ঝোঁকের বশে নেওয়া কোনো এক সিদ্ধান্ত হয়তো...আজ আমাকে তোমার কাছ থেকে বহুদূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারত।
আচ্ছা, তুমি কি টেলিপ্যাথি জানো? হতে পারে, এটি একটি অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা—যা উচ্চ মনোসংযোগ এবং ইতিবাচক শক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব। আমার বিশ্বাস, এটি তোমার পক্ষে করাটা কঠিন নয়। তবুও, আমি মনস্থির করে ফেলেছি—এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ কম।
তোমাকে আগেও বলেছি, আমার জীবনটা অনিশ্চিত। আমি ভবঘুরের মতো জীবনটা কাটাতে চেয়েছি সবসময়ই, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
আমার বুকের ভেতরটা জুড়ে বিচ্ছিন্ন শব্দের চাষ, ওদের কোলাহল চলতে থাকে অবিরত। তুমি তো জানো...এই অক্ষরগুলোকে লেখা প্রচণ্ড কঠিন কাজ। তুমি এই ঘোরের মধ্যেই চিরকাল ছিলে, এখনও রয়ে গেছ—জগত-সংসারে মন নেই, নিজের ভেতরে কী যেন চলছে পুরোটা সময়।
কেন বুঝেও না-বোঝার ভান করছ? তুমি জানো, আমিও এসবের বাইরে যেতে পারছি না, এর পরেও তুমি আমায় মনে করিয়ে দাও প্রতিনিয়ত—নিজের কাছ থেকে নিজে পালানো যায় না।
কেন বলছ এসব? চাইলেই কি এসব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা যায়?—তুমি পেরেছিলে কখনো?
আমরা তো একসাথে নেই, বহুদূরে সরে গিয়েছি আরও আগেই।
একসাথে থাকা কাকে বলে, জানো তুমি? আমার কাছে এর এক সংজ্ঞা আছে, শুনবে?
এক অন্ধ লোক নিয়ম করে গোরস্থানের সামনের মাঠটা পরিষ্কার করত রোজ। কেউ ফিরেও দেখেনি কখনও, কিছু মানুষ পয়সা দিয়ে গেছে—হয়তো তাকে ভিক্ষুক ভেবেছিল, অথচ সে ভিক্ষুক নয়।
এক চরম শারীরিক অক্ষমতা নিয়েই সে পৃথিবীতে বেঁচে ছিল অনেকটা সময়। এই বৃদ্ধের বয়স হয়েছিল আনুমানিক নব্বই। শুনেছি, তার পরিবার, কাছের মানুষ সেই কবেই তাকে ত্যাগ করেছে। প্রতিদিনই কেউ-না-কেউ আসত কবর জিয়ারত করতে; এই জায়গাটাতে প্রায় শ'খানেক ব্যক্তির কবর রয়েছে।
হঠাৎই এক মহামারিতে সেই গ্রামের অর্ধশতাধিক মানুষ এক দিনেই মারা গেল। এই গোরস্থানে তাদের জায়গা হলো না। পাশের গ্রামে তাদের দাফন সম্পন্ন হলো। সেই অন্ধ লোকটিও মৃত; তার মৃতদেহটি পচতে পচতে গোরস্থানের সেই মাঠটিতে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর খবরটি কারও কাছে পৌঁছায়নি, কেউ খোঁজেনি।
একেও কি একসাথে থাকা বলে? পৃথিবীতে কেউ কি কারও সত্যিকারের খোঁজটা রাখে?
মনের ভেতরে উন্মোচিত এক সত্য—যা কেউ দেখে না, কেউ শোনে না। সে-ও কি তবে পরিত্যক্ত সুখের ঘর বাঁধতে ব্যাকুল? এ-ই কি আমাদের নিয়তি?
মহাকালের ধুলো
লেখাটি শেয়ার করুন