মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। একটার দিকে হবে, হয়তো দেড়টা। সিলিংয়ের ফ্যান ঘুরছে—সেই একঘেয়ে, ক্লান্ত আওয়াজ, যেন সে-ও ঘুমোতে চায়, কিন্তু কেউ বন্ধ করছে না। পাশের ঘর থেকে কারও নাক ডাকার শব্দ আসছে আবছা, বাইরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে থেমে থেমে—রাতের সেই ডাক, যা একাকিত্বকে আরও গাঢ় করে। বালিশটা ঘামে স্যাঁতসেঁতে। গায়ে মশা বসছে, পালাচ্ছে, আবার বসছে।
এসবের মধ্যে ফোনের আলো মুখে পড়ছে—নীলচে-সাদা, কঠিন আলো। অন্ধকারের বুকে একটা ক্ষতের মতো। সেই আলোয় কেউ একজন লিখছে।
কী লিখছে? চিঠি? না। স্বীকারোক্তি? তা-ও ঠিক নয়। প্রার্থনা? হতে পারে। কিছু লেখা আছে, যা এসব ছাঁচে ধরা যায় না—যেমন কিছু কান্না আছে, যা চোখ দিয়ে ঝরে না, বুকের ভেতরেই একটা হ্রদ হয়ে জমে থাকে বছরের পর বছর, যতদিন না কেউ সেই হ্রদে পাথর ফেলে।
সে লিখছে এমন কাউকে, যাকে সে কখনও পুরোপুরি বলতে পারেনি, সে আসলে কতটা গভীরে ডুবে আছে। হয়তো পুরোপুরি বলা সম্ভবও নয়। জীবনানন্দ বুঝতেন এটা—তাই তাঁর কবিতায় অর্থ কখনও পুরোপুরি ধরা দেয় না, শুধু স্পর্শ করে চলে যায়, আর পাঠক বসে থাকে সেই স্পর্শের রেশ নিয়ে; জানে, কিছু-একটা ঘটল, কিন্তু কী ঘটল, সেটা বলতে গেলে ভাষা হোঁচট খায়।
ভিটগেনস্টাইন বলেছিলেন, যা বলা যায় না, তা নিয়ে চুপ থাকো। সুন্দর কথা। কিন্তু ভিটগেনস্টাইন দার্শনিক ছিলেন, প্রেমিক নন। প্রেমিক চুপ থাকতে পারে না। পারলে সে প্রেমিক হতো না—হতো সন্ন্যাসী, কিংবা পাথর।
বাস্তব এক অদ্ভুত জানোয়ার। সে এমনভাবে আসে যেন ঘুমন্ত মানুষের মুখে কেউ ঠান্ডা জল ছুড়ে দিল। চোখ খুলতেই দেখো—পৃথিবীটা তোমার স্বপ্নের চেয়ে অনেক কম দয়ালু।
সেই বাস্তবের ভেতরে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়—কিছু মানুষ জীবনে আসে না, জীবনকে ধরে রাখে। কাম্যু 'সিসিফাসের মিথ'-এর শুরুতে লিখেছিলেন, আত্মহত্যাই দর্শনের একমাত্র সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—জীবন যাপনের যোগ্য কি না, সেটাই আসল। কিন্তু কাম্যু সম্ভবত জানতেন না—অথবা জানতেন কিন্তু স্বীকার করতে চাননি যে, কখনও কখনও এই প্রশ্নের উত্তর কোনো দর্শনে থাকে না। থাকে একটি মানুষের উপস্থিতিতে। একটি কণ্ঠে, যে শুধু বলে, আছি। এইটুকু। আর এই একটি শব্দ অন্ধকারের দেয়ালে একটা দরজা হয়ে যায়, যেখান দিয়ে একটু আলো আসে—বেশি নয়, একটু। কিন্তু একটু আলোই তো যথেষ্ট, যখন তুমি পুরোপুরি অন্ধকারে।
কেউ একজন আছে। কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত তাকে—প্রতিদিন, প্রতিটি শ্বাসে। কিন্তু কৃতজ্ঞতা সেই শব্দগুলোর দলে পড়ে, যেগুলো মুখে আনলে নিজেকেই অপর্যাপ্ত লাগে। যেন মহাসাগরকে কেউ চায়ের কাপে ধরতে চাইছে। কাপ ভেঙে যায়। জল গড়িয়ে পড়ে। মানুষটা ভেজা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে—বোকার মতো।
এই দুনিয়ায় যদি কারও কাছে ঋণী থাকতে হয়—সেই নাম একটাই। বাকি সব নাম তার পাশে ম্লান। এটা কারও অপমান নয়, এটা শুধু সত্য। কিছু সত্য অপমানের মতো শোনায়, কারণ আমরা সমতায় অভ্যস্ত। কিন্তু ভালোবাসা সমতার ধার ধারে না। সে স্বৈরাচারী—পৃথিবীর সুন্দরতম স্বৈরাচারী।
পড়াশোনার কথা বলে সে। বার বার।
কেউ হয়তো ভাবে, এটা তাগাদা। কিন্তু তাগাদা আর উদ্ধার—দুটো আলাদা জিনিস। ডুবন্ত মানুষের হাত ধরে যা টানে, সেটা তাগাদা নয়—সেটা প্রাণ বাঁচানো। বাতিঘর জাহাজকে আদেশ দেয় না, শুধু দেখায়—এইদিকে তীর। বাকি কাজ জাহাজের।
পরের ঘরে বসে পড়াশোনা করা কী জিনিস—যে ভোগ করে, শুধু সে-ই জানে। নিজের ছাদ নেই। নিজের দেয়াল নেই। একটুকরো নিরিবিলি জায়গা পর্যন্ত নেই, যেখানে বসে একটু কাঁদবে, একটু নিজেকে গুটিয়ে নেবে। রাতে পড়তে বসলে টেবিলের লাইট জ্বালাতেও ভয় করে—পাছে কেউ জেগে ওঠে, পাছে কেউ বলে, "এত রাতে কীসের পড়া?" মানুষের সবচেয়ে গভীর প্রয়োজন—কোনো খাবার নয়, কোনো ছাদ নয়—একটা জায়গা, যেখানে সে নিরাপদ বোধ করে। যেখানে ভেঙে পড়লে কেউ ধরে রাখবে। চলতি ভাষায় যাকে বলে "আশ্রয়"—শুধু মাথার ওপর চালা নয়, বুকের ভেতর একটু উষ্ণতা। যার সেটা নেই, তার কাছে পৃথিবীটাই একটা রণক্ষেত্র। প্রতিটি সকাল একটা যুদ্ধ। প্রতিটি রাত শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি—পরদিন আবার লড়তে হবে জেনেও চোখ বন্ধ করা।
সেই রণক্ষেত্রে বসে বই খোলা—সেটা পড়াশোনা নয়। সেটা বিদ্রোহ। দস্তয়েভস্কির সেই মাটির তলার মানুষটার কথা মনে পড়ে—যে বলে, আমি অসুস্থ মানুষ...আমি বিদ্বেষপরায়ণ মানুষ—অপমানিত, কোণঠাসা। তবু সে তার চেতনা ছাড়বে না, সে তার যন্ত্রণাকে আঁকড়ে ধরে থাকবে, কারণ সেটাই তার অস্তিত্বের প্রমাণ, সেটাই তার বিদ্রোহ। পরের বাড়িতে বসে বই খোলাটাও ঠিক সেরকম—নিঃশব্দে, দাঁতে দাঁত চেপে, একটাই জেদ: আমি মুছে যাব না।
সামনে হাজারটা কঠিন মুহূর্ত। বিষাক্ত কথাবার্তা। অসহ্য পরিস্থিতি। আসবে, বন্যার মতো—চাও কি না চাও। রোমের সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস নিজের ডায়েরিতে লিখতেন, বাধাই পথ হয়ে ওঠে। সুন্দর কথা। কিন্তু মার্কাস সম্রাট ছিলেন—তাঁর পায়ের নিচে সাম্রাজ্য ছিল। যার পায়ের নিচে কিচ্ছু নেই, তার কাছে বাধা পথ নয়, বাধাই সমস্ত মানচিত্র। তবু সে হাঁটে। কেন? কারণ কেউ একজন বলেছে, পড়ো, থেমো না, তুমি পারবে। ব্যস্, এটুকুই। এই একটা বাক্য। আর সে এই বাক্যটা বিশ্বাস করে—নিজের চেয়ে বেশি ওই মানুষটাকে বিশ্বাস করে।
কৃতজ্ঞতা। ছোট্ট শব্দ। কিন্তু ভেতরটা?
সে না থাকলে কী হতো? এই প্রশ্নটা করতেই বুক কেমন করে ওঠে—যেভাবে খাদের কিনারায় দাঁড়ালে পায়ের তলা শিরশির করে। নিচে কী আছে? অন্ধকার। সেই অন্ধকার, যেখান থেকে মানুষ ফেরে না। যেখানে পরিচয় মুছে যায়—জলে-ভেজা কালির মতো, আগে অক্ষর ছিল, তারপর দাগ, তারপর সেটাও শুকোয়, কাগজ পরিষ্কার, কেউ বুঝতেই পারে না, কী লেখা ছিল। মানুষ এভাবেও মুছে যায়—মরে না, কিন্তু মুছে যায়।
কাফকার সেই গল্পটার কথা মনে পড়ে—গ্রেগর সামসা একদিন ঘুম ভেঙে দেখে, সে পোকা হয়ে গেছে। কিন্তু আসল যন্ত্রণা পোকা হওয়া নয়—আসল যন্ত্রণা হলো, পোকা হওয়ার পরও সে পরিবারকে ভালোবেসে যাচ্ছে, আর পরিবার ধীরে ধীরে তাকে বোঝা ভাবতে শুরু করছে। যে-বোন একদিন তার জন্য খাবার রাখত, সে-ই একদিন বলে বসে—এটাকে সরাতে হবে। ভুলে যাওয়াও নয় ঠিক—ইচ্ছে করে সরিয়ে দেওয়া। পৃথিবীতে এর চেয়ে নিষ্ঠুর আর কী আছে—তুমি ভালোবাসছ, কিন্তু পৃথিবী তোমাকে এতটাই তুচ্ছ করে দিয়েছে যে, তোমার ভালোবাসারও কোনো দাম নেই?
সেই পোকা হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখে একটাই জিনিস—কেউ একজন, যে তোমাকে এখনও মানুষ হিসেবে দেখে। যে তোমার দিকে তাকায় যেন তুমি কিছু-একটা—নগণ্য নও, অদৃশ্য নও, পোকা নও।
বাইরে কুকুরটা আবার ডাকছে। ফোনের ব্যাটারি কমে আসছে, লাল হয়ে যাবে একটু পরেই। সময় যাচ্ছে। কিন্তু লেখা থামছে না।
সে তার কাছে কী—নিজেও জানে না ঠিক। কতটা ভালোবাসে—লেখার সাধ্য নেই। রুমি সারাজীবন চেষ্টা করেছিলেন—শামসের জন্য বুকের ভেতরে যা জ্বলছিল, সেটা ভাষায় ধরতে। হাজার হাজার গজল, হাজার হাজার পঙ্ক্তি, মাতাল হয়ে, ঘুরে ঘুরে, কলম ভেঙে ভেঙে—তবু প্রতিটি কবিতার শেষে একটা অতৃপ্তি। যেন বলছেন, না, এটাও পুরোটা নয়। পুরোটা ধরতে পারিনি। হয়তো কোনোদিন কেউ পারবে না। সাত-শো বছরের বেশি হয়ে গেল, এখনও কেউ পারেনি। সেটাই প্রমাণ—কিছু অনুভূতি ভাষার চেয়ে বড়ো, আর ভাষা তার কাছে হেরে যাওয়াকে লজ্জা মনে করে না, বরং সেটাই তার শ্রেষ্ঠ পরাজয়।
মশাটা আবার এল। ঘাড়ে বসল। চাপড় মারল। মরল। হাতে একটু রক্ত লাগল। মুছে ফেলল বালিশের কোণায়। এইসব ছোটো ছোটো বিরক্তির মধ্যে দিয়েই তো বড়ো বড়ো অনুভূতি বয়ে যায়—পৃথিবী মহাকাব্য লেখার জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ রাখে না।
তার মধ্যে পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার যে-তাড়না—সেটা নিজের জন্য ছিল না।
এই কথাটা পড়ে মানুষ হাসবে হয়তো। ভাববে, মধ্যরাতের আবেগ, রোমান্টিক আত্মপ্রতারণা, সকাল হলে নিজেই বুঝবে, কতটা বাজে লিখেছে। কিন্তু যে লিখছে, সে জানে—এটা অতিরঞ্জন নয়। কিছু সত্য অতিরঞ্জনের মতো শোনায়, কারণ আমরা এমন পৃথিবীতে থাকি, যেখানে নিঃস্বার্থতাকে সন্দেহ করাটাই স্বাভাবিক; যেখানে কেউ বললে "তোমার জন্য…", তখন চোখ আর মন বলে শুধু—"বাদ দে, তোর লাভটা কী"।
প্রথম হলে কী হবে, না হলে কী হবে—মাথায় আসত না। মাথায় ঘুরত একটাই ছবি। যদি না পারি—তাহলে ওর সামনে দাঁড়াব কোন মুখ নিয়ে?
মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো বলবেন, এটা উদ্বিগ্ন সংযুক্তি—হারানোর ভয় এত তীব্র যে, মানুষ নিজেকে ক্ষয় করে হলেও ধরে রাখতে চায়। শৈশবে নিরাপত্তা না পেলে এমন হয়, বলবেন তাঁরা। হয়তো ঠিক। হয়তো বিশ্লেষণটা নিখুঁত। কিন্তু একটা ফুলকে ব্যবচ্ছেদ করলে প্রতিটি কোষ দেখা যায়—আর সৌন্দর্য? সৌন্দর্য তো ব্যবচ্ছেদের টেবিলে মরে যায়। কিছু জিনিস বিশ্লেষণের নয়—অনুভবের।
না, ভুল বললাম। বিশ্লেষণ ভুল নয়—বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ। একটা জিনিস একইসাথে—মানসিক ক্ষত থেকে জন্মানো আর সুন্দর—হতে পারে। ভাঙা হাড়ও তো জোড়া লাগার পর আগের চেয়ে শক্ত হয়—সেটা কি ভাঙার কারণে কম মূল্যবান?
নিজের কাছে হার মানে, ওর হেরে যাওয়া—এটা এতটাই ভেতরে ঢুকে গেছে যে, এটা আর চিন্তা নয়, এটা প্রবৃত্তি। শ্বাস নেওয়ার মতো। ভিক্টর ফ্রাঙ্কল বলতেন, মানুষের কাছ থেকে সব কেড়ে নেওয়া যায়, শুধু একটা জিনিস বাদে: যে-কোনো পরিস্থিতিতে নিজের মনোভাব বেছে নেওয়ার শেষ স্বাধীনতা। নিৎশেকে উদ্ধৃত করে বলতেন, যার বাঁচার একটা "কেন" আছে, সে মোটামুটি যে-কোনো "কীভাবে"-কেই সহ্য করতে পারে। সেই "কেন"-টা এখানে কোনো দর্শন নয়, কোনো আদর্শ নয়—সেটা একটা মুখ। একটা মানুষ।
নিঃশব্দ ঝড়: ১
লেখাটি শেয়ার করুন