গল্প ও গদ্য

বেঁচে থাক তৃষ্ণা: শেষ



সপ্তম পর্ব: নয় বছরের হিসাব

নয় বছর। নয়টা বর্ষা, নয়টা শীত, নয়টা বসন্ত। তিন হাজার দুশো পঁচাশিটারও বেশি দিন—প্রতিটি দিনে তোমার কথা ভেবেছি, প্রতিটি রাতে তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি। এতদিনে এক বারও তোমার জন্মদিনে থাকা হয়ে ওঠেনি। আর হবেও না—একটা মুক্তি দিয়েছি। কিন্তু মুক্তি কি আসলেই মুক্তি? না কি আরেক ধরনের বন্দিত্ব—যেখানে শরীর মুক্ত, কিন্তু মন ঠিকই শেকলে?

মনের ভেতর একটা প্রশ্ন সারাক্ষণ ঘুরপাক খায়—এত বছর তুমি কোথায় ছিলে? আরও আগে থেকে কেন তোমার সাথে পরিচয় হয়নি? তখন আমি মফস্বলের একটা পুরোনো ঘরে ক্লাস করতাম, পড়তে যেতাম। সেই সময়টা যদি তোমার সাথে কাটত! তাহলে আমি এত বছরে তোমার আদরে আদরে পূর্ণ হয়ে যেতাম—এই অপূর্ণতার দানব আমাকে গিলে খেত না।

তোমাকে ভালোবাসতে বাসতে তোমার পুরো পরিবারকে ভালোবাসায় ডুবিয়ে দিয়েছি। তোমার আর বাবার একসাথে তোলা ছবিটা—ঘরে বসে আছ দু-জন, বাবার কাঁধে তোমার হাত—সেটা দেখে বাবাকেও ভালোবেসে ফেলেছি। তারপর মাকে। নীপাকে। আনিসকে। ভালোবাসা এমনই—একজনকে ভালোবাসলে সে যাদের ভালোবাসে, তাদেরও ভালোবাসতে হয়, যেমন পুকুরে ঢিল ফেললে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে—কেউ আটকাতে পারে না।

দেওয়ালিতে কালো শাড়ি পরব—কালোতে তোমাকে খুব মানায়, জানো। আচ্ছা, আমি কি সুন্দর দেখতে? তোমার চোখে আমি কেমন? এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করার সাহস কোনোদিন হয়নি—তাই রাতের অন্ধকারে বালিশে মুখ গুঁজে জিজ্ঞেস করি, স্বপ্নের ভেতর জিজ্ঞেস করি, নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করি—আর উত্তর পাই না।

তোমার জন্মদিন ঘনিয়ে আসছিল—কত প্ল্যান ছিল আমার। একসাথে থাকব, হাসব, গোলাপ দেবো। তুমি বললে, তুমি থাকবে না। আমি বোকা, তাই কাঁদলাম না। বোকারা কাঁদে না—বোকারা চুপচাপ বয়ে যায়, নদীর মতো, কোনো শব্দ ছাড়া। কান্নাটা এল, চুপচাপ বয়ে গেল—কোথা থেকে, কে জানে। আর কেউ জানল না।

সব কিছু আমার ভালোবাসার বিপক্ষে কেন, বলো তো?

অষ্টম পর্ব: অনেক অনেক কেন

সব কিছুতে এত তাড়া কেন তোমার?
কেন বিয়েটা করে ফেললে?
কেন আমাকে অন্য কারও হাতে হাত রাখতে দেবে?
কেন আমার কান্না শুনেও চুপটি মেরে থাকো?
আর সবচেয়ে বড়ো "কেন"—কেন চিৎকার করে কাঁদতে পারি না আমি?

এগুলো প্রশ্ন নয়—এগুলো ক্ষত। প্রতিটি "কেন" একটি করে কাটা দাগ বুকের উপর। কেউ দেখে না—জামার নিচে, চামড়ার নিচে, হাড়ের নিচে। আমি এই দাগ গুনি না, মুছিও না—শুধু বয়ে বেড়াই। নদী যেমন তলদেশের পাথর বয়ে বেড়ায়—উপর থেকে দেখলে স্বচ্ছ জল, শান্ত স্রোত; কিন্তু তলদেশে? তলদেশে ভার আছে—পাথরের পর পাথর, বছরের পর বছর জমে আছে।

আমি আমার পরিবারে সবচেয়ে বোকা মানুষ। আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সব কিছু; মেডিক্যাল, ভার্সিটি—কোনো পরীক্ষাই দিতে দেওয়া হয়নি। ওরা বলে, আমি প্রাইমারিতেও চাকরি পাব না। স্রেফ সরোজিনীর নামটুকু জানি বলেই কি সরোজিনীতে পড়তে পারতাম? আমাকে সেখানে চান্স পেতে হয়নি? আমি সেইসব অভিমানকে হত্যা করেছি—নিজের হাতে, নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে। নিজেকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিধ্বস্ত করেছি। আর তোমার বেলায়? যা বলেছ, কখনও প্রতিবাদ করিনি—কেন করব? আমি তো ভালোবাসি। আর ভালোবাসা মানেই তো আত্মসমর্পণ—নিঃশর্ত, নিঃশব্দ, নিঃসীম।

দু-মাস ধরে চেনো আমায়। নয় বছর ধরে চিনি তোমায়। এই অসমতার হিসাব কে মেলাবে? গণিতে কোনো সূত্র নেই, যা দিয়ে এই ফারাকটা মাপা যায়।

নবম পর্ব: মায়ার চোর

ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করা যায়—চিঠি ফিরিয়ে দিয়েছ, ফোন কেটেছ, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। প্রতিটি প্রত্যাখ্যানে আমি একটু একটু মরে গেছি—কিন্তু পুরোটা মরিনি। এর কারণ মায়া। মায়া তো চোরের মতো—দরজা বন্ধ করলে জানালা দিয়ে ঢোকে, জানালা বন্ধ করলে দেয়ালের ফাটল দিয়ে গলে পড়ে, ফাটল বন্ধ করলে বাতাসের সাথে মিশে ঢুকে পড়ে ফুসফুসে। তুমি আমার ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করতে পারো—কিন্তু আমার মায়া? সেটা তোমার রক্তে মিশে গেছে, তুমি নিজেও জানো না।

ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করা যায়।
কিন্তু মায়া? মায়া তো ত্রিসীমানা জানে না।

ভুলে থেকো ভালোবাসা। নিজেকে ভালো রেখো। কখনও একা ভেবো না নিজেকে—কারণ একজন খুব গোপনে, পৃথিবীর কেউ জানে না, এমন গোপনে, তার হৃদয় তুলে তোমার কাছে রেখেছে। পরম যত্নে। যেমন মানুষ মন্দিরে প্রদীপ রাখে—জ্বলুক বা না জ্বলুক, রাখাটাই প্রার্থনা।

প্রতিবার যখন ছায়াপুর থেকে কথা হয়, কখনোই তোমায় ছাড়তে চাই না। আমি অনিচ্ছায় রাখি ফোন—কিন্তু ঠিক ফিরে আসে তোমার কণ্ঠস্বর। কানে, রক্তে, শিরায়। সুনামির মতো—ভেতরটা তছনছ করে দিয়ে চলে যায়, আবার শান্ত হয়, আবার আসে। ওই গলার স্বর আর কোনোদিন মুছবে না—জানি।

খুব ভালোবাসায় থেকো, চিঠিতে বেঁচো।
তোমার বই, কবিতা, গান—সব কিছু নিয়ে বেঁচে থেকো।
আমি তো তোমার সব কিছুতে নিজেকে বসিয়ে দিলাম—
তোমার সব কিছুতেই আমাকে মিশিয়ে রেখো।

দশম পর্ব: অলৌকিক

পৃথিবীতে কিছু ব্যাপার অলৌকিকভাবে ঘটে—কোনো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কোনো বিজ্ঞান দিয়ে মাপা যায় না। যেমন ধরো—তুমি আমায় ফোন করবে বলে নম্বরটা বের করলে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি ফোন দিয়ে দিলাম। এটা এক বার নয়, দু-বার নয়—প্রতিদিন ঘটে। দু-জন যখন দু-জনকে ঈশ্বরের মতো অনুভব করে, তখন এমনই হয়—সময় মিলে যায়, শ্বাস মিলে যায়, নীরবতাও কথা বলতে শেখে। তখন দূরত্ব শুধু সংখ্যা—কিলোমিটার, মাইল—অর্থহীন।

তুমি ভাবো আমার কথা—আমি ফোন করি।
আমি ভাবি তোমার কথা—তুমি ফোন করো।
মানুষ বলে, কাকতালীয়। আমি বলি—ভালোবাসা।

আমি কি খুব কষ্ট দিচ্ছি তোমার? যখনই কষ্ট আসে, আমার হাতটা শক্ত করে ধোরো। দু-জন একসাথে কষ্ট পুষলে সেই কষ্টই একদিন একসাথে পার করা যাবে।

কিন্তু তুমি কি আমায় আর অতটুকুই ভালোবাসো? যতটুকু পাই, তাতে হাত ভরে যায়—কিন্তু হৃদয়? হৃদয় তো লোভী। হৃদয় তো শুধুই চায়—পুরো নম্বর না পেলে তার কান্না থামে না। আমার হৃদয়ও তেমন—এক-শো’তে নিরানব্বই পেলেও কাঁদে, কারণ ওই একটা নম্বর বাকি আছে—আর সেই একটা নম্বরই তার পুরো উত্তরপত্র।

একাদশ পর্ব: ধুলার এপার থেকে

তোমার সব কিছুতে অন্য কারও অধিকার—আমি জানি। সময়, সমাজ, পরিবার, নিয়তি—সব আমার ভালোবাসার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আছে, হাত বাড়িয়ে বলছে, "থামো"। কিন্তু আমি ভালোবাসি তোমায় প্রণামে, প্রণতিনিবেদনে—ধুলার এপার হতে। মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে যেমন ভক্ত প্রার্থনা করে—ভেতরে ঢোকার অধিকার নেই, কিন্তু প্রার্থনা করতে তো কোনো অনুমতি লাগে না—আমিও তেমন।

আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়েও তোমাকে ধরে রাখতে পারছি না—কেমন যে লাগে! তুমি তো একাই ছিলে। আমি এসে তোমার জীবনটা কিছুটা হলেও রাঙিয়ে দিয়েছি—এটা কি কিছুই নয়? একটু রং, একটু গন্ধ, একটু উষ্ণতা—এটুকুও কি মূল্যহীন?

যে-ভালোবাসা আমার পাবার কথা ছিল—সেটা কি অন্য কেউ পাচ্ছে? কিছুটা হলেও? না কি আমি কেউ নই? হই না আমি কেউ?!

এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ো না। কিছু প্রশ্ন শূন্যে ঝুলে থাকলেই ভালো—যেমন আকাশে তারা ঝুলে থাকে, কেউ জানে না কোন সুতোয়। উত্তর পেলে হয়তো সুতোটা ছিঁড়ে যাবে—তারা পড়ে যাবে—আর আমি? আমি হয়তো বাঁচতেই পারব না।

শেষ পর্ব: আমি ধূসর হলেও তুমি থেকো রাঙা

এত কষ্টে কতদিন থাকা যায়? আমার মনে হয়, প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন একটা না-থাকার জায়গা আছে—সেখানে সে একা, সেখানে তার ভাষা নেই, সেখানে শুধু অচঞ্চল একটা পিয়াসা ঠায় জেগে থাকে। এই পিয়াসা কাউকে দোষ দেয় না। চিৎকার করে না। ঈর্ষা করে না। শুধু অপেক্ষা করে—স্থির, অটল, অনন্ত—যেমন সমুদ্রতীরে পাথর বসে থাকে, ঢেউ আসে আর যায়, কিন্তু পাথর নড়ে না।

ঘরের গভীরে একটা দুঃখী পাখি ঘোলা-চোখে কাঁদছে—কষ্টের সামনে দাঁড়িয়ে, ডানা গুটিয়ে, গলা ফুলিয়ে। কী এমন কষ্ট যে, তোমার মতো মানুষও কষ্ট লুকোতে শিখে গেল? আমার যদি আরেকটা জীবন থাকত—একটা সমান্তরাল পৃথিবী, যেখানে সব কিছু একটু অন্যরকম—সেখানে তোমার সাথে সূর্যাস্ত দেখতাম, নিয়ম ভেঙে কোনো দূর দেশে চলে যেতাম, সমুদ্রের ধারে বসে তোমার কাঁধে মাথা রাখতাম। তুমি তো আমায় "গুনগুন বাচ্চা" ডাকো। আর আমি তো তোমার মিষ্টি হাওয়া। কিন্তু এই জীবনে? এই জীবনে শুধু গোলাপি কাগজ আর হলুদ কাগজ আর সবুজ কাগজ—আর তার বুকে একটু করে রক্ত-মেশানো কালি।

তোমাকে খুব আদর করতে ইচ্ছে করে—পাগলের মতো। এই পাগলামিটুকুই আমার শেষ সম্পদ। আর কিছু নেই—না অধিকার, না দাবি, না ভবিষ্যৎ—শুধু এই একটুখানি পাগলামি, যেটা কেউ কেড়ে নিতে পারে না, কারণ পাগলামির উপর আর কারও অধিকার নেই।

তোমার মনে আছে? সেদিন সন্ধ্যার আলো আর গোলাপের পাপড়ি মিলেমিশে একাকার—তুমি এতগুলো গোলাপ নিয়ে ফিরেছিলে। আমি খুশিতে মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন মনে হয়েছিল—তোমার জীবনে আমি গোলাপ হয়েই থাকব, তোমাকে রাঙিয়ে দেবার জন্যই আমার এই আসা। কিন্তু গোলাপও একদিন শুকিয়ে যায়। পাপড়ি ঝরে পড়ে, রং ফিকে হয়, গন্ধ মিলিয়ে যায়। তখন যা পড়ে থাকে, সেটা স্মৃতি—আর স্মৃতি কখনও শুকোয় না। স্মৃতি বৃষ্টিতেও ভেজে না, রোদেও পোড়ে না—শুধু থাকে…নিঃশব্দে, যেমন বকুল ফুলের গন্ধ থাকে পথের ধারে।

প্রিয়, রঙিন হোক—
আমার সবটুকু রং নিয়ে,
আমার মুখের হাসি নিয়ে,
আমার সবটুকু ভালোবাসা নিয়ে।
আমি ধূসর হলেও—
তুমি থেকো রাঙা।

আমার তৃষ্ণা কোনোদিন মিটবে না। আমি জানি। তুমিও জানো। কিন্তু তৃষ্ণা মেটানো তো ভালোবাসার উদ্দেশ্য নয়—তৃষ্ণা বাঁচিয়ে রাখাই ভালোবাসার কাজ। মরুভূমিতে মরীচিকা যেমন পথিককে বাঁচিয়ে রাখে—জল নেই, কিন্তু জলের স্বপ্ন আছে, আর সেই স্বপ্নটুকুই যথেষ্ট আরেক পা এগিয়ে যাবার জন্য। আমার তৃষ্ণাও তেমন—তৃষ্ণাটাই আমার মরীচিকা, তৃষ্ণাটাই আমার জ্বালানি। যতদিন তৃষ্ণা আছে, ততদিন বেঁচে আছি। যেদিন মিটে যাবে, সেদিন আর কিছু থাকবে না—না পথ, না পথিক, না মরুভূমি।

তাই মিটিয়ো না। কোনোদিন মিটিয়ো না।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *