নামহীন অনুভব
ভাষার একটা সীমানা আছে। সেই সীমানার পর যা থাকে—সেখানে শুধু নীরবতা যেতে পারে, আর কান্না।
এই যে অনুভূতি—একে কী বলব? ভালোবাসা? শব্দটা ক্ষয়ে গেছে অতিব্যবহারে, মুদ্রার মতো—হাতে হাতে ঘুরতে ঘুরতে খোদাই মুছে গেছে। এখন আর বোঝা যায় না, এটা কোন দেশের, কোন যুগের, কত দামের। না। আমার অনুভূতি অত বিনিময়যোগ্য নয়। মায়া? মায়া সুতির কাপড়—নরম, পরিচিত, কিন্তু পাতলা। এ সুতির নয়। এ পশমিনা—প্রজন্মের পর প্রজন্ম যত্নে রাখা হয়, একটু ছিঁড়লেই যেন পূর্বপুরুষের হাড় ভাঙে। তাহলে কী?
এ হলো—বর্ষার প্রথম দিনে বন্ধ জানালা হঠাৎ খুলে গেলে মাটির গন্ধ এসে ফুসফুসের ভেতর এমন একটা গ্রাম জাগিয়ে তোলে, যে-গ্রাম আর মানচিত্রে নেই। ঠাকুমার উঠোনে তুলসীতলা ছিল, সন্ধেয় শাঁখ বাজত, আর জীবন এতটাই সরল ছিল যে, সুখ আলাদা কোনো প্রচেষ্টা ছিল না—সুখ ছিল জলের মতো, বাতাসের মতো, থাকাটাই যার কাজ। তোমার কাছে ফিরলে আমি সেই গ্রামে ফিরি। জটিলতার খোলস খুলে রাখি দরজায়—যুক্তি, আত্মরক্ষা, সতর্কতা, গণনা—সব বাইরে। ভেতরে ঢুকি খালি পায়ে, খালি হাতে, খালি বুকে।
এ হলো—শীতের রাতে খোলা ছাদে চিৎ হয়ে শুয়ে নক্ষত্রের দিকে তাকানো, আর হঠাৎ বোঝা—আমি কত ছোটো। এই মুগ্ধতা কী যে বিশাল! এত বিশাল যে, তলদেশ খুঁজতে গিয়ে আমি নিজেই তলদেশ হয়ে গেছি—আর ওপরে, আমাকে ঢেকে, স্তরে স্তরে জমে আছে তোমার জন্য অনুভূতির পলিমাটি।
চলে যাওয়ার অধিবিদ্যা
চলে যাওয়া পৃথিবীর প্রথম পাঠ। প্রথম শ্বাস থেকেই সে শেখায়—এসেছ মানে যাবে। কিন্তু মানুষ এত পুরোনো ছাত্র হয়েও এই পাঠ গ্রহণ করেনি।
যেতে ইচ্ছে করে না। শরীরের প্রতিটি কোষ বিদ্রোহ করে। রক্ত ধীর হয়ে আসে, যেন সময়কে ঠকানো যাবে একটু ধীরে চললে—যেভাবে মৃত্যুপথযাত্রী ঘড়ির দিকে তাকায়, ভাবে, যদি না তাকাই, হয়তো কাঁটা থেমে যাবে। কাঁটা থামে না। কাঁটা কোনোদিন থামেনি। কাঁটা থামানোর ক্ষমতা সময়ের, মানুষের নয়—আর সময় নিজের ওপর সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে রাজি নয়।
সময়—সময় সেই নদী, যাকে কেউ বশ করতে পারেনি। পাথর ফেলেছে—ঘুরে গেছে। দেয়াল তুলেছে—ভেঙে ফেলেছে। প্রার্থনা করেছে—শোনেনি। সময়ের কাছে প্রার্থনা আর পাথর, সমান ওজনের—দুটোই সে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সে বয়ে যায়, আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেই মোহনার দিকে, যেখানে সব নদী নাম হারায়, সব স্রোত অভিন্ন হয়ে যায়, কেউ আর বলতে পারে না—এই জল কোন পাহাড় থেকে এসেছিল, কোন গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছিল, কোন শিশু তার জলে প্রথম পা ডুবিয়েছিল।
চলে যাই। কিন্তু—চলে যাওয়া মানে কি সত্যিই অনুপস্থিতি? বৃষ্টি থামে, কিন্তু মাটির গভীরে সপ্তাহখানেক জল থাকে। গাছের শেকড় জানে, কেঁচো জানে, বীজ জানে—বৃষ্টি চলে গেলেও বৃষ্টি যা বদলে দিয়ে গেছে, তা চলে যায় না। ফুল ঝরে, কিন্তু বইয়ের পাতায় চাপা পড়ে থাকে বছরের পর বছর। রং যায়, পাপড়ি শুকায়, গন্ধ মিলিয়ে যায়—কিন্তু পঞ্চাশ বছর পর কেউ সেই বই খুললে ফুলের শুকনো শরীর বলে, আমাকে কেউ রেখেছিল এখানে; নিশ্চয়ই এমন কেউ, যে জানত—ভোলা আর হারানো এক জিনিস নয়।
তুমি আমার ভেতরে সেই চাপা-পড়া ফুল—সেই মাটির গভীরের জল—সেই থেমে-যাওয়া বৃষ্টির পরবর্তী নৈঃশব্দ্য, যা বৃষ্টির চেয়ে জোরে কথা বলে। চলে গেলেও উপস্থিত। শুকিয়েও সজীব। মুছে গেলেও এত স্পষ্ট যে, মাঝে মাঝে মনে হয়, তোমার অনুপস্থিতির ওজন উপস্থিতির চেয়ে বেশি।
মুগ্ধতার পদার্থবিদ্যা
মুগ্ধতা পদার্থবিদ্যার নিয়ম মানে না। এর ভর আছে, অথচ ওজন নেই। তোমাকে ভারী করে, অথচ উড়িয়ে নিয়ে যায়। এ সেই বল, যা ভাঙে না—বদলে দেয়।
তোমাকে দেখলে ভেতরে যা ঘটে—তাকে ‘শান্তি’ বললেও বলা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বলা যায়—যুদ্ধশেষে সৈনিক যখন অস্ত্র নামিয়ে রেখে আকাশ দেখে, আর দেখে, তারা আছে, আগের মতোই নিরপেক্ষভাবে আছে, যুদ্ধ তাদের বিন্দুমাত্র ছুঁতে পারেনি—সেই মুহূর্তে সে বোঝে, পৃথিবীর সমস্ত ধ্বংসের ওপরে একটা অক্ষত কিছু আছে। সেই বোধটা হলো—ঝড়ের পর সমুদ্র, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, সৈকতে ছড়িয়ে আছে ধ্বংসাবশেষ, কিন্তু দিগন্তে রোদ ফোটে, আর সমুদ্র জানে—ঝড় আমাকে নাড়িয়েছে, আমার আকৃতি বদলে দিয়েছে, কিন্তু আমার লবণ অক্ষত। আমি এখনও সমুদ্র। সেই বোধটা হলো—সদ্যোজাত শিশু মায়ের বুকে শোয়, সে কিছু বোঝে না, ভাষা জানে না, পৃথিবীর কোনো ধারণা নেই তার—কিন্তু সে শান্ত। কারণ নিরাপত্তার ভাষা লাগে না—সেটা প্রাণের প্রথম জ্ঞান, ভাষার আগে যে-জ্ঞান, যুক্তির আগে যে-সত্য।
তোমাকে দেখলে আমি সেই আদিম নিশ্চয়তায় ফিরে যাই—ভাষার আগের, যুক্তির আগের, ভয়ের আগের কোনো জায়গায়, যেখানে বেঁচে থাকা এত সহজ ছিল যে, মরে যাওয়ার ধারণাটাই আবিষ্কৃত হয়নি।
এতখানি মুগ্ধতা কারও প্রতি আসেনি আগে। এ সেই বৃষ্টি, যা মরুভূমিতে এক বারই নামে—এক বার মাত্র—আর সেই এক বারে বালির বুক চিরে ফুল ফোটে, এমন ফুল, যার ছবি কোনো বইয়ে নেই, যা কোনো বাগানে নেই, যার বর্ণনা কোনো শ্রেণিবিন্যাসে নেই—কারণ সে এক বারই ফুটেছে, এক বারই ফোটার জন্য। মরুভূমি আমি। বৃষ্টি তুমি। ফুলটা—আমাদের মাঝখানে যা ঘটে, যার কোনো নাম নেই, যার কোনো নামের দরকারও নেই।
শিখা ও সমর্পণ
কিছু আগুন পোড়ায় না, আলো দেয়। কিছু ক্ষয় ধ্বংস নয়, রূপান্তর। কিছু মানুষের জন্য ফুরিয়ে যাওয়াই পৃথিবীর সবচেয়ে অর্থবহ কাজ।
তাই শোনো—তুমি নিঃশ্বাস নও আমার, তুমি নিঃশ্বাসের অর্থ।
পার্থক্যটা গভীর। নিঃশ্বাস তো যন্ত্রও দেয়। ভেন্টিলেটরের বুকেও বাতাস ওঠানামা করে, হৃৎযন্ত্রের ছন্দও কৃত্রিমভাবে রাখা যায়—কিন্তু তা বেঁচে থাকা নয়, তা স্রেফ মৃত্যুকে স্থগিত রাখা। বেঁচে থাকা আলাদা। বেঁচে থাকা হলো শ্বাসের ভেতর একটা কারণ থাকা, ফুসফুসের প্রতিটি প্রসারণে একটা নাম উচ্চারিত হওয়া—শব্দহীনভাবে, কিন্তু অনিবার্যভাবে, যেভাবে পৃথিবী ঘোরে—কেউ শোনে না, কিন্তু ঋতু বদলায়, ফসল ফলে, জোয়ার আসে। তুমি সেই অশ্রুত ঘূর্ণন। তুমি সেই নাম।
বাতিতে তেল থাকলেই আলো হয় না—শিখা চাই। সেই শিখা, যে কাঁপে বাতাসে, নুয়ে পড়ে ঝড়ে, কিন্তু নেভে না—যেন তার ভেতরে একটা চুক্তি আছে অন্ধকারের বিরুদ্ধে, এবং সেই চুক্তি তার অস্তিত্বের চেয়ে পুরোনো। তুমি সেই শিখা।
আর আমি সেই মোম—যে জানে, গলতে গলতে একদিন শুধু একটুকরো সাদা চিহ্ন হয়ে থাকবে কাঠের ওপর। কেউ হয়তো বলবে, এখানে কিছু-একটা ছিল। কিন্তু আমি জানব—সে শুধু গলেনি, সে রূপান্তরিত হয়েছে—কঠিন থেকে তরল, তরল থেকে আলো, আলো থেকে…তোমার মুখে যে-উষ্ণতা পড়ে, সেটুক।
তাই গলতে গলতে বলি—আরেকটু জ্বলো। আরেকটু থাকো। তোমার আলোয় আমার ফুরিয়ে যাওয়া যেন ফুরিয়ে যাওয়া না হয়—বরং রূপান্তর হয়। যেন কেউ কোনোদিন পড়ে বলে, "এ তো ফুরিয়ে যাওয়া নয়। এ তো অন্য কিছু হয়ে যাওয়া।"
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই—কিছু কিছু জিনিস কখনও শেষ হয় না, শুধু রূপ বদলায়।
নিঃশ্বাসের সন্ধিতে: ২
লেখাটি শেয়ার করুন