গল্প ও গদ্য

প্রত্যাবর্তনের দীপ্তি


রাত। শুধুই রাত। কিন্তু এই মুহূর্তটা রাত কেন?—আকাশে সূর্য নেই বলে? না। আসল রাত তো তা-ই, যখন তুমি নেই, অথচ এক তুমি ছাড়া আর কিছুই নেই। এমন এক ফাঁকা ঘরে বসে আছি, যেখানে দেয়ালে দেয়ালে তোমার নাম, ছাদে তোমার নাম, মেঝেতে তোমার নাম—অথচ তুমি কোথাও নেই। কী নিষ্ঠুর এই খেলা—তোমাকে মনে রাখার ক্ষমতা দিয়েছ, হায়, কাছে আসার অনুমতি দাওনি! এই মনে রাখা কী যে জ্বালা—তা কি তুমি জানো না, না কি জেনেই এই আগুন নিক্ষেপ করেছ?

তোমার স্মৃতি আসে। আহা, ‘স্মৃতি’ শব্দটাই যে ভুল—স্মৃতি তো যা চলে গেছে তা, তুমি তো কোথাও যাওনি। তুমি আছই। রক্তে আছ, শ্বাসে আছ, হাড়ের মজ্জায় আছ, ঘুমের ভেতর আছ, জাগরণের ভেতরেও আছ। তাহলে কেন এত কষ্ট? থাকা আর পাওয়া যে এক নয়। নদী আছে, তৃষ্ণাও আছে—দুটো পাশাপাশি, অথচ মরু ফুরোয় না। সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণায় মরা—এর চেয়ে নিষ্ঠুর আর কী আছে?

চোখ ভিজেছে। তা ভিজুক। কিন্তু দেখো—ঠোঁটে হাসি। এই হাসিটা বোঝা দরকার। এ সুখের হাসি নয়, সান্ত্বনার হাসিও নয়। এ হাসি সেই হাসি, যা মানুষ হাসে যখন সে বুঝে ফেলে, কান্না আর হাসির মধ্যে আসলে কোনো তফাত নেই—দুটোই একই ঝরনার দুই ধারা, যেমন জন্ম আর মৃত্যু একই দরজার দুই দিক। এপাশ থেকে ঢুকলে বলে জন্ম, ওপাশ থেকে বেরোলে বলে মৃত্যু—কিন্তু দরজা তো একটাই। যে একবার এটা বুঝেছে, সে কাঁদতে কাঁদতে হাসবেই—কারণ সে জানে, এই কান্নার গভীরেই তুমি লুকিয়ে আছ। এই অশ্রু তোমারই দেওয়া, তাই এই ভেজা চোখও তোমারই ছোঁয়া।

একটা আলো জ্বলছে। ব্যথার আলো। ভেবে দেখো—ব্যথাকে আমরা সারাজীবন অন্ধকার বলে এসেছি, কিন্তু ব্যথাই তো একমাত্র, যা ভেতরটা দেখায়। সুখে থাকলে মানুষ বাইরে তাকায়—বড়ো বাড়ি, সুন্দর গাড়ি, ভালো কাপড়। ব্যথায় পড়লে ভেতরে তাকায়, তখন বাইরের কোনো কিছুতে আর কাজ হয় না। আর ভেতরে কী আছে? তুমি। সবসময় তুমিই ছিলে, চুপচাপ, ধৈর্য ধরে, কত জনম ধরে অপেক্ষায়। কিন্তু আমি? আমি সুখের হাটে এতই মাতাল ছিলাম যে, ভেতরে তাকানোর ফুরসতই পাইনি কোনোদিন। ব্যথা এসে ঘাড় ধরে চোখ ঘোরাল—বলল, ওদিকে তাকিয়ো না, এদিকে দেখো; দেখো, কে বসে আছে যুগ যুগ ধরে তোমার জন্য।

আর সেই আলোর শিখা কাঁপছে। জানো, কেন কাঁপে? যা জীবিত, তা-ই তো কাঁপে। পাথর কাঁপে না, কারণ পাথরে প্রাণ নেই। কিন্তু নদী কাঁপে, পাতা কাঁপে, ভোরের বাতাস কাঁপে, আর বুকের ভেতর কিছু একটা কাঁপে—কারণ সেখানে প্রেম আছে, আর প্রেম মানেই কম্পন, প্রেম মানেই অস্থিরতা, প্রেম মানেই এমন একটা আগুন, যা পোড়ায়ও, আবার বাঁচায়ও। যেদিন এই কাঁপুনি থামবে, সেদিন বুঝে নিয়ো—প্রেম গেছে। তাই কাঁপুক। এই কাঁপুনিই প্রমাণ করে, আমি এখনও তোমার, এখনও জীবিত, এখনও পুড়ছি।

তারপর একটা কথা শোনা গেল। কার কথা? বলতে পারব না। শুধু এটুকু জানি—কথাটা বাইরে থেকে আসেনি, ভেতর থেকে এসেছে, অথচ তা আমার কথা নয়। কেউ বলল—এই যে কষ্ট দিলাম, এ তোমাকে ডোবাতে নয়, ভাসাতে। তুমি যে দুনিয়ার সঙ্গে এত জড়িয়ে ছিলে—তা জড়ানো ছিল না, তা ছিল ডুবে যাওয়া। তুমি ডুবছিলে আর ভাবছিলে, সাঁতার কাটছ। আমি কষ্ট দিয়ে তোমায় টেনে তুললাম জলের উপরে। কষ্ট যদি না দিতাম, তুমি কোনোদিন ওপরে তাকাতে না। মানুষ সুখে থাকলে ওপরে তাকায় না—মাটিতে তাকায়, মাটির জিনিস খোঁজে, মাটির সুখ গোনে। কষ্ট পেলে ওপরে তাকায়, বলে—কেন? আর সেই "কেন"—সেই একটিমাত্র ছোট্ট "কেন" থেকেই শুরু হয় আসল যাত্রা। সারাজীবনের পড়াশোনা যা শেখাতে পারে না, একটি "কেন" তা মুহূর্তেই শিখিয়ে দেয়।

কী অদ্ভুত—শেকল ভাঙার হাতিয়ার হলো ব্যথা। আমরা সারাজীবন ভেবেছি, মুক্তি মানে আনন্দ, মুক্তি মানে হালকা হাওয়া, মুক্তি মানে ‘সব পেয়েছি’-র দেশ। কিন্তু না। মুক্তি মানে সেই মুহূর্ত—যখন তুমি হঠাৎ বুঝতে পারো, যা ধরে রেখেছিলে, তা তোমার ছিলই না, আর যা সত্যিই তোমার, তা ধরে রাখতে হয় না—সে নিজেই থাকে, যেমন শ্বাস থাকে, যেমন ছায়া থাকে; যেমন তুমি আছ আমার ভেতরে, কোনোদিন ধরিনি, তবু কোনোদিন যাওনি।

বাঁশি। হঠাৎ বাঁশি। কোথা থেকে এলো এই সুর? কে বাজাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই জীবনে পাবো না। কিন্তু একটা কথা বুকে হাত রেখে বলতে পারি—এই সুর আমার চেনা, যদিও এই জনমে কখনও শুনিনি। তোমারও কি এমন হয় না? এমন কোনো সুর, কোনো গন্ধ, কোনো মুখ—যা পেলে মনে হয়, আগে কোথাও দেখেছি, আগে কোথাও শুনেছি, কিন্তু কোথায়, কবে, কোন জনমে—মনে পড়ে না? এটাই সেই টান। আদিতে যেখানে ছিলাম, সেখানকার ছাপ। মাটির তৈরি এই শরীর ভুলে গেছে সব, কিন্তু ভেতরে যা আছে—যে-জিনিসটা মাটির নয়, আগুনের নয়, জলের নয়—সে সব মনে রেখেছে। বাঁশির সুর সেই ঘুমিয়ে-পড়া স্মৃতিকে নাড়া দেয়, আলতো করে কাঁধে হাত রাখে, বলে—তুমি এখানকার নও। তুমি অন্য কোথাকার। ফিরবে না?

চাঁদ। চাঁদ উঠেছে। কিন্তু এ আকাশের চাঁদ নয়—এই চাঁদ ভেতরের। প্রতিটি মানুষের বুকে একটা চাঁদ আছে—কিন্তু আমরা কত আবর্জনা জমাই সেখানে। লোভ জমাই, রাগ জমাই, হিংসা জমাই, ভয় জমাই—আর চাঁদ ঢাকা পড়ে যায়, যেমন মেঘে ঢাকা পড়ে আকাশের চাঁদ। আজ রাতে ব্যথা এসে সেই মেঘ সরিয়ে দিল—আর চাঁদ বেরিয়ে পড়ল—হঠাৎ, অপ্রত্যাশিত, যেন কেউ পর্দা সরাল। সেই আলোয় দেখলাম—আরে, আমি তো অন্ধকারে ছিলামই না। আলো তো ছিলই। শুধু আমিই চোখ বুজে ছিলাম। কত সহজ ছিল খোলা—কিন্তু খুলিনি, কারণ অন্ধকারে থাকতে থাকতে অন্ধকারকেই ঘর বানিয়ে ফেলেছিলাম।

আর সেই দিওয়ানা। হ্যাঁ, একজন ঘুরছে রাতের শহরে। গলি থেকে গলিতে, অলি থেকে অলিতে। লোকে বলে পাগল। কিন্তু আমার প্রশ্ন—পাগল কে? যে ঘুমিয়ে আছে চোখ খোলা রেখে, দুনিয়ার স্বপ্ন দেখছে আর ভাবছে এটাই জাগরণ—সে? না কি যে জেগে আছে এই গোটা ঘুমন্ত শহরে, একা, রাতের অন্ধকারে; খুঁজছে এমন কিছু, যা চোখে দেখা যায় না, কানে শোনা যায় না, হাতে ধরা যায় না—তবু যা ছাড়া বাঁচা যায় না? দুনিয়া তাকে পাগল বলে, কারণ দুনিয়া সেটাই বোঝে, যা ওজন করা যায়, মাপা যায়, গোনা যায়। যা ওজনহীন, যা মাপের বাইরে—তার কথা বললেই লোকে বলে পাগল। তা-ই হোক। পাগলামিই ভালো—কারণ যাকে দুনিয়া বুদ্ধিমান বলে, সে তো ঘুমিয়ে আছে।

আর সেই আওয়াজ। সারারাত ধরে একটা আওয়াজ আসছে। কোথা থেকে? বাইরে থেকে, না ভেতর থেকে—আর তফাতটাই-বা কী? হয়তো এই আওয়াজ আমার নিজেরই—সেই আমির, যে এই শরীরে ঢোকার আগে ছিল, যে এই নামের আগে ছিল, এই চেহারার আগে ছিল, এই জীবনের আগে ছিল। সেই আমি ডাকছে এই ‘আমি’-কে—বলছে, কতকাল এই ভাড়া-বাড়িতে থাকবে? নিজের বাড়ি ভুলে গেলে? সেই বাড়ির কথা মনে নেই—যেখানে দেয়াল ছিল না, দরজা ছিল না, ছাদ ছিল না, শুধু আলো ছিল, শুধু তুমি ছিলে? ফিরে এসো। ফিরে এসো। এই ভাড়া-বাড়ির ইজারা ফুরিয়ে আসছে—ফেরার আগে ফিরে এসো।

রাত গেল। কিন্তু আমি যে-রাত কাটালাম, সে কি সত্যিই রাত ছিল? না কি এতদিন যাকে দিন বলে জানতাম—সেই ব্যস্ততা, সেই ছোটাছুটি, সেই সব-পেয়ে-যাবার হাহাকার—তা-ই ছিল আসল অন্ধকার? আর আজ রাতে, এই ব্যথায়, এই কান্নায়, এই একাকিত্বে—প্রথম বার আলো দেখলাম? হয়তো তা-ই। হয়তো অন্ধকারই আসল গুরু—রাত না হলে যে তারা দেখা যায় না, হারানো না হলে খোঁজার তাগিদ আসে না, আর তুমি যদি এতটা দূরে না থাকতে—তোমাকে চাওয়ার যে-আগুন, সে আগুন কি কখনো জ্বলত?

শেষ বলে কিছু নেই। যেখানে প্রেম, সেখানে শেষ কোথায়? যেখানে তুমি, সেখানে সীমানা কোথায়? আমি শুধু জানি—এই রাত, এই কান্না, এই হাসি, এই বাঁশি, এই চাঁদ, এই পাগলামি—সব তোমার দিকে যাবার পথ। আর পথ যদি তোমার দিকে যায়, তাহলে পথই তো একমাত্র গন্তব্য।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *