তোমাকেই লিখছি, কেমন!
উদয়ন টাওয়ারের পাশ দিয়ে ক্রমাগত যে গাড়িগুলো ছুটে যাচ্ছে, তা দেখতে মন্দ লাগছে না। তুমি খেয়াল করে দেখো—যখন তোমার মনে হবে, তোমার সবচেয়ে পছন্দের মানুষটা ঠিক তোমার পাশেই আছে, তার আর কোনো কাজ নেই, হাতে কোনো ফোন নেই, কিছুই না! সে কেবল দু-চোখ ভরে দেখছে—তোমাকেই! তখন কী হবে, জানো? তুমি ঝরনার মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে, তোমার ভেতরটা আপনমনে হেসে উঠবে। এমন মুহূর্তে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করবে—ভালোবাসলে মানুষ কতটা সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে, কত আনন্দেই না কেটে যায় তার সময়!
এই যে এক মগ চা—কম করে হলেও আনুমানিক আড়াই-শো মিলিলিটার হবে, এটা খেতে খেতে হঠাৎ মনে হলো, তাকে এখান থেকে ভাগ তো দেওয়াই যায়! মনে মনে বললাম, "এই নাও, আমার এখানে বসে চা খাও, আর চলো, গাড়ি দেখি!" মানুষের এই ছুটে চলা, অন্ধকার জানলার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকা, আর ঝিরিঝিরি এই বাতাস—সবাই মিলে আমাকে যেন প্রাণবন্ত করে তোলে। তখন আমি সত্যিই আমার হয়ে উঠি।
কত বার দেখাতে গিয়েও ঘরের ছবিটা আর দেওয়া হলো না। একবার মেঘ আর ফুল দিয়ে একটা ছবি এঁকেছিলাম, তুমি বলেছিলে, "সুন্দর!" একই শব্দ—কেউ বললে মায়া জাগায়, আবার কেউ বললে বিরক্তি জন্মায়। সেদিন শব্দটা আমার আঁকা হয়ে রয়ে গেল মনের গভীরে। শব্দও বাঁধাই হয়, যেমন বাঁধাই হয় কথারা।
শেষপর্যন্ত চা শেষ না করেই রেখে দিলাম। খুব মিষ্টি হয়ে গেছে। চিনি তো আমি খাই না। আসলে আজ প্রথম জিলাপি বানিয়েছিলাম। জিলাপি বানানোর পর সেই হাঁড়িতেই চা করা হয়েছে—তাই এই অবস্থা। রেখে দিলাম—মায়া করে সবটুকু খেয়ে ফেললে সুগার বেড়ে যাবে। আজকাল প্রতিদিন দুপুর হলেই পেটটা ব্যথা করে, যদিও ইফতারির পর আবার সেরে যায়।
আচ্ছা, খেয়াল করেছ—ধরো, দুটো মানুষের মধ্যে কোনো কথা নেই, তবুও দু-জনই অনলাইনে আছে। দৃশ্যটা দেখতে অদ্ভুত রকমের সুখকর। হয়তো নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য ঠিক এখানেই উঁকি দেয়।
ধরো, কেউ যদি তোমাকে বলে, "ইদানীং তোমাকে খুব মিস করি"—সত্যিই কি...ইদানীং? অনুভূতিটা তো ছিলই। হয়তো ব্যাপারটা এমন—মনে পড়াটা এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়, কিংবা মানুষটার নিজেকেই অদ্ভুত রকমের পাগল পাগল মনে হয়। তারপর নিজের ওপরই রাগ হয়, নিজেকেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে—কেন? কেন এত মনে পড়ে? এমন তো কিছুই ঘটেনি, তবুও পাশাপাশি বসা, আলতো ছোঁয়া, কিংবা দু-জোড়া চোখের কিছু নিভৃত আলাপন।
কিছু কিছু স্মৃতি যেন হঠাৎ নামা বৃষ্টির মতো—যার রেশ আজীবন লেগে থাকে জীবনের পরতে পরতে। এ যেন সব কিছু পেয়েও হঠাৎ শূন্যতা অনুভব করা।
ধরো, একদিন তোমায় যদি প্রশ্ন করা হয়—কতটা মনে পড়ে? আর তার উত্তর যদি হয়, "যতটা একটা মানুষ নিজের মনে করে সঙ্গে সঙ্গে বয়ে বেড়ায়। কষ্ট যেন না বাড়ে, তাই ভুলে থাকার ভান করে—তবে তোমার মতো করে জোর করে নয়।"
হয়তো সে কথার পরতে পরতে সাজে না কোনো বেদনার গল্প, কিন্তু তুচ্ছ কিছু গালগল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক অবিনাশী হাহাকার। তোমার কাছ থেকেই সে শিখেছে বেঁচে থাকার মন্ত্র—নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন। তুমি তাকে কতটা ভালোবাসো, তোমার লেখা পড়ে দুনিয়ার আর কেউ না বুঝলেও সে তো বোঝেই! তোমার লেখা, তোমার কথাই তার আনন্দের অন্যতম নাম। তবে তোমার অপ্রাপ্তি কিংবা তোমার কষ্ট দেখতে তার ভালো লাগে না। তুমি যেমন সবটুকু জুড়ে তার ভালো থাকাটা চাও, সে-ও তেমনই।
তোমার লেখার নৈবেদ্যে, জেনে রেখো—এখনও তেমন একান্তভাবে কোনো মানুষ ভালোবাসেনি, আর বাসতেও পারবে না। তবে হ্যাঁ, তোমার সেই অতলান্ত ভালোবাসার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে আমার বড়ো অপরাধী মনে হয়। মনে হয়, আমি যেন জন্মজন্মান্তরের ঋণ-বয়ে-চলা কোনো নিঃস্ব মুসাফির, যে তোমার আলোর সামনে নতজানু হয়ে নিজের অন্ধকারকেই ভালোবেসে ফেলেছে, অথচ চিৎকার করে বলতে পারেনি—ভালোবাসি!
তুমি ভালো থেকো—আমি ভালো আছি।
নৈঃশব্দ্যেরও এক ভাষা আছে
লেখাটি শেয়ার করুন