গল্প ও গদ্য

বেঁচে থাক তৃষ্ণা: শুরু



প্রথম পর্ব: নীলগঞ্জ থেকে এই চিঠিটা কত দূরে?

প্রিয়, নীলগঞ্জ থেকে এই চিঠিটা কত দূরে?

আমি যদি এখান থেকে "ভালোবাসি ভালোবাসি" বলে চিৎকার করি—তুমি কি শুনতে পাবে? না কি শব্দটা মাঝপথে হারিয়ে যাবে—ধানখেতের উপর দিয়ে, রেললাইনের উপর দিয়ে, ছায়াপুরের ধুলোমাখা রাস্তা ধরে উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে কোথাও মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে? শব্দেরও তো ক্লান্তি আছে। শব্দেরও তো শরীর আছে। আর "ভালোবাসি" শব্দটা এত ভারী—এত ভারী যে, বাতাস তাকে বইতে পারে না।

আমার ভীষণ বলতে ইচ্ছে করে—এত ইচ্ছে করে যে, বুক ফেটে যায়। তোমার প্রেমে আমি কতটা বুঁদ হয়ে থাকি, তুমি কি জানো? ‘বুঁদ’ মানে জলে ডুবে যাওয়া নয়—জলের ভেতর বাস করা। মাছ যেমন জানে না, সে জলে আছে, আমিও তেমন ভুলে যাই, আমি তোমার প্রেমে আছি। এটা আমার স্বাভাবিক অবস্থা হয়ে গেছে—শ্বাস নেওয়ার মতো, হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের মতো। তোমাকে ভালোবাসা আমার শরীরের একটি অনৈচ্ছিক ক্রিয়া—আমি চাইলেও থামাতে পারি না, যেমন চাইলেও হৃৎপিণ্ডকে বলা যায় না…"থামো"।

আচ্ছা, আমার ভালোবাসায় কি কোনো কমতি ছিল? নইলে ঈশ্বর তোমাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন কেন? আমাদের সুখটা কেমন করে দুঃখের ধূমকেতুতে ভেঙে পড়ল! ধূমকেতু আসে—উজ্জ্বল, ঝলমলে, সবাই মুখ তুলে তাকায়—তারপর চলে যায়, আর যেখান দিয়ে যায়, সেখানে শুধু ছাই পড়ে থাকে। আমাদের সুখটাও তেমন—ঝলমল করে এসেছিল, চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল, তারপর চলে গেল। পড়ে আছে শুধু ছাই। আর সেই ছাইয়ের ভেতর আমি খুঁজি তোমার উষ্ণতার শেষ চিহ্ন—যেমন কেউ নেভা-উনুনে হাত রাখে, একটুখানি তাপের আশায়।

এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব? তোমার মতো করে কে আমায় ভালোবাসবে? তোমার মতো করে কে আমায় ভালোবাসার কাজটা নেবে?

এখন আমি কতটা পথ মিথ্যে হাসব?
কার দিকে চেয়ে মিথ্যে বলে ঘুমিয়ে যাব?

তুমি কেন বোঝোনি—তোমাকে ভালোবাসলে আমার চোখ থেকে জল নয়, রক্ত ঝরবে। এই একটি বাক্য আমি একটা হলুদ কাগজে লিখে ভাঁজ করে রেখেছিলাম। তুমি হয়তো খুলেও দেখোনি। কিন্তু ওই ভাঁজের ভেতর আমার পুরো জীবন ঘুমিয়ে আছে—যেমন বীজের ভেতর গাছ ঘুমিয়ে থাকে, মাটি পেলে জেগে উঠবে, না পেলে পচে যাবে।

দ্বিতীয় পর্ব: বাবুই পাখি, বকুল ফুল

আমি যখনই জিজ্ঞেস করেছি—ভালোবাসো? তুমি বলতে পারোনি। আমিও পারিনি। আমাদের ভালোবাসাটা এত নম্র ছিল, এত স্নিগ্ধ ছিল—জোরে বললে ভেঙে যেত। যেমন ভোরের শিশির—স্পর্শ করলেই কীরকম ঝরে যায়, কিন্তু না করলে সূর্যের আলোয় রামধনু হয়ে ওঠে। আমাদের ভালোবাসাও তেমন ছিল—অস্পর্শের ভেতর দিয়েই সবচেয়ে সুন্দর।

তুমি একবার বলেছিলে—আমার প্রকাশধরনটা বাবুই পাখির মতো। ছোট্ট, চঞ্চল, সারাদিন ঘর বানায় আর ভাঙে, ঘাসের আঁশ দিয়ে বোনে আর খোলে—কোনোদিন ঘর শেষ হয় না, কিন্তু বানানো থামে না। আর হৃদয়? হৃদয় সরোজিনীর বকুল ফুলের মতো—নিঃশব্দে ঝরে পড়ে, কেউ টের পায় না, কিন্তু গন্ধ থেকে যায় সারারাত। সকালে কেউ হেঁটে যায় সেই পথ দিয়ে, পায়ের তলায় মচমচ করে শুকনো বকুল, আর অজান্তেই কেউ একটু হাসে—না জেনেই যে, ওই হাসির ভেতর একটি মেয়ের সারারাতের কান্না লুকিয়ে আছে।

সেই কথাটা আমার বুকে এমনভাবে গেঁথে আছে যে, আজও যখন কোথাও বকুল ফুলের গন্ধ পাই, চোখ বুজে আসে। আর যখন কোনো বাবুই পাখিকে দেখি খড়কুটো নিয়ে ব্যস্ত—মনে হয়, ওটা আমি। সারাজীবন ঘর বানাচ্ছি তোমার জন্য—তুমি আসবে বলে, তুমি থাকবে বলে—যদিও জানি, তুমি আসবে না।

একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম—বাবু, তোমার কী ফুল পছন্দ? তুমি বললে, পৃথিবীর সমস্ত ফুল। আমি বললাম, একটা নাম বলো না। তুমি আবারও বললে—সমস্ত ফুল। যার মন এত সুন্দর, তার কাছে প্রতিটি গাঁদাও বন্ধু, প্রতিটি জবাও আপন। কিন্তু আমার যে গোলাপই পছন্দ। আমি চাইতাম, তুমিও বলো—গোলাপ। কারণ আমি তোমার জীবনে গোলাপ হয়েই থাকতে চেয়েছিলাম—সুন্দর, সুগন্ধিযুক্ত, আর কাঁটাওয়ালা; যে কাঁটা ফোটাবে তোমার আঙুলে, তবু তুমি যাকে ছাড়তে পারবে না।

তোমার মনে আছে? সেদিন তুমি আমায় বাসায় রেখে বাইরে গিয়েছিলে। বলেছিলে—কী আনব? আমি বসে ছিলাম অপেক্ষায়—আর ভালোবাসা এল। তুমি এতগুলো গোলাপ নিয়ে ফিরলে! সন্ধ্যা আর গোলাপ মিলেমিশে একাকার—ঘরে ঢুকতেই গন্ধে ভরে গেল বাতাস, রঙে ভরে গেল চোখ। আমি খুশিতে মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনই মনে হয়েছিল—তোমার জীবনে আমি গোলাপ হয়েই থাকব। তোমাকে রাঙিয়ে দেবার জন্যই আমার এই পৃথিবীতে আসা।

তৃতীয় পর্ব: পরগাছার আত্মকথা

আমি জানি, আমি তোমার জীবনে একটি পরগাছার মতো—অনাহূত, অস্তিত্বহীন প্রায়। গাছের গায়ে যেমন পরগাছা জড়িয়ে থাকে—আলো, বাতাস, জল সব নিজের করে নেয়, অথচ গাছটা টেরও পায় না কখনও, সেখানে কিছু জন্মেছে—আমিও তেমন। তোমায় আঁকড়ে ধরে আছি। মানুষ বোঝে না। তুমিও বোঝো না। কিন্তু পরগাছাকে জিজ্ঞেস করো—সে বলবে, গাছ ছাড়া তার মৃত্যু অবধারিত। এই মায়ার ডোরটুকুই আমার একমাত্র সম্বল—এটা ছিঁড়লে আমি মাটিতে পড়ে যাব, আর কোনোদিন উঠতে পারব না।

মা বলেন, আমার পিত্ত নেই—তাই রাগ জমে না, হিংসা কাজ করে না, ক্ষোভ ফুটে বেরোয় না। অর্চিতা, মেঘলা, লাবণ্য—ওরা সবাই তোমায় ভালোবাসে। তুমি যে-নামই বলো—আমার বারোটা বেজে যায় না। আমি নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকি, যেমন পুরোনো মন্দিরের থাম দাঁড়িয়ে থাকে—ভেতরটা ফাঁকা, কিন্তু ভার বইছে এখনও। কারণ ভালোবাসা আমাকে স্বার্থপর করে তোলেনি—স্বার্থহীন করে ফেলেছে। আর স্বার্থহীনতার চেয়ে বড়ো অভিশাপ পৃথিবীতে আর কী আছে? ভালোবাসার মানুষকে হারানোর ভয়ও নেই—কারণ কখনও পাইনি তাকে।

তোমায় অন্যমনা দেখলে আমার এত কষ্ট হয় কেন? শোনো—কখনোই অন্যমনা হয়ো না, কখনোই না। আমি তো আছি—তোমাতেই আছি। তুমি কাঁদলে আমার কান্না পায় না বুঝি? আমার উপরও তো কিছুটা নির্ভর করতে পারো তুমি। যখনই কষ্ট আসে, আমার হাতটা শক্ত করে ধোরো। কিছু কষ্ট আমাতেও আসুক—দু-জন একসাথে বইলে ভারটা অর্ধেক হয়ে যায়।

আমি আমার হাসিতে হাসাব তোমায়।
আমি আমার রঙে রাঙাব তোমায়।
আমার অস্তিত্ব তুচ্ছ হতে পারে,
কিন্তু আমার ভালোবাসা—
ঘরের উনুনের আগুনের চেয়েও অধিক তপ্ত।

চতুর্থ পর্ব: রান্নাঘরের ভূগোল

ভালোবাসার একটা ভূগোল আছে—তুমি জানো না। সেটা শোবার ঘরে নয়, বৈঠকখানায় নয়—রান্নাঘরে। যেখানে মশলার গন্ধে চোখ জ্বলে, যেখানে তেলের ছিটে হাতে পড়ে, যেখানে ভাতের ফ্যান ছাড়তে গিয়ে আঙুল পুড়ে যায়—সেখানেই ভালোবাসা সবচেয়ে সত্যি। কারণ রান্নাঘরে কেউ অভিনয় করে না—ঘামে ভিজে, তেলে-মাখা মুখে, আঁচলে হাত মোছার ফাঁকে যে-মায়াটুকু বেরিয়ে আসে—সেটাই খাঁটি।

তুমি বাসায় গেলে আমার কথা তোমার মনে পড়ে? জানো, আমি বাসায় গেলে তোমার কথা এত মনে পড়ে যে, দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করে। ওখানে মাকে তো আর বলা যায় না যে, আমারও একটা ঘর আছে, একটা রান্নাঘর আছে—যেখানে আমি রানি। সেখানে প্রতি-চামচে মায়া মেশাই, প্রতিটি ফোড়নে ভালোবাসা ঢালি। সেখানে কেউ নিষেধ করে না। সেখানে আমার হাতের স্বাদ কেউ ফেরায় না।

নিজের বাসায়? আমি ঝামেলাবাজ টাইপের—পড়াশোনা করি না, রান্নাঘরেও ঢুকি না। কিন্তু তোমার জন্য? তোমার জন্য নুডলস বানাই, মাছে বেসন দিই। পাঁচমিনিটের কাজ—অথচ সেই পাঁচমিনিটেও মা এসে দুইবার এটা-ওটা নিষেধ করে যান। আমাদের বাসায় কাউকে জিজ্ঞেস করো—ওরা বলবে, আমি কিছুই পারি না। রান্না তো পরের কথা। কিন্তু তোমার বাসায় যে-মেয়েটা মায়া দিয়ে রান্না করে—সেটাও আমি। একই মেয়ে, দুটো পৃথিবী।

বলো না—তোমাকে আমি এত কেন ভালোবাসি?

এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। জানার দরকারও নেই। কিছু প্রশ্ন উত্তরহীন থাকলেই সুন্দর—যেমন রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বিকেলের আলো এসে ভাতের হাঁড়িতে পড়লে সেটাকে কেউ কাব্য বলে না। কিন্তু যে ঠিকভাবে চোখে দেখতে জানে—সে জানে, সেটাই সবচেয়ে বড়ো কাব্য।

পঞ্চম পর্ব: চোখের নদীতে

একটা দিনের কথা মনে পড়ে—যেদিন তোমার চোখে আমার জন্য ভালোবাসা দেখিনি। সেদিন আমি নিজের কাছে ফিরতে পারিনি। নিজের ঘরে ঢুকেও মনে হয়েছে পরের ঘর, নিজের মুখ আয়নায় দেখেও মনে হয়েছে, চেনা যাচ্ছে না। তোমার চোখে আমাকে না দেখলে আমি নিজেকে দেখি আর কোথায়?

কিন্তু তার আগের দিন? সেদিন আমি দূর থেকে তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেখানে একটা নদী ছিল—স্বচ্ছ, গভীর, শান্ত। সেই নদীতে আমি নিজেকে দেখেছিলাম—প্রতিফলিত, উজ্জ্বল, বাঁচার যোগ্য। খুব স্বচ্ছভাবেই উপলব্ধি করেছিলাম আমার প্রতি তোমার হৃৎস্পন্দন। সেই চাহনিতে কতটা মায়া ছিল, কতটা ভালোবাসা—আমি ঠিকই বুঝে নিয়েছিলাম।

সেই হৃৎস্পন্দন আজও আমার কানে বাজে। আমাকে বিচলিত করে—শুধু তোমারই জন্য। নীলগঞ্জ থেকে ফোন করেছিলে সেদিন—মধুপুর থেকে ফেরার পথে। ফোনটা ধরতেই বুঝেছিলাম, তুমি খুশি—গলায় সেই চেনা ঝিলিক, সেই রোদে-ভেজা উষ্ণতা। তোমাকে খুশি দেখলে আমার কী যে আনন্দ হয়! তোমার খুশিতে আমি এত খুশি হই কেন? মাঝে মাঝে তো কষ্ট পাওয়া উচিত। তবু খুশি হই কেন? এটাও তো একটা ভুল—আর আমি তো ভুল হতেই ভালোবাসি।

আমি সেই রহস্যময় হাসি দেবো তোমায়—যে-হাসির মাঝে সুখ আছে না কি কষ্ট, তা লুকায়িত থেকে যাবে। শুধু তুমি জানবে। আর কেউ না। কারণ কিছু হাসি শুধু একটি মানুষের জন্যই তৈরি হয়—যেমন কিছু চাবি শুধু একটি তালার জন্যই তৈরি হয়।

ষষ্ঠ পর্ব: ঘুমপাড়ানি গান

মাঝে মাঝে নাহয় ইচ্ছে করেই শরীরটা ভুলে থেকো। আমার গন্ধটুকু শুধু রেখো—জামার ভাঁজে, বালিশের কোণে, চুলের গোড়ায়। মাঝে মাঝে নাহয় পুরোনো দুষ্টুমিগুলো বড়ো করে মনে কোরো—আমার বকুনি নাহয় আর-একটু খেয়ো। মাঝে মাঝে নাহয় ভুলে গিয়ে শুধু একটাই কাজ কোরো—ভালোবেসো। অন্য কিছু না, শুধু ভালোবেসো।

সেই রাতের কথা মনে আছে? তুমি স্বপ্নে হারিয়ে গেছ—গভীর, নিশ্চল ঘুম। আমি অনেক পরে ঘরে ঢুকেছিলাম—পা টিপে টিপে, যেন মেঝেও শব্দ না করে। লাইটটা নিভিয়ে তোমার পাশে শুয়েছিলাম। তুমি ঘুমের ঘোরেই—চোখ না খুলে, কথা না বলে, স্বপ্নের দেশ থেকে হাত বাড়িয়ে—আমায় টেনে নিয়ে বুকে ধরে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলে। জানো, ওটা আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ মুহূর্ত ছিল। ঘুমন্ত মানুষের ভালোবাসায় কোনো অভিনয় থাকে না—কোনো হিসেব থাকে না, কোনো "কিন্তু" থাকে না। সেটা ছিল তোমার সবচেয়ে সত্যি "ভালোবাসি"—যেটা তুমি জেগে থাকলে কোনোদিন বলতে পারোনি।

মাঝে মাঝে যদি ঘুমের মধ্যে শুনো, মেয়েটা কাঁদছে—ঘুম থেকে না উঠেই একটু ছোঁয়া দিয়ো। নাকে, গালে, কপালে—যেখানে পারো। আমি কি ঘুমোতে পারব এখন তোমাকে ছাড়া? খুব শীত এলে, কাঁপতে থাকলে, ডেকো আমায়—আমি ঠিক ছুঁয়ে আসব। দূরত্ব কোনো বাধা নয়। পৃথিবীর কোনো কিছু তোমার কাছে আমায় পৌঁছুতে বাধা দিতে পারবে না গো—মৃত্যুও না।

আমার সারাজীবনটাকে তোমার হৃদয়ের মুঠিতেই থাকতে দিয়ো।
হাজার কষ্ট এলেও—আমার স্মৃতিটুকু ঠিক ওভাবেই রেখে দিয়ো।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *