউই ছিলেন ইবনে আরাবির শিষ্য। সেখানে তিনি এই ভাবই ধ্বনিত করেন: প্রেমের প্রথম স্পর্শে মানুষ পড়ে না, সে উড়তে ভুলে যায়—আর ভোলাটাই পতন, আর স্মরণটাই ওড়া।
ইগল যখন বাচ্চাকে বাসা থেকে ফেলে দেয়, বাচ্চা মনে করে, সে মরছে—কিন্তু পড়তে পড়তে সে ডানা খোলে, আর পতনের মাঝপথে আবিষ্কার করে: আমি উড়ছি। প্রতিটি পতন এমনই—ডানা খোলার অজুহাত। যে-ভূমি সরে যায়, তা কেবলই নিরাপত্তা নয়; অনেকসময় খাঁচাও বটে।
মনসুর যখন মৃত্যুর পথে এগোচ্ছিলেন, তখনও তাঁর মুখে হাসি ছিল—কারণ তিনি জানতেন, যাকে জগৎ পতন বলছে, তিনি তাকে বলছেন মি'রাজ।
কুরআনে সূরা আল-ইসরা (১৭:১)-তে আল্লাহ্ বলেন: "সুবহানাল্লাযি আসরা বি-আবদিহি লাইলান"—পবিত্র তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন। রাতে—দিনে নয়। অন্ধকারে—আলোতে নয়। কারণ ঊর্ধ্বগমনের জন্য অন্ধকার লাগে, যেমন বীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য মাটির গভীরতা লাগে। যে পতনকে ভয় পায়, সে আসলে ঊর্ধ্বগমনকে ভয় পায়—কারণ দুটোর কোনোটাতেই মাটি থাকে না পায়ের তলায়।
রবীন্দ্রনাথ ভাবছেন: "মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে—মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।" কিন্তু সুফিরা বলছেন: মরাটাই বাঁচা। ফানা-ই-ফানা—বিলুপ্তির বিলুপ্তি—যেখানে তুমি এতটাই মিশে যাও যে, "মিশে যাওয়া" শব্দটাও আর প্রযোজ্য নয়, কারণ আলাদা কেউ ছিল না, যে মিশবে। ফানা নিছক বিনাশ নয়—সীমানা-অতিক্রম। "আমি" নামের খোলস ভেঙে যাওয়া মানে সীমিত সত্তা থেকে অসীমতর সত্তায় উত্তরণ। আগুন তখন আর দণ্ড নয়—মানুষ ভস্ম না হয়ে সুগন্ধি ধূপের মতো উঠতে শেখে।
দোঁহা: পতন বলে ভয় যারে, ঊর্ধ্বে তারা চলে; মাটি ছাড়া পায়ের তলে—আকাশ পায় বলে।
এর সরল অর্থ: যারা “পতন” বা পড়ে যাওয়াকে ভয় পায় না, তারাই আসলে উপরে উঠতে পারে। কারণ আকাশে উঠতে হলে, উড্ডয়নের জন্য, মানুষের পা মাটির বাঁধন থেকে কিছুটা মুক্ত হতে হয়। অর্থাৎ নিরাপদ, স্থির, পরিচিত জমি আঁকড়ে থাকলে উচ্চতায় ওঠা যায় না; ঝুঁকি নিতেই হয়। তখনই “মাটি ছাড়া পায়ের তলে—আকাশ পায় বলে”—পায়ের নিচে আর মাটি থাকে না, কিন্তু বিনিময়ে আকাশ পাওয়া যায়।
আরও গভীর অর্থে: জীবনে বড়ো প্রাপ্তি, বড়ো উত্তরণ, বড়ো সৃজন, বড়ো সাধনা—সব কিছুরই সঙ্গে অনিশ্চয়তা জড়িত। যে কেবল নিরাপত্তা চায়, সে উচ্চতা পায় না; যে পতনের আশঙ্কা সত্ত্বেও এগোয়, সে-ই আকাশ স্পর্শ করে।
বারযাখ: দুই সমুদ্রের মধ্যবর্তী নৈঃশব্দ্য
যখন কথা ফুরিয়ে যায়, তিনি চেষ্টা করেন না, আমিও করি না। আমরা সমান। তিনি শুধু আছেন। আমি শুধু আছি। আর সত্তার এই দরবারে, কখনো কখনো এটুকুই পুরো শাস্ত্র।
এ এক নীরব মুহূর্ত। কথা শেষ হয়ে গেছে। ব্যাখ্যা শেষ। তত্ত্ব শেষ। যুক্তি শেষ। অবশিষ্ট আছে শুধু উপস্থিতি—তিনি আছেন, আমি আছি। এই "আছি"-ই পুরো শাস্ত্র। নদী নলখাগড়াকে ব্যাখ্যা দেয় না—সে কেবল প্রবাহিত হয়, আর নলখাগড়া গাইতে শুরু করে।
ইবনে আরাবির তত্ত্বে এই অবস্থার নাম বারযাখ—দুইয়ের মধ্যবর্তী স্থান। ভূগোলের ভাষায় ইস্থমাস—যা দুই সমুদ্রকে আলাদা করে, কিন্তু দুই স্থলভাগকে জুড়ে দেয়। কুরআনে (সূরা আর-রহমান ৫৫:১৯-২০): "মারাজাল বাহরাইনি ইয়ালতাকিয়ান, বাইনাহুমা বারযাখুন লা ইয়াবগিয়ান"—তিনি দুই সমুদ্র ছেড়ে দিয়েছেন, তারা মিলিত হয়, তাদের মধ্যে একটি আড়াল, যা তারা অতিক্রম করে না। প্রেমে এই বারযাখটাই সুন্দরতম স্থান—যেখানে "দুই" একটা ভ্রম, "এক" একটা সত্য, আর সেই সত্য ভাষায় ধরা যায় না, কেবল নৈঃশব্দ্যে অনুভব করা যায়।
মাণ্ডূক্য উপনিষদের তুরীয়র সঙ্গে এর একটি দূর কাব্যিক অনুরণন টানা যায়—কারণ তুরীয়ও ভেদের অতিরিক্ত এক চৈতন্যাবস্থার নাম—তবে দুটো পরিভাষার নিজস্ব দর্শনগত গৃহ আলাদা।
শ্বাস নেওয়া আর ছাড়ার মাঝখানে একটুখানি ফাঁক থাকে। সেই ফাঁকটুকুতে তুমি শ্বাস নিচ্ছও না, ছাড়ছও না—তুমি কেবল আছ। সেই "কেবল আছ"-ই বারযাখ। সেই "কেবল আছ"-ই তুরীয়। সেই "কেবল আছ"-ই প্রেমের সবচেয়ে সত্য মুহূর্ত—যেখানে তুমি না ধরছ, না ছাড়ছ—কেবল উপস্থিত।
সামা, কাওয়ালি ও সুরের পরম্পরা
রুমির প্রিয়তম শমসের বিদায়ের পর রুমি যে-কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন, সেটির নাম ‘দিওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজি’, সেখানে প্রেমের উন্মত্ততা এমন শিখরে পৌঁছায় যে, শব্দ আর শব্দ থাকে না, শব্দ হয়ে যায় নৃত্য। সেই নৃত্যই সামা—মরমি শ্রবণ।
সামা থেকেই জন্ম নিয়েছিল মৌলবিয়া তরীকা—ঘূর্ণায়মান দরবেশদের সম্প্রদায়। সাধক ঘুরতে থাকেন নিজের অক্ষে—ডান হাত আকাশের দিকে (গ্রহণ), বাম হাত মাটির দিকে (বিতরণ), আর হৃদয় কেন্দ্রে—সেই কেন্দ্র, যা ঘোরে না, যা স্থির। ঘূর্ণনের ভেতরে স্থিরতা—এটাই সামার রহস্য। সংসারে থেকেও সংসারের অতীত থাকার সাধনা।
প্রতিটি সুফি তরীকা একটি ভিন্ন সুর—কিন্তু রাগ একটিই। কাদিরিয়া তরীকায় (আব্দুল কাদির জিলানি, ১০৭৮-১১৬৬, বাগদাদ) যিকির আর খিদমার (সেবা) ওপর জোর; সুহরাওয়ার্দিয়া তরীকায় আত্মশুদ্ধি আর শরীয়া-পালনের ভেতর দিয়ে আধ্যাত্মিক উন্নয়ন; আর সেই সুরের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহন হচ্ছে কাওয়ালি, যা চিশতিয়া তরীকার আধ্যাত্মিক সংগীত। গায়কদল ঢোলক, তবলা, হারমোনিয়াম আর তালির ছন্দে আল্লাহ্র নাম, নবীর প্রশংসা, আর প্রেমের কবিতা গায়—আর শ্রোতারা ক্রমশ নিজেদের হারিয়ে ফেলেন। কেউ কাঁদেন, কেউ দোলেন, কেউ ‘হাল’-এ চলে যান—কারণ সংগীত সেই ভাষা, যা বুদ্ধিকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছায়। মানুষ তখন আর গান শোনে না—গান তাকে শুনতে শুরু করে। নাম তখন আর উচ্চারিত হয় না—নাম মানুষকে উচ্চারণ করতে থাকে।
খুসরো নিজে কাওয়ালির আদিরূপ তৈরি করেছিলেন নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরবারে—ফারসি, হিন্দাভি আর আরবি মিশিয়ে এমন এক সংগীত, যা ভাষার সীমানা ভেঙে দেয়। নলখাগড়ার কান্না কি কাওয়ালি নয়? সে-ও তো বাতাসের ছন্দে নিজের বিচ্ছেদের গান গায়—আর যে শোনে, সে কাঁদে, কারণ সে চিনতে পারে নিজের বিচ্ছেদকে সেই সুরে।
ভারতীয় পরম্পরায় এর নিকটতম অনুরণন নাদব্রহ্ম—শব্দই ব্রহ্ম—যেখানে ওঁকারের ধ্বনিতে সমগ্র সৃষ্টি কম্পমান। আর চৈতন্যদেবের সংকীর্তন আন্দোলনের কীর্তন—সেখানে নাম-কীর্তনের মাধ্যমে ভক্ত ভগবানে বিলীন হন, ঠিক যেমন সামায় সুফিগণ আল্লাহ্তে বিলীন হন। সংগীত ভাষার চেয়ে বড়ো—কারণ ভাষা বুদ্ধির দরজা দিয়ে ঢোকে, কিন্তু সংগীত হৃদয়ের জানালা দিয়ে। আর সেই জানালা সর্বদা খোলা—শুধু আমরা সেদিকে তাকাই না।
তসবিহ: জপমালা ও নীরব স্মরণ
আমি দম আটকে ধরি, দশ পর্যন্ত গুনি। বসি, দাঁড়াই, আবার বসি। কাফেলাগুলো মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে—পথিক, যারা জানে না, তারা পথ চলছে; মেঘ, যারা জানে না, তারা মেঘ।
এই লাইনে অপেক্ষার ক্লান্তি আছে। মানুষ দম আটকে ধরে—কারণ শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। দশ পর্যন্ত গোনে—কারণ দশের পর কী করবে, জানে না। বসে, দাঁড়ায়, আবার বসে—কারণ কোনো ভঙ্গিতেই শান্তি নেই। আর মাথার ওপর দিয়ে মেঘ যায়—পথিকের মতো, যারা জানে না, তারা কোথায় যাচ্ছে। মানুষও তেমন—চলছে, কিন্তু জানে না, কেন চলছে।
তসবিহর দানা ঘোরে—প্রতিটি দানা একটি যিকির, আল্লাহ্র নাম স্মরণ। যিকিরের দুই রূপ: যিকির-ই-জাহর—উচ্চকণ্ঠে স্মরণ—চিশতিয়া তরীকায় প্রচলিত, যেখানে সমবেত কণ্ঠে "আল্লাহু, আল্লাহু" ধ্বনিত হয়, দেহ দোলে, আত্মা জাগে। আর যিকির-ই-খাফি—নীরব স্মরণ—নকশবন্দিয়া তরীকায় প্রচলিত, যেখানে শ্বাসের সাথে হৃদয়ে "আল-লাহ্" চলে—কেউ জানে না, কেউ শোনে না—কেবল কলব জানে। একটি আগুনের পথ, একটি আলোর। একটি উচ্চকণ্ঠ নদীর, একটি ভূগর্ভস্থ ঝরনার।
রেশমকীট তার পরিশ্রমের বিজ্ঞাপন দেয় না। সে কেবল সুতো হয়ে যায়। আর সুতো হয়ে যাওয়াটাই তার সমস্ত বক্তব্য। বাউলেরা বলেন—সব কিছুর ভেতর একজনই বলছেন, একজনই শুনছেন—আমি কেবল সুতো, তিনি তাঁত।
মারাঠি সন্তকবি তুকারাম (আনুমানিক ১৬০৮-১৬৫০) দেহু গ্রামের কীর্তনকার, তাঁর অভঙ্গ আজও মহারাষ্ট্রের প্রতিটি বাড়িতে গাওয়া হয়। তাঁর অভঙ্গে এই সুর আছে: বীজ বপন করেছি পরমার্থের ক্ষেতে, শ্রম আমার নয়—ফসলও আমার নয়; আমি কেবল হাত, কৃষক তিনিই, যিনি বৃষ্টি পাঠান।
যিকিরের পুনরাবৃত্তি মানুষকে তার বিকেন্দ্রিকতা থেকে ফেরায়—ছিন্নমনা সত্তাকে কেন্দ্রে ফেরানোর বৃত্ত। প্রত্যাবর্তন একবারে ঘটে না—দানায় দানায়, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে সম্পন্ন হয়। তসবিহ তাই ভাঙা সেতু জোড়া লাগানোর কাজ—মানুষ ভুলে যায়, আবার নামের সহায়তায় নিজেকে জোড়া দেয়।
তাওয়াক্কুলের এই সুর তুকারামেও বাজে—করো, কিন্তু মালিকানা ছেড়ে দাও। এই গ্রহণক্ষম সক্রিয়তাই আধ্যাত্মিক পরিণতির চিহ্ন। রেশমকীট যেমন নীরবে সুতো বোনে, হৃদয়ও নীরবে নাম বোনে—আর একসময় সেই নামই হয়ে ওঠে তার পোশাক, তার পর্দা, তার কাফন, তার পতাকা।
ভোর: কুন-এর আগের মুহূর্ত
আমি ধীরে জেগে উঠি—ভোর যখন মুয়াযযিনকে ডাকে—আঙুলের ডগায় আর ঠোঁটে—যা চাইছে না, নিচ্ছে না, বরং মনে করছে—যেন ঠোঁট আর আঙুল জানে এমন কিছু, যা মস্তিষ্ক এখনও শেখেনি।
এটি জাগরণের মুহূর্ত—কিন্তু বুদ্ধির জাগরণ নয়, শরীরের জাগরণ। শরীরের নিজস্ব স্মৃতি আছে—হাত জানে, কাকে ছুঁয়েছিল; ঠোঁট জানে, কাকে বলেছিল; ত্বক জানে, কার উষ্ণতা সে বহন করে। এই জ্ঞানকে বলা যায় দেহস্মৃতি—এই জ্ঞান বুদ্ধির নয়, দেহের, আত্মার, সেই সূক্ষ্ম স্তরের, যেখানে স্মরণ শব্দের আগে আসে।
চাদরের কাপড় ত্বকে ফিসফিস করে—যেন উপহারের মোড়ক—এমন একটা উপহারের, যা আল্লাহ্ তখন থেকে জমিয়ে রেখেছিলেন, যখন পর্যন্ত সকালের কোনো নাম ছিল না, যখন আলো শুধু আলো ছিল, তাকে কেউ "আলো" বলে ডাকেনি—যখন সব কিছু ছিল কুন-এর আগে।
"কুন"—হও—আল্লাহ্র সেই আদেশ, যা থেকে সৃষ্টি শুরু। কুরআনে (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৮২): "ইন্নামা আমরুহু ইযা আরাদা শাইয়ান আন ইয়াকুলা লাহু কুন ফা-ইয়াকুন"—তিনি যখন কিছু চান, তখন শুধু বলেন "হও"—আর তা হয়ে যায়। কুন-এর আগে সম্ভাবনা ছিল—বাস্তবতা ছিল না। নাম ছিল না—অস্তিত্ব ছিল না। শুধু ছিল সেই মুহূর্ত, যেখানে সম্ভাবনা বাস্তবতার চেয়ে বেশি সুন্দর। ভোরের জাগরণও তেমন—চোখ খোলার ঠিক আগের মুহূর্তটি, যখন স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যবর্তী সেই বারযাখে তুমি দাঁড়িয়ে, সব কিছু সম্ভব, কিছুই নির্ধারিত নয়—এক গর্ভবতী নীরবতা। সৃষ্টি একবার ঘটেছিল এমন নয়; তা এখনও ঘটছে—প্রতিটি ভোরে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে। আলো তখনও জন্মায়নি, কিন্তু তার নিঃশ্বাস শোনা যায়। ভোর তাই কেবল সময় নয়—পুনঃসৃষ্টির প্রতিশ্রুতি, প্রতিদিন নতুনভাবে শুরু করার গোপন অনুগ্রহ।
সব বিচ্ছেদ ছিল ডাক। সব আগুন ছিল শুদ্ধি। সব প্রেম ছিল স্মরণ। সব নীরবতা ছিল উপস্থিতি। আর যে-উৎসকে এতকাল দূরে ভেবেছিলাম, সে তো আমারই অন্তরের গভীরতম আলোতে বসে ছিল—আমার অশ্রু, আমার শ্বাস, আমার সিজদা, আমার দহন—সব কিছুর ভেতর দিয়ে নিজেকেই ধীরে ধীরে চিনিয়ে দিচ্ছিল।
শূন্যের সপ্তক: ১৩
লেখাটি শেয়ার করুন