দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

দর্পণের দর্পণ: ৪



দুর্বলতা ও শক্তির বিপরীত সম্পর্ক—আশ্রয়ের অধিবিদ্যা


আধ্যাত্মিক জীবনে একটি উলটো নিয়ম চলে—যা জাগতিক বুদ্ধিতে স্ববিরোধী: দুর্বল হলেই সবল হবে। যতক্ষণ মানুষ ভাবে, "আমি পারি"—ততক্ষণ পরমসত্তার শক্তি তার কাছে আসে না—পাত্র পূর্ণ, আর একটু জলও ঢোকে না। কিন্তু যখন পাত্র সম্পূর্ণ উপুড় হয়—"আমি পারি না, আমি কিছুই না, আমি ধুলো"—তখন পরমসত্তার শক্তি বর্ষার মতো নামে। শূন্যতাই পূর্ণতার শর্ত—যত ভাঙা, তত আলো ঢোকে—যত দুর্বল, তত শক্তিমান।


সম্পদ চলে যায়—একদিন যে রাজা ছিল, সে ভিখিরি হয়। যৌবন ক্ষয় হয়। বন্ধুরা হারায়। দেহ ভেঙে পড়ে। যা অনিত্য, তা আশ্রয় হতে পারে না—বালির উপর ঘর বানালে ঢেউ এলে ভেসে যাবে। দৃঢ় আশ্রয় একমাত্র পরমসত্তা—যিনি অনিত্য নন, যিনি ক্ষয় হন না। সমর্পণের পর যে-শক্তি আসে, তা মানুষের ক্ষুদ্র শক্তি নয়—সেই শক্তি, যা তারাদের জ্বালায় এবং সমুদ্রকে শান্ত রাখে—অসীম শক্তি।


এই অধ্যায়ের সবচেয়ে গভীর সত্য: দুর্বলতা শুধু শক্তির শর্ত নয়, দুর্বলতা নিজেই একটি শক্তি—একটি ভিন্ন ধরনের শক্তি—যা কঠিন শক্তির চেয়েও শক্তিশালী। জল কোমল—পাথর কঠিন—কিন্তু হাজার বছরে জল পাথরকে ক্ষয় করে, পাথর জলকে থামাতে পারে না। শিশুর কান্না দুর্বল—কিন্তু সেই কান্না পাষাণ হৃদয়কেও গলিয়ে দেয়। সাধকের অশ্রু—তার দুর্বলতার সবচেয়ে সৎ স্বীকারোক্তি—সেটিই তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র—কারণ সেই অশ্রু পরমসত্তার দুয়ার ভাঙে—যে-দুয়ার যুক্তি ভাঙতে পারে না, তর্ক ভাঙতে পারে না, শক্তি ভাঙতে পারে না—সেই দুয়ার একফোঁটা অশ্রুতে খুলে যায়।


নিয়তি ও স্বাধীনতা—ঐশী জ্ঞান ও জীবের ভূমিকা


দর্শনের সবচেয়ে দুর্গম গিরিসঙ্কট—যেখানে মহত্তম পর্বতারোহীরাও পা পিছলে পড়েছেন: পরমসত্তার জ্ঞান কি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, না ভবিষ্যৎ পরমসত্তার জ্ঞানকে? তিনি কি জানেন বলে ঘটে, না ঘটবে বলে তিনি জানেন? একটি অবস্থান: পরমসত্তা বস্তুকে যেমন দেখেন, তেমনই বিচার করেন—তাঁর জ্ঞান বাস্তবতার দর্পণ, বাস্তবতার ছাঁচ নয়। আমের বীজে আম আছে—পরমসত্তা জানেন, কারণ বীজ তা-ই—তিনি বীজকে "আম হও" বলে আদেশ দেন না—আম হওয়া বীজের প্রকৃতি, এবং তিনি সেই প্রকৃতি জানেন।


কিন্তু গভীরতম স্তরে এই পুরো প্রশ্নটিই দ্বৈতের বিভ্রম—যেখানে দুই নেই, সেখানে "কে জানে" আর "কাকে জানা হয়"—এই প্রশ্ন উদ্ভট। কিন্তু আমরা তো দ্বৈতের মধ্যেই বাস করি—আমাদের প্রতিদিনের জীবনে প্রশ্নটি জ্বলন্ত: আমি কি আমার ভাগ্যের কারিগর, না ভাগ্যের পুতুল?


উত্তর সম্ভবত: তুমি কারিগরও নও, পুতুলও নও—তুমি নৃত্যশিল্পী—এবং সংগীত পরমসত্তার—তুমি নাচো, কিন্তু সুর তোমার নয়—তুমি পা ফেলো, কিন্তু ছন্দ তাঁর। নৃত্যশিল্পী কি স্বাধীন?—হ্যাঁ, সে নিজের শরীর নড়াচড়া করে। নৃত্যশিল্পী কি পরাধীন?—হ্যাঁ, সুর ছাড়া সে নাচতে পারে না। দুটোই সত্য—একই সঙ্গে—এবং এই পারস্পরিক নৃত্যেই সৃষ্টির সমগ্র নাটক পরিচালিত হয়—না শুধু জীবের, না শুধু পরমসত্তার—দু-জনের মিলিত শিল্পকর্ম—দু-জনের একসঙ্গে স্বাক্ষরিত চিত্রকর্ম।


বাক্য ও আত্মা—মানবিক ও ঐশীর মিলনবিন্দু


পরমসত্তার নিঃশ্বাস এবং পরমসত্তার বাক্য—দুটি ভিন্ন সত্তা নয়, একই সত্তার দুই কম্পন—যেমন বাঁশিতে ফুঁ দিলে বাতাস ও সুর একসঙ্গে জন্মায়, যা পৃথক কিন্তু অবিচ্ছেদ্য। মানবিক মাটি ও ঐশী আলো একই সত্তায় মিলিত—দেহের ভারী মাটি ও চৈতন্যের ভারহীন আলো—কলসির মাটি ও কলসির ভেতরের আকাশ। জড়ে প্রাণসঞ্চার—সেই আদি সৃজনবাক্যের প্রতিধ্বনি—"ইচ্ছে করি—এবং হয়ে যায়"—সংকল্প ও সৃষ্টির মধ্যে কোনো ফাঁক নেই—যেমন দর্পণের সামনে দাঁড়ালে প্রতিবিম্ব তৈরি হতে সময় লাগে না।


"আমি ও পরমসত্তা এক"—এই বাক্যটি দর্শনের ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী উচ্চারণ—এবং ভুল-বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এটা কি অভিন্নতার ঘোষণা—"আমি" বলতে যাকে জানতাম, সে চিরকালই "তিনি" ছিল? না কি সমর্পণের চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি—"আমার ইচ্ছে ও তাঁর ইচ্ছে এক"—দুটি সেতার যখন একই রাগে বাজে, তখন সুর "এক"—কিন্তু সেতার দুটো আলাদাই থাকে? প্রথম পাঠে সাধক পরমসত্তায় বিলীন—দ্বিতীয় পাঠে সাধক পরমসত্তায় সুসমঞ্জস—বিলয় ও সামঞ্জস্য—দুটোই মুক্তি—কিন্তু মুক্তির স্বাদ ভিন্ন—একটিতে নিজেকে হারানোর আনন্দ, অন্যটিতে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ।


সম্পূর্ণ সমর্পণ সম্পূর্ণ স্বাধীনতার চেয়ে উচ্চতর—সাধারণ বুদ্ধি বলে: স্বাধীনতাই শ্রেষ্ঠ—কারও কাছে মাথা নত করা দুর্বলতা। কিন্তু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা বলে: যে পরমসত্তার কাছে সমর্পিত, সে অন্য কারও কাছে সমর্পিত নয়—না ভয়ের কাছে, না লোভের কাছে, না সমাজের কাছে, না মৃত্যুর কাছে। একমাত্র পরমসত্তার কাছে সমর্পণই প্রকৃত মুক্তি—যেমন মাছ জলে ডুবে আছে, কিন্তু জল মাছের কারাগার নয়—জলই মাছের স্বাধীনতা—জল ছাড়া মাছ মরে, জলে মাছ বাঁচে ও নাচে।


করুণার দুই মাত্রা—সর্বজনীন ও বিশেষ কৃপা


সূর্যের আলো দুইভাবে পৃথিবীকে ছোঁয়: একটি হলো সেই বিক্ষিপ্ত আলো, যা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে—রাস্তায়, ছাদে, গাছের পাতায়, পিঁপড়ের পিঠে—কোনো বাছবিচার নেই—আলো আসে, কারণ সূর্য আছে, ব্যস্‌। এটি সর্বজনীন করুণা—অস্তিত্বের আলো—কেবল "আছে" বলাই সবচেয়ে মৌলিক উপহার। অন্য আলোটি—আতশি কাচের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীভূত—একই সূর্যের আলো, কিন্তু ঘনীভূত, তীব্র—কাগজ পোড়াতে পারে। এটি বিশেষ করুণা—সাধকের অন্তরে আত্মজ্ঞানের আগুন জ্বালানো।


এই দুই করুণার মধ্যে একটি সম্পর্ক আছে: সর্বজনীন করুণা ছাড়া বিশেষ করুণা সম্ভব নয়—সূর্যের আলো না থাকলে আতশি কাচ কিছু করতে পারে না। অস্তিত্ব না থাকলে আত্মজ্ঞান কার হবে? এবং বিশেষ করুণা সর্বজনীন করুণাকে পূর্ণতা দেয়—অস্তিত্ব দেওয়াই যদি শেষ কথা হতো, তাহলে পাথর আর মানুষে কোনো পার্থক্য থাকতো না—দু-জনেই "আছে"—কিন্তু মানুষ “জানে যে, সে আছে"—এই "জানা"-টুকুই বিশেষ করুণা—এই "জানা"-টুকুই মানুষকে মানুষ করেছে—এবং এই "জানা"-টুকুই তার দায়িত্ব ও তার গৌরব।


করুণা পরমসত্তার সারধর্ম—তাঁর অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর স্তর—যেমন মিষ্টতা আখের সারধর্ম, যেমন ভেজা-ভাব জলের সারধর্ম—এবং সারধর্ম কখনো ব্যতিক্রমের কাছে মাথা নোয়ায় না—সমুদ্রের পৃষ্ঠে ঝড় ওঠে, কিন্তু সমুদ্র কখনও শুকোয় না।


সময় ও অনন্তকাল—ক্ষণিকের মধ্যে চিরন্তনের উপস্থিতি


সময় কি বাস্তব? ঘড়ি টিকটিক করে—সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা—কিন্তু ঘড়ি ভাঙলে কি সময় থামে? না—ঘড়ি সময় মাপে, সময় সৃষ্টি করে না। তাহলে সময় কে সৃষ্টি করে?—পরিবর্তন। যদি কিছুই না বদলাত—না সূর্য উঠত, না চাঁদ ডুবত, না পাতা ঝরত—তাহলে "সময়" বলে কোনো ধারণাই থাকত না। সময় পরিবর্তনের ছায়া—এবং পরমসত্তা অপরিবর্তনীয়—তাহলে পরমসত্তার কাছে সময় নেই—তিনি চিরন্তন—না "চিরকাল ধরে আছেন" অর্থে—বরং "সময়ের বাইরে আছেন" অর্থে—যেমন একটি বিন্দু রেখার বাইরে—রেখায় দৈর্ঘ্য আছে, বিন্দুতে নেই—কিন্তু বিন্দু ছোটো নয়, বিন্দু অন্য মাত্রার।


কিন্তু মানুষ সময়ের মধ্যে বাস করে—জন্ম, বৃদ্ধি, ক্ষয়, মৃত্যু—এই শৃঙ্খলে বাঁধা। সময়ই মানুষের কারাগার—"কাল" হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে—একমুহূর্তও থামা যায় না—সুখের মুহূর্তে বলি, "থামো!"—থামে না। দুঃখের মুহূর্তে বলি, "যাও!"—যায়, কিন্তু নিজের গতিতে। মানুষ সময়ের প্রভু নয়, সময়ের যাত্রী—এবং যাত্রীর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই গন্তব্যের ওপর।


কিন্তু কখনো কখনো—বিরল, অমূল্য মুহূর্তে—সময় থমকে যায়। সূর্যাস্তের সামনে দাঁড়িয়ে—প্রিয়জনের চোখে তাকিয়ে—সংগীতের একটি বিশেষ সুরে ডুবে—হঠাৎ "এখন" এত গভীর হয়ে যায় যে, "আগে" ও "পরে" মুছে যায়—শুধু "এই মুহূর্ত"—চিরকালের সমান ভারী—একসেকেন্ডে সমগ্র অনন্তকাল ধরা দেয়। এটি কি বিভ্রম? না—এটি সময়ের পর্দা ফাঁক হয়ে যাওয়া—ক্ষণিকের মধ্যে চিরন্তনের ঝলক—যেমন মেঘের ফাঁক দিয়ে একটু সূর্যের আলো পড়ে এবং সমস্ত দৃশ্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।


সাধকের অভিজ্ঞতায় এই "সময়ের বাইরে পদক্ষেপ" একটি নির্ণায়ক মুহূর্ত। ধ্যানে যখন মন সম্পূর্ণ স্থির হয়—চিন্তার প্রবাহ থামে—তখন সময়ও থামে—কারণ চিন্তাই সময়ের ইঞ্জিন—চিন্তা না থাকলে "আগে-পরে" নেই, শুধু "এখন"—এবং সেই "এখন" অসীম—সেই "এখন"-য়েই পরমসত্তা বাস করেন—কারণ পরমসত্তা সবসময় "এখন"-এ আছেন—তিনি কখনও "গতকাল"-এ ছিলেন না, "আগামীকাল"-এ থাকবেন না—তিনি চিরকালীন "এখন"। এবং মানুষ যখন সত্যিকারের "এখন"-এ প্রবেশ করে—অতীতের আক্ষেপ ও ভবিষ্যতের ভয় ত্যাগ করে—তখন সে পরমসত্তার সমকালীন হয়ে যায়—সময়ের কারাগার থেকে মুক্ত—ক্ষণিকের মধ্যে চিরন্তন।


একটি শিশু "এখন"-এ বাস করে—তার কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই—সে হাসে, কারণ এই মুহূর্তে হাসি এসেছে; কাঁদে, কারণ এই মুহূর্তে কান্না এসেছে—তিনমিনিট পরে সব ভুলে যায়। শিশুর এই "এখন"-এ বাস করাটাই তার আনন্দের রহস্য—এবং সাধকের লক্ষ্যও তা-ই—শিশুর মতো "এখন"-এ ফিরে আসা—কিন্তু শিশুর অসচেতন "এখন" নয়, সচেতন "এখন"—জেনে-বুঝে-অনুভব-করে "এখন"-এ প্রবেশ করা—এবং সেই প্রবেশেই মুক্তি।


সৃষ্টির মহিমাকীর্তন—অস্তিত্বই উপাসনা


পাহাড় গান গায়—কিন্তু তুমি শুনতে পাও না, কারণ পাহাড়ের গান শব্দের নয়, নৈঃশব্দ্যের—তার স্থিরতাই তার গান, তার ধৈর্যই তার প্রার্থনা, কোটি বছর ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাই তার উপাসনা। পাখি গান গায়—সেটি আমরা শুনি—কিন্তু পাখি গান গায়, কারণ গান গাওয়াই তার সত্তা, শ্রোতার জন্য নয়। নদী গান গায়—পাথরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার কলকল—কিন্তু নদী জানে না, সে গান গাইছে—প্রবাহই তার সংগীত। সমগ্র সৃষ্টি সদা মহিমাকীর্তনরত—প্রতিটি ইলেকট্রন তার কক্ষপথে ঘুরছে, প্রতিটি গ্রহ তার সূর্যের চারপাশে নাচছে—এই ঘূর্ণন, এই নৃত্য—কে শেখিয়েছে?—নাচটাই তাদের সত্তা। তাদের "থাকা"-টাই তাদের গান—অস্তিত্বই উপাসনা।


এখানে একটি আশ্চর্য সত্য: মানুষই একমাত্র সৃষ্টি, যে "জানে" সে মহিমাকীর্তন করছে—পাহাড় জানে না, পাখি জানে না, নদী জানে না—কিন্তু মানুষ জানে। এবং এই "জানা"-টিই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব—এবং বোঝা—কারণ যে জানে, তার দায়িত্ব বেশি। পাহাড় নিজের অজান্তেই পরমসত্তার মহিমা প্রকাশ করছে—কিন্তু মানুষ সচেতনভাবে করতে পারে—এবং সচেতন মহিমাকীর্তন অচেতনের চেয়ে অসীমগুণ মূল্যবান—যেমন জানা ভালোবাসা না-জানা ভালোবাসার চেয়ে গভীর এবং সচেতনভাবে না-করাটাও মানুষের হাতে—এটিই তার স্বাধীনতা—এবং তার দায়।


শুধু জ্ঞান—ক্রিয়াবিহীন—গ্রন্থাগারে ধুলো-জমা বই। শুধু ক্ষমতা—প্রজ্ঞাবিহীন—অন্ধ ঘোড়া দৌড়োচ্ছে। প্রজ্ঞা ও শক্তির মিলন—চোখওয়ালা ঘোড়া—সঠিক পথে দৌড়ানো—এটিই পূর্ণতা—যেখানে জানা ও করা, ধ্যান ও কর্ম, অন্তর্দৃষ্টি ও সেবা—একই নিঃশ্বাসে একাকার।


অন্ধকারে আর্তনাদ—আত্মসমর্পণ ও মুক্তি


একটি অন্ধকার ঘর—দেয়াল চারদিকে, ছাদ মাথার উপরে, মেঝে পায়ের নিচে—কোনো দিকে পথ নেই, কোনো ফাটলে আলো নেই। এটি অহংকারের কারাগার—"আমি" যখন পুরো ঘরজুড়ে বসে পড়ে, তখন পরমসত্তার জন্য একটুও জায়গা থাকে না—একটি বেলুন যখন ফুলে ফুলে পুরো ঘর ভরিয়ে দেয়, তখন ঘরে আর কেউ ঢোকে না। "তুমি ছাড়া কোনো সত্তা নেই"—এই আর্তনাদ সেই বেলুনে প্রথম সুচের খোঁচা—ফুস্‌ করে বাতাস বেরোয়—"আমি" চুপসে যায়—এবং সেই চুপসে যাওয়াতেই জায়গা হয়—পরমসত্তা ঢোকেন।


"আমি নিজের উপর অত্যাচার করেছি"—অবিদ্যার সরলতম স্বীকারোক্তি—এবং সবচেয়ে কঠিন—কারণ "আমি ভুল" বলাটা মানুষের পক্ষে সবচেয়ে কঠিন কাজ। এই স্বীকারোক্তির পর একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে: দেয়ালগুলো নিজেই ভেঙে পড়তে শুরু করে—সম্পদের দেয়াল, খ্যাতির দেয়াল, সম্পর্কের দেয়াল, এমনকি "আমি ভালো মানুষ"-এর দেয়ালও—সব ভেঙে পড়ে—এবং ভাঙার পর যা দাঁড়িয়ে থাকে—সেটিই একমাত্র সত্য—নগ্ন, সরল, অলঙ্কারহীন—এবং সেই নগ্নতাই সবচেয়ে সুন্দর।


নিজের সম্পূর্ণ অক্ষমতার বোধ—"আমি কিছুই না"—শূন্যতার সবচেয়ে ভয়ংকর এবং সবচেয়ে মুক্তিদায়ক মুহূর্ত—কারণ শূন্য পাত্রেই পরমসত্তার অমৃত ঢালা হয়। বন্দিদশা থেকে মুক্তি জীবের কৃতিত্বে আসে না—ভোরের আলো বন্দির প্রচেষ্টায় আসে না—আলো নিজেই আসে—বন্দি শুধু জানালাটা খোলে—এবং সেই খোলাটাই তার একমাত্র ভূমিকা। কিন্তু সেই একটি কাজ—জানালা খোলা—সেটি তাকেই করতে হবে—আলো জানালা খোলে না, আলো জানালা দিয়ে ঢোকে—এবং খোলার সিদ্ধান্তটুকু জীবের।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *