গল্প ও গদ্য

তবুও গান: দুই



৩। ভাঙা ও গড়া

ভাঙা সাঁকোর ওপারে

ভাঙা পদ্মের পাশ দিয়ে—পচা ডাঁটা, থেঁতলানো পাপড়ি, তবু সুগন্ধের শেষ অবশেষ—নড়বড়ে সাঁকো পেরোলে রোদ্দুরের সুহৃদ সকাল দাঁড়িয়ে থাকে, পুরোনো বন্ধুর মতো, যে জানে, তুমি আসবে, যে কখনও ঘড়ি দেখে না।

জীর্ণ মাধুর্যের ঘরে বৃক্ষ প্রতিমার মতো নিঃশব্দ—তার ধ্যান এতটাই গভীর যে, শেকড় পাতাল ছুঁয়েছে, জলের শিরা ধরে মাটির হৃৎপিণ্ডে পৌঁছেছে, অথচ কোনো ঘোষণা নেই, কোনো ফলক নেই। সমস্ত গভীরতা এরকমই—মহাসমুদ্রের তল নীরব, সেখানে আলো পৌঁছোয় না, সেখানে মাছেরা নিজেই প্রদীপ; কোলাহল শুধু উপরিতলে, ফেনায়। আমরা চিৎকার করে জানাই, কতটুকু জানি; গাছ চুপ করে দেখায়, কতটুকু হওয়া সম্ভব—শত বছরের প্রমাণ ডালে ডালে ঝুলছে। ইচ্ছে করলেই হয়তো শ্মশানের ধোঁয়াটে আলোর ওপরে আবার সবুজ পাতা জেগে উঠবে—ছাইয়ের বুকে বীজ পড়লে কী হয়, শুধু আগ্নেয়গিরি জানে।

সুখ আর দুঃখ চুরমার হলেও একটা জিনিস অক্ষত থাকে—আর্তি। সেই আর্তি আমার একান্ত, নিজস্ব, আঙুলের ছাপের মতো অননুকরণীয়—প্রতিটি গাছের আলাদা ছায়া, প্রতিটি নদীর আলাদা বাঁক, প্রতিটি ক্ষতের আলাদা ভাষা।

স্বপ্ন ও তার ভগ্নাবশেষ

মাঝে মাঝে কঠিন নিঃসঙ্গতা জীবনকে তার সহজ রূপে দেখিয়ে দেয়—অলংকারহীন, প্রসাধনহীন, কাঁচা মাংসের মতো উন্মুক্ত, হাসপাতালের টেবিলে শোয়ানো শরীরের মতো নগ্ন। ভাঙা ঘরে, আষাঢ়ের সপ্তম দিনে কেউ খড়কুটো কুড়োয়—বাসা বাঁধতে বিশাল বৃক্ষ লাগে না, চড়ুই প্রমাণ। পরাগ খোঁজে কেউ—মেঘ থেকে, রোদের পিঠ থেকে অন্ধকার চুরি করে আনে; চুরি করা অন্ধকারেই লুকিয়ে সবচেয়ে গোপন আলো, ফটোগ্রাফির ডার্করুমে যেমন ছবি ফোটে।

কারও কারও বুক ভাঙে বার বার—শোকে, আঘাতে, আরও আঘাতে, স্তরে স্তরে, ভূমিকম্পের আফটারশকের মতো। প্রতিটি আঘাতের পর বুকের দেয়ালে ফাটল ধরে—কিন্তু সেই ফাটল দিয়েই আলো ঢোকে, সেই ফাঁক দিয়েই বাতাস বয়। ভাঙা জোড়া লাগে সোনা দিয়ে—ভাঙার দাগ লুকোনো নয়, বরং স্বর্ণরেখায় উদ্‌যাপিত, ক্ষতের মানচিত্র গর্বের ভূগোল। স্বপ্ন চূর্ণ হলেও স্বপ্নই বাঁচায়—বেঁচে থাকার সবচেয়ে অদম্য অবলম্বন, সবচেয়ে পাতলা দড়ি কিন্তু সবচেয়ে মজবুত। দেখতে শুধু চোখ বুজতে হয়।

দহন ও দীপ্তি

আগুন শুধু পোড়ায় না—পুড়তে পুড়তে উন্মোচিত করে সত্তার গভীরের চাপা ক্রোধ, যন্ত্রণা, অপ্রকাশিত কথা, সারাজীবনের গিলে-ফেলা চিৎকার। কাঠের ভেতরে লুকোনো ছিল আগুন—কাঠ জানত না, আগুন জানত না; ঘর্ষণ দু-জনকে পরিচয় করিয়ে দিল, সংঘর্ষই পরিচয়ের আদিমতম ভাষা। কাঁচা মাটি দুর্বল, আঙুলে ভেঙে যায়; পোড়া মাটি চিরস্থায়ী, জলেও গলে না। সব কিছু পুড়ে যায় না—তবু প্রতিটি বুকে কোনো আগুন জ্বলে, নিচু শিখায়, নীল আঁচে; যে-বুকে ছাই দেখা যায়, সেখানেও ছাইয়ের তলায় অঙ্গার শ্বাস নিচ্ছে।

যন্ত্রণার আহুতিতে সব শব্দ ভাস্কর্য হয় না—কিছু শব্দ ছাই হয়, কিছু ধোঁয়া হয়ে মিলায় বাতাসে, কিছু চিমনির কালিতে জমে থাকে নাম না জানিয়ে। কিন্তু আগুনে যা বেঁচে থাকে—সেই দহনের গর্ভেই সুন্দরতম মুখ, পোড়ামাটির অমর প্রতিমা। সুন্দর তা-ই, যা আগুন পেরিয়ে এসেছে—যার গায়ে দহনের দাগ, কিন্তু চোখে নতুন ভোরের আলো, ঠোঁটে পুড়ে-যাওয়া গানের সুর।

শোকের জন্মকথা

জীবনের কিছু শোক আঘাতে উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে—পাথরে আছড়ে-পড়া জল ফেনা হয়, যন্ত্রণায় চাপা রক্ত মুখে উঠে আসে। সেই ফেনাই কখনো বিগলিত শ্লোক—যন্ত্রণা থেকে জন্ম-নেওয়া কবিতা, রক্তে-লেখা অক্ষর, শিরায়-আঁকা ক্যালিগ্রাফি। হয়তো কোনো ঋণমুক্ত দিন সূর্যকে প্রণাম করে জেগে উঠবে—দীর্ঘ অসুখের পর প্রথম সকালে জানালা খুললে আলো চোখে ধাক্কা দেয়, অন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সুন্দর সে আলো; হাসপাতালের অ্যান্টিসেপ্টিকের গন্ধ ছাপিয়ে ভেসে আসে রান্নাঘরের ধোঁয়া, দাদির হাতের ডালভাতের গন্ধ।

টুপটাপ ঝরে পড়তে পড়তে হয়তো সে-ই হবে আকাশের সুন্দরতম মুখ—মেঘ ভেঙে বেরিয়ে আসা নীল, ক্ষতের ভেতর থেকে জন্ম-নেওয়া সুস্থতা। কোনো কোনো সোনালি স্বপ্নের পথ নিজ হাতে নিজেই টানে হৃদয়ের রথ—সারথি নেই, মানচিত্র নেই, কম্পাস ভাঙা—শুধু একটা অস্পষ্ট দিকনির্দেশ, হাড়ে-খোদাই-করা প্রবৃত্তি—আলোর দিকে।

অমৃতের ঋণ

সব স্বপ্ন যদি ভেঙে পড়ে—ঝড়ের রাতে বাতিঘর ভাঙে, অন্ধকার সমুদ্রে জাহাজ পথ হারায়, কম্পাসের কাঁটা পাগলের মতো ঘোরে—তাহলে কী অর্থ এই শাশ্বত খেলার? ফুল ক্রমাগত ঝরে, বুকে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে দূর জানালার ছবি—আত্মহারা সময়ের কাছে জীবনের দাম কতটুকু, মুদ্রার কোন পিঠে লেখা? ছবি নয়—মেঘই আনে রোমাঞ্চিত ইতিহাস, চুইয়ে চুইয়ে, ধীরে, ফোঁটায় ফোঁটায়। গুহার ছাদ থেকে জল ঝরে হাজার বছরে গড়ে তোলে পাথরের থাম—স্ট্যালাকটাইট, ধৈর্যের স্থাপত্য, সময়ের ক্যাথেড্রাল।

তবু স্মৃতির তীরে প্রতিদিন সুন্দরের বিশ্বময়তা আমাকে আকাশ করে তোলে—মাথার ওপরে নয়, ভেতরে। যে-আকাশ বাইরে নীল, সে ভেতরে অসীম—বাইরেরটা চোখে দেখা যায়, ভেতরেরটা শুধু অনুভবে। মাটির বহু গভীরেও শক্তির সঞ্চয় থাকে—উপরিতলে শান্ত ঘাস, ভেতরে ম্যাগমার উত্তাল হৃদয়। অমৃতের স্বাদ একবার পেলে মর্ত্যের সমস্ত জলই বিস্বাদ লাগে—সমুদ্র দেখে ফিরলে পুকুর আর ভালো লাগে না।

অমৃতের প্রত্যাবর্তন

আহ্বান থামে না—চোখের পাতায় জ্বলে ওঠে জ্যোতির্ময়ের ছবি, সমতার চিরায়ত প্রদীপ—যা বাতাসে নেভে না, ঝড়ে উলটে পড়ে না, কারণ তার শিখা ভেতর থেকে জ্বলে। উদ্বেলিত বুকে একটিই প্রশ্ন—মানুষ কীসে পাবে ক্ষমা? নিজের কাছে, না কি ঈশ্বরের কাছে? না কি ক্ষমা নিজেই একটি ঈশ্বর?

তোমার মহান পথে দুই হাত পেতে ভিক্ষা করি। দয়া নয়, ভালোবাসাও নয়—দয়া ওপর থেকে নামে, জলপ্রপাতের মতো; ভালোবাসা সমতলে চলে, নদীর মতো—আমরা চাই যা নিচ থেকে ওপরে ওঠে, শেকড় থেকে শাখায়, রসের অদৃশ্য উত্থান। নিষ্ঠুর হিংসা কেবল অন্ধকারের সর্পিল গলিতে ঘুরপাক খায়—নিজেই নিজের গোলকধাঁধা, নিজেই নিজের কারাগার, নিজেই নিজের তালা ও চাবি।

চিরঞ্জীব শিল্পের দূত, এই ক্লান্ত জীবনে আবার অমৃত আনো—সংবেদ, তিতিক্ষা, গভীর নিবিড়তা নিয়ে, ডাক্তারের ব্যাগে যেমন ওষুধ থাকে, তেমন। হে ফাল্গুনী—ফিরে এসো, বসন্ত ফেরে—প্রতিবার একটু আলাদা, প্রতিবার অন্য রঙের, কিন্তু প্রতিবারই বসন্ত, প্রতিবারই ফুল।

অবিনশ্বরের ধাঁধা

ভুবন জন্ম দেওয়া যায়—কিন্তু হৃদয়? হৃদয় হাতের পুতুল নয়, মাটির কাঠামো নয়, ব্লুপ্রিন্টে আঁকা যায় না—সে ভাসবে, ভাঙবে, আবার গড়ে উঠবে, কিন্তু পুরোপুরি আগের মতো কখনও হবে না। ভাঙা হাড় জোড়া লাগলে আগের চেয়ে শক্ত হয়—ক্যালাস, প্রকৃতির নিজস্ব সিমেন্ট। পদ্মায় বাঁধ দিয়ে নদী ঠেকানো যায়—কিন্তু আকাশ? আকাশে বাঁধ বসাবে কে? সুন্দরকে প্রতি সকালে জন্মানো যায়—প্রতি সন্ধেয় ধরে রাখা যায় না, সূর্যাস্ত ফ্রেমে বাঁধা যায় না। বুকের মাধুরী ভেঙে ফেলা কারও সাধ্যে নেই—সে ভাঙা কাচের মতো, টুকরো হলেও প্রতিটি টুকরো পূর্ণ আকাশ ধরে রাখে।

৪। দৃশ্য ও অদৃশ্য

যুগান্তরের প্রদীপ

নিজের বহু সংস্করণ ছাপিয়ে চলেছি—প্যালিম্পসেস্ট, পুরোনো লেখার ওপর নতুন লেখা—নদী প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে লেখে বদলে-যাওয়া তীরের ভাষায়, একই জল নয়, একই নদী নয়। আমি এক যুগপরিক্রমী ছায়া—কখনো ধীর, অন্ধকারের ভেতর দিয়ে শান্ত ঘোড়া, খুরের শব্দ মাটি শুষে নেয়; কখনো বাঁকা পথে হোঁচট খেয়ে জানা হয়—পতনই উত্থানের পূর্বশর্ত, মাটিতে পড়লেই মাটি চেনা হয়।

পথে দূরে দূরে জোনাকি জ্বলে—প্রতিটিই এক-একটি ক্ষীণ প্রতিবাদ অন্ধকারের সংসদে। সান্ধ্যবনের গাছে আঁকা হয় গভীরতার আঁচল—কুয়াশা আর রোদের মিশ্রভাষায় যে-রহস্য, সেই দ্বিভাষিক পাণ্ডুলিপি শুধু ধৈর্যশীল চোখ পড়তে পারে, তাড়াহুড়োর চশমায় সব ঝাপসা। মরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মেঘের কন্যারা ঘূর্ণির ঘোরে নাচে—নাচ থামলেই তো মৃত্যু জেতে, গতি থামলেই জড়তা।

কত কিছু শূন্যে ভাসে ছবি হয়ে, অসমাপ্ত সংলাপ হয়ে, শেষ-না-হওয়া চিঠি হয়ে। যা কেড়ে নেয়, দুই হাতে ফিরিয়েও দেয়—জোয়ার যা নেয়, ভাটি ফেরত দেয়, অন্য রূপে। শেষ পর্দার পরেও আলো জ্বলে থাকে—চিরঞ্জীব তারাই, যারা নিজের ছাই থেকে আবার জ্বলে ওঠে, ফিনিক্স নয়, মোমবাতি—সাধারণ, কিন্তু অপরিহার্য।

বেহালার গোপন সুর

এখনও ফুলেরা রং মেখে ফোটে চোখের সামনে—ইটের ফাটল দিয়ে, চাপা-দেওয়া মাটি ভেদ করে, ফুটপাতের কংক্রিট ফাটিয়ে। জীবন বৃষ্টিপাত—কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি, কাচে-আঁকা তরল চিত্রকলা; কখনো মুষলধারে, রাস্তা নদী হয়ে যায়; তবু কোনো কোনো তৃষ্ণার্ত জলাশয়ে জল জমে থাকে শুকনো মৌসুমেও—তলদেশে, গোপনে, ব্যাঙের ঘুমের নিচে। পার্শ্বচরিত্রের মতো অভিনয় চলে—উৎকট, ফেনিল, তীক্ষ্ণ তরঙ্গের ঢেউয়ে, কিন্তু ক্যামেরা কখনও তাদের দিকে ঘোরে না।

তবু অবাক হয়ে শুনি, বেহালার বাসন্তী সুর কোথাও বাজছে—সেই সুর যে বাজায়, তাকে কেউ চেনে না; সে হয়তো ভিড়ের মাঝে অদৃশ্য, জানালার ধারে নির্জন, কিংবা হাসপাতালের বিছানায় শিরায় স্যালাইনের জল নিতে নিতে, প্লাস্টিকের নলে বেঁচে থাকার তরল বইছে আর আঙুলে অদৃশ্য তার কাঁপছে। বিষয়ের স্তূপ সরালে দেখা যায়—দুঃখ আর ক্ষয়ের পেছনে কিছু-একটা জেগে আছে, আগ্নেয়গিরির তলায় হীরে, কয়লার বুকে যে-আলো কোটি বছর ধরে ঘুমোচ্ছে। নবনীত আকাশ কোথায় জন্মাবে জানি না—তবু বহু হোঁচট খেয়ে, হাঁটু ছড়ে, খুঁজে চলেছি।

অনাবিলের সন্ধানে

ঐশ্বর্যে আনন্দ নেই—সোনার খাঁচায় পাখি গান ভোলে; খাঁচা যত সুন্দর, তত নীরব পাখি। ভালোবাসায় তৃপ্তি নেই—তৃপ্তি এলেই ভালোবাসা ঘুমিয়ে পড়ে, পূর্ণচন্দ্র ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। বিশ্বাসে স্বাদ নেই—অপরীক্ষিত বিশ্বাস কাঁচা ফল, দাঁতে লাগে, মুখ কষ করে। রমণীর প্রেম যতই রমণীয় হোক, সমুদ্রের জলে তৃষ্ণা মেটে না—লবণ যত বেশি, তৃষ্ণা তত গভীর। খ্যাতির প্রাসাদে এক রাত কাটালে বোঝা যায়—দেয়ালগুলো প্রতিধ্বনিতে ভরা, নিজের কণ্ঠ শোনা যায় না, শুধু প্রতিধ্বনি ফেরে, আর প্রতিধ্বনি কখনও মূল সুরের সমান নয়।

এসব ঐশ্বরিক নয়—আমি খুঁজি অনাবিল সম্পদ, যাতে মরচে ধরে না, যা চোর নেয় না, যার মূল্য কোনো বাজারে নির্ধারিত হয় না। অফুরন্ত আত্মার বিকাশ চাই—মুক্ত চেতনা চাই, আকাশ মেঘ এলেও নীল, মেঘের ওপরে সবসময় নীল; ঝড় এলেও অটল, পাহাড়ের মতো নয়, বাতাসের মতো—বাতাসকে ভাঙা যায় না। হাজার দূষণের মাঝে সুন্দরের শীল অক্ষত রাখা—এটুকুই মোক্ষ, এটুকুই ভরকেন্দ্র।

নিঃসঙ্গতার বিপরীত নাম

কখনও নিঃসঙ্গ নই—এটা জোর গলায় বলি না, নিঃশব্দ নিশ্চয়তায় বলি, নদীর মতো যে জানে, সে সমুদ্রে পৌঁছোবে। দেওদারের ঘন শাখায় সংসার পাতা—পাতায় পাতায় আলো আর ছায়ার সংলাপ চলে অবিরাম, যে-ভাষা শুধু ধৈর্যশীল কান শোনে, শুধু স্থির চোখ পড়ে। শীত আসে তুষারের চাদর বিছিয়ে, চলেও যায় পেছনে ফেলে বসন্তের প্রতিশ্রুতি—প্রতিটি প্রস্থানে একটি আগমনের ঠিকানা লেখা। আকাশের অনন্তে লুকিয়ে আরেক আকাশ—প্রতিটি মানুষের ভেতরে আরেকজন, যাকে সে চেনে না, যার সঙ্গে আয়নায় দেখা হয়, কিন্তু কথা হয় না।

পাখি ওড়ে—তার ওড়াটাই প্রমাণ যে, মাধ্যাকর্ষণ চূড়ান্ত সত্য নয়, ডানা তার প্রতিবাদী ভাষ্য। নদীতীরে সমাহিত সুখ নিজেকে প্রমাণের তাগিদ ছাড়াই বসে আছে—যে জানে, সে চুপ করে; যে চুপ করে, সে জানে, জ্ঞানের শেষধাপ নীরবতা। মাটি চিরে ঘাস জেগে ওঠে—প্রতিটি তৃণশিখর অচলায়তনের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র বিদ্রোহ, নরম বিপ্লব, সবুজ পতাকা। দিগন্ত হারিয়ে যায় সীমানা ছাড়িয়ে, পাতায় শিশিরের নূপুর বাজে—গন্ধে, স্পর্শে, প্রতিধ্বনিতে ক্ষণে ক্ষণে বুক ভরে ওঠে এমন পরিপূর্ণতায়, যা একা-একাই সম্ভব, কিন্তু একাকিত্বে নয়—নির্জনতা আর একাকিত্ব ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন দেশ।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *