আমি একবার বাসা থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলাম। বাড়ির পাশের গলি অবধি যেতেই হোসেন সাহেব কী করে যেন খবর পেয়ে যান। বাবা যেমন মেয়ের হাত ধরে বাসায় নিয়ে যান, তিনিও আমাকে খুবই কোমলভাবে হাত ধরেই সবার সামনে দিয়ে বাসায় নিয়ে যান। আমি সারারাত রুমে চুপ করে বসে থাকি। তিনি তাঁর সময়মতোই আমার কাছে আসেন। আমার শরীর গ্রহণ করতে করতে বলেন, "তুমি ঘরেই যেসব দেখতে পাচ্ছ, এরপরে কোন সাহসে বাইরে যেতে চাও? ঘরে শুধু আমি, আর বাইরে কিন্তু আমি বাদে সবাই! সবাই ছিঁড়ে খেতে অপেক্ষা করছে! হা হা হা হা।"
বুঝতে পারলাম, এখান থেকে চাইলেও আমি পালাতে পারব না। আর ঠিকই তো, বাইরের দুনিয়ার কেউ তো সত্যিই আমায় ছাড়বে না।
এসব শুনে নীরা যেন দু-চোখে সেদিন অন্ধকার দেখে। মনে হয়— এসব কী শুনছি? এসব কি গল্প?
আজ হুট করে সেসব মনে পড়ে যায় আবার।
নীরার পরিচয়ে আসা যাক। নীরা যখন ওর মায়ের পেটে, তখনই ওর বাবা বিদেশে পাড়ি জমান। তখন থেকেই নীরার মা ওর নানাবাড়িতেই থাকেন। নীরার বাবা প্রথম দিকে পনেরো দিনে, মাসে, দেড় মাসে এক বার করে ফোন করতেন। মাঝেমধ্যে টাকা পাঠাতেন।
একবার অনেক দিন চলে গেল, নীরার বাবা ফোন করেন না, টাকাও পাঠান না। প্রায় এক বছর পেরিয়ে যাবার পরে, নীরার ছোটো মামা নানান মাধ্যমে খোঁজ লাগিয়ে জানতে পারলেন, তিনি নাকি মারা গেছেন। ওখানকারই বাংলাদেশি লোকজন মিলে তাঁকে দাফন করেছেন।
নীরার বয়স তখন দেড় কি দুই বছর। একেবারেই দুধের শিশু। বাবা কী জিনিস, সেটা নীরা কখনোই জানতে পারেনি। নীরার মা এক বছর ধরে ওর বাবার খোঁজ না পেয়ে আরও আগেই মনে মনে এমন কিছু ধরে নিয়েছিলেন।
নীরার চার মামা, নীরার মা তাদের একমাত্র বোন। কারুরই টাকাপয়সা, জায়গাজমির অভাব নেই। নীরার মাকে কখনো উদাস হয়ে বসে থাকতে দেখলেই, তার মেজো মামা আর ছোটো মামা ছুটে গিয়ে নানান রকমের সান্ত্বনা দিত। মেজো মামা বলত, "আমাদের একটা মাত্র কলিজার টুকরা ভাগনি, ওরে নিয়ে তোর কীসের চিন্তা?" আর ছোটো মামা বলত, "দেখিস বইন, আমাদের ভাগনিরে আমরা চার মামা মিল্লা মাথায় কইরা রাখব।" নীরার সেজো মামা বলেন, "ছোটো, অত বুলি ছাড়িস না, নিজে তো এখনও বিয়েশাদি করস নাই, বুঝবি না। আমার তো নিজের ছেলের দেখভাল করতে করতেই জান গেল!"
কিছুদিন পরপরই মামাদের এসব কাণ্ড দেখে দেখে ছোট্ট নীরা অভ্যস্ত হয়ে যায়। ওর মা ভাইদের কথায় কোনো শব্দ করেন না, নীরাকে বুকে চেপে ধরেন, শুধু কেবল কথা শোনেন। এসবের মধ্যে শুধু নীরার বড়ো মামা কখনও কিছু বলেন না। উনি ব্যবসায়ী মানুষ, সারাদিন ও-ই নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তিনি নিঃসন্তান।
ওঁর স্ত্রী, মানে নীরার বড়ো মামি চাকরি করেন ব্যাংকে। তিনিও খুব নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। কাজ করার পর বাড়ি ফিরে যতটা সময় পান, স্বামী-স্ত্রী দু-জনে মিলে নানান কাজে সুন্দর সময় পার করেন। দু-জনের মধ্যে খুব মিল। এভাবে মামাবাড়িতে বড়ো হতে হতে নীরার বয়স যখন প্রায় আটের কাছাকাছি, একদিন হুট করে নীরার মা স্ট্রোক করে মারা যান।
নীরা তখনও মৃত্যু জিনিসটা নিয়ে ভালো করে কিছু বোঝেই না। মামারা যখন তার মায়ের লাশ নিয়ে যাচ্ছে, তখন নীরা খুব জোরে বলে, "আম্মু, তুমি জলদি ফিরে আসবে কিন্তু, তুমি ফিরলে আমরা চিড়িয়াখানায় বেড়াতে যাব।" এটা শুনে নীরার সেজো মামি কাঁদতে কাঁদতে যেই ছোট্ট নীরাকে জড়িয়ে ধরতে হাত বাড়ান, তখনই তার সেজো মামার চোখ-রাঙানিতে আবার পিছিয়ে পড়েন। আর তার মেজো মামিকে তো ছোট্ট বাচ্চার অজুহাত দেখিয়ে তার মামা অনেক আগেই বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে।
মায়ের দাফন শেষে নীরার চার মামা ফিরে এসে বারান্দায় গোল হয়ে বসে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, ওইটুকু নীরা মামাদের চেহারা দেখেই বুঝে ফেলে, সব পালটে গেছে। এরা যেন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ।
বাবার মৃত্যুর পরে দাদার বাড়ি আর মায়ের মৃত্যুর পরে নানার বাড়ি— দুটোই নরকে পরিণত হয়।
মামাদের জমিজমার হিসেব নীরা কিচ্ছু বোঝে না। শুধু দূর থেকে কয়েক বার "নীরার বিয়ে", "ঝামেলা", "বিপদ", "বোনের সম্পত্তি তো এখন আমাদেরও"— এই টাইপের ভারী ভারী কথা শুনতে থাকে।
নীরার স্বল্পভাষী বড়ো মামা ওকে ডাকেন, "নীরা মা, এদিকে আয় তো।" সে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেলে, মামা তাকে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খান। আর বলেন, "তোরা আপাতত শ্বশুরবাড়ি বসে বসে জমিজমার হিসেব করতে থাক, নীরার মায়ের সম্পত্তি আর নীরার ভাগ নিয়ে যা বোঝার আমি বুঝব।"
এই বলে তিনি নীরাকে নিয়ে চলে যান। নীরা বড়ো মামিকে গিয়ে বলে, "মামি জানো, আমার না বিয়ে!"
"ওমা, এটা তোকে কে বলল, মা?"
"ওই যে, মামারা কীসব বলছিল…'নীরা', 'বিয়ে', 'ঝামেলা'..."
"মামি, মা'কে তুমি জলদি ফোনে বলে দাও, নীরার বিয়ে। মা ঠিক এসে পড়বে।" এসব শুনে ওর মামা-মামি আর কান্না ধরে রাখতে পারেন না। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন। নীরা অবাক হয়। সে এই প্রথম এই গম্ভীর মানুষ দুটিকে কাঁদতে দেখল।
আস্তে আস্তে নীরা বড়ো হতে থাকল। নীরার স্কুলের সুবিধের জন্য ওর মামা সিদ্ধেশ্বরী গার্লসের কাছাকাছি বাসা নিলেন। সেখান থেকে ওর মামির অফিস আর ওর স্কুল একদম কাছে।
নীরা এবার মামা-মামির কাছে একটু একটু করে স্নেহ, মমতায় বড়ো হতে থাকে। ধীরে ধীরে শেষ হয় স্কুল, কলেজ। ইউনিভার্সিটির ফাইনাল ইয়ারে এসে ওর বড়ো মামি মারা যান।
তিন বছর আগের কথা। নীরা সদ্য গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ইন্টার্নশিপ করতে ঢুকেছে, ব্র্যাক ব্যাংকে। সেখানেই পরিচয় হয় রাহাতের সাথে। রাহাতও ব্যাংকেই আছে, সিনিয়র অফিসার হিসেবে।
: তো নীরা, কেমন লাগছে নতুন জীবন?
: কী যেন, বলতে পারি না।
: মানে? তোমার এখানে ভালো লাগছে না?
: না, মামা জোর করলেন, তাই আসা। তা না হলে, ব্যাংকে আবার কেউ চাকরি করে নাকি?
: কী বলছ! এটা কত কত মানুষের স্বপ্নের জায়গা, তুমি জানো?
: আমার এত জেনে কাজ নেই।
: হা হা। শোনো, বিকেলে কফিশপে বসব। আমার মনে হচ্ছে, তোমার সাথে কথা বলা দরকার।
: স্যার, সরি। আমি অফিসের পরে থাকতে পারব না, বাড়ি যেতে হবে।
: জামান আঙ্কেল, মানে তোমার মামা, নিজে বলে গেছেন— "ওকে ভালো করে কাজ শেখাও, অফিসের পরেও ওকে সময় দাও প্রয়োজনে। তোমরা আজকালকার ইয়ং ছেলেমেয়েরা কেমন যেন! কোনো কাজই মন দিয়ে করো না।"
নীরা মনে মনে খুব বিরক্ত হয় মামার ওপরে। এটা তো মামা আমাকে বললেই পারতেন। সে উত্তরে বলে—
: জি, ঠিক আছে, স্যার। অফিসশেষে দেখা হবে।
: ওকে, নীরা।
: তো, বলো, ব্যাংকের প্রতি এত অনাগ্রহের কারণ কী?
: বাইরের সব কাজের প্রতিই আমার অনাগ্রহ। আমি বাসায় থাকতে বেশি পছন্দ করি।
: কীরকম? কী করতে ভালো লাগে, শুনি?
: এই যে, ঘর গোছানো, রান্না করা, বিভিন্ন গাছ দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো, অ্যান্টিক জিনিসপত্র কালেক্ট করা, চা খেতে খেতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে দেখা, বাসায় কোনো মেহমান এলে তাকে নিজ হাতে খাওয়ানো। আমি এসব খুব এনজয় করি। আমার কাছে এটাই জীবন।
: ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা-করা একটা আজকালকার মেয়ে এরকম করে ভাবছে!
: কীরকম করে ভাবব বলে আপনি আশা করেছিলেন?
: আরে, না না, আমি কিছুই আশা করিনি। তোমার কথায় মনে হচ্ছে, তুমি একজন সুগৃহিণী হতে চাও।
: হ্যাঁ, একদম। আমি অন্য কারও মতো করে বাঁচতে চাই না। সাহিত্য আমাকে, কারও জীবনযাপনের ধরনকে বিচার না করে মুক্তমনা হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। শিখিয়েছে, হাজারটা অপশনের মধ্যেও সেটিকে বেছে নিতে, যে-অপশনটা আমার ভালো লাগে।
রাহাত মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে নীরার কথাগুলো। একটা মানুষ কতটা সাদামাটাভাবে নিজের পুরো জীবনের প্ল্যানিং অন্য একজন অপরিচিতের সাথে শেয়ার করে যাচ্ছে, সেটা দেখে মুচকি মুচকি হাসে রাহাত। নীরার চোখ সেদিকে যায়ই না। সে নিজের জীবনের গল্প বলতে ব্যস্ত।
এভাবে কাজে কাজে, কথায় কথায়, কফির মগে, স্বপ্নের বিনিময়ে দু-জন যে কখন দু-জনার প্রেমে পড়ে যায়, টেরই পায় না। নীরা খুব গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলে রাহাতকে। নিজেকে প্রশ্ন করে— "এত ছেলে থাকতে রাহাতই কেন?" উত্তর পায় না। "যদি কাউকে কেন ভালোবাসি, সেটার ব্যাখ্যা দেওয়া যায়, তার মানে, সেটা কোনো ভালোবাসা নয়"— এই লাইনটা নীরার মাথায় ঘুরতে থাকে। এই লাইনটা কার বলা, সে জানে না, কিন্তু একদম ঠিক সময়ে কথাটা মনে পড়ায় খুশিতে যেন নেচে ওঠে নীরা।
কী-এক সুখের সাগরে সাঁতার কাটছে যেন সে, সেই সাগর থেকে তীরে শুধু একটাই মানুষকে দেখা যায়, সে হচ্ছে রাহাত। ওই কল্পনার সমুদ্রটা নীরার ব্যক্তিগত, ও সেটার ঠিকানা রাহাতকেও জানাবে না কখনও।
: কী হে সুন্দরী? কী ভাবছ?
: কিছু না।
: কাজে কি এখন মন-টন বসছে?
: এত ঘনঘন ডেকে পাঠালে কাজ কখন করব, স্যার?
: এখন সব দোষ আমার, না?
: হ্যাঁ।
: তোমার মামা দেশের বাইরে থেকে ফিরুক, তারপরে বিয়ের কথাটা তাঁকে বলবে, ওকে?
: এত তাড়া কীসের?
: সে তুমি বুঝবে না।
: ইন্টার্নি তো প্রায় শেষের দিকে, এরপর প্ল্যান কী?
: রাহাত, ওসব আমার কাজ না, তুমি মামাকে বুঝিয়ে বলে দিয়ো— নীরা কিছু বোঝে না, ওকে দিয়ে এসব হবে না।
: না না, সবই হবে। আমি মামাকে বলব, তোমাকে ছাড়া আর কাউকে দিয়েই হবে না।
: তুমি সবসময় ফাজলামো করো। শোনো, একটা জরুরি কথা আছে। আমার এক বান্ধবী আছে, তমা। ও কাজ করতে চায়, দারুণ স্মার্ট। ওকে বসিয়ে দাও না আমার জায়গায়। আমি এসব করতে চাই না।
: যেন মুখের কথা! বললেই হয়ে যায়।
: তুমি ট্রাই করলে পারবে, সেটা আমি জানি।
: তোমার বান্ধবী কি সুন্দরী? তাহলে ট্রাই করা যেতে পারে।
: কী বললে?...
নীরা চোখমুখ ফুলিয়ে তীব্র গতিতে হাঁটছিল...
: অ্যাই নীরা, দাঁড়াও, আমি তো মজা করেছি। শোনো না একটু।
: তুমি কোনো কথা বলবে না আর আমার সাথে।
: সরি।
নীরা কাঁদতে কাঁদতে রাহাতকে বলে— যাও, আর আসবে না।
: নীরা, সোনামণি, এটা তো রাস্তা, এমন করো না, সবাই দেখছে। এই যে, প্রমিজ করলাম, আর কখনও বলব না।
এই বলে নীরাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে রাহাত, ধীরে ধীরে নীরার কান্না থামে।
: রাহাত, এই যে তমা, ওর কথাই বলেছিলাম।
: হ্যালো তমা।
: হাই রাহাত ভাইয়া।
: লাঞ্চ-ব্রেকে আমরা তিন জন একসাথে বসব, কেমন? এখন একটু তাড়া আছে।
এটুক বলে দ্রুত চলে গেল রাহাত।
নীরের তৃষ্ণা: ২
লেখাটি শেয়ার করুন