গল্প ও গদ্য

ছাই ও জোছনার ব্যাকরণ: ৩



সে তারা গোনে। কতগুলো তারা, সে জানে না—কেউ জানে না, বিজ্ঞানীরাও শেষপর্যন্ত পারে না—কিন্তু সে গোনে, কারণ গোনাটাই আসল, সংখ্যা নয়। গোনা মানে মনোযোগ দেওয়া, মানে বলা—আমি দেখছি তোমাকে, তুমি শুধু আকাশের আলো নও, তুমি আমার গণনার অংশ, আমার রাতের অংশ, আমার সেই গোপন জীবনের অংশ, যা রান্নাঘর জানে না, শোয়ার ঘর জানে না, পাড়ার লোকে জানে না—শুধু আকাশ জানে, শুধু বাতাস জানে, শুধু এই ছাদের কংক্রিট জানে, যার বুকে সে শুয়ে পড়ে কখনো কখনো, ক্লান্ত হয়ে, গুনতে গুনতে, আর কংক্রিটের শীতল বুকে পিঠ রেখে—সেই শীতলতা, যা চেনা, যা রান্নাঘরের উনুনের তাপের ঠিক উলটো, যা গায়ে লাগলে পুড়ে-যাওয়া আঙুলগুলো একটু শান্তি পায়—চোখে সমস্ত আকাশ নিয়ে ভাবে, এই আকাশটাই তার আসল ছাদ, এই তারাগুলোই তার আসল সংসার, এই নিঃশব্দতাই তার আসল ভাষা—যে-ভাষায় কোনো অভিযোগ নেই, কোনো দাবি নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো দরখাস্ত নেই, শুধু থাকা আছে, শুধু দেখা আছে, শুধু গোনা আছে—একটার পর একটা, একটার পর একটা, যতক্ষণ না ঘুম আসে, যতক্ষণ না ভোর আসে, যতক্ষণ না মোরগ ডাকে, যতক্ষণ না আজান ভেসে আসে দূরের মসজিদ থেকে আর কাক ডেকে ওঠে বটগাছে, যতক্ষণ না আবার সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয় সেই রান্নাঘরে, যেখানে চুলো জ্বলবে, পেঁয়াজ কাটতে চোখ জ্বলবে, আর কেউ জানবে না, কেন চোখে জল—পেঁয়াজের জন্য, না কি তারার জন্য, না কি সেই বাতাসের জন্য, যা ছাদে পাওয়া যায়, কিন্তু রান্নাঘরে পৌঁছোয় না, না কি এমন কিছুর জন্য, যার কোনো নাম রাখা হয়নি কোনো ভাষায়, কোনো অভিধানে, কোনো কবিতায়—কারণ সেই ‘কিছু’ ভাষার আগে, নামের আগে, এমনকি কান্নারও আগে—সেখানে, যেখানে শুধু থাকা আছে, শুধু সহ্য আছে, শুধু পরের রাতের অপেক্ষা আছে, যখন আবার ছাদ, আবার আকাশ, আবার তারা গোনা—আবার সেই জোছনা গায়ে মাখা, যা রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া যায় না, কিন্তু চামড়া মনে রাখে, ছাদের শীতল মনে রাখে, আর সারাদিন সেই মনে রাখা দিয়েই চলে—চুলোর আগুনে, ফ্যানের গন্ধে, পেঁয়াজের জলে—ভেতরে ভেতরে জোছনা জ্বলছে, কেউ দেখছে না, কেউ জানছে না, শুধু সে জানে, আর তারা জানে, আর ছাদ জানে।

৬। ছাই ও জোছনা, শেষপাতা

তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে—মৃত্যুর পর কী থাকে? আমি বলেছিলাম—ছাই। তুমি বলেছিলে—আর? আমি একটু ভেবে বলেছিলাম—জোছনা। তুমি হেসেছিলে—সেই হাসি, যা প্রশ্ন নয়, উত্তরও নয়, শুধু দুটো মানুষের মধ্যে সেই বিরল মুহূর্তের স্বীকৃতি, যখন কেউ কিছু জানে না, কিন্তু দু-জনেই জানে যে, জানে না, আর সেই যৌথ না-জানা—যেমন দু-জনে মিলে একসাথে পথ হারানো অচেনা শহরে, যেমন দু-জনে মিলে একসাথে চুপ করে বসে থাকা ফাঁকা ঘরে সন্ধের আলো কমে আসছে, কিন্তু কেউ ওঠে না বাতি জ্বালাতে, কেননা অন্ধকার আরাম লাগছে, অন্ধকারে দু-জনের শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে, আর সেটুকুই যথেষ্ট, সেটুকুই সংলাপ, সেটুকুই ঘরে-ফেরা—যে-ঘরে কেউ কখনও থাকেনি, কিন্তু চেনা লাগে, যেমন চেনা লাগে স্বপ্নে-দেখা বাড়ি, যেমন চেনা লাগে এমন কোনো সুর, যা আগে শোনা হয়নি, কিন্তু শরীর তাতে সাড়া দেয়—মাথা দোলে, আঙুল নড়ে, কিছু-একটা খুলে যায় বুকের ভেতর—তালা নয়, দরজা নয়, শুধু একটা জানালা, যা এতদিন বন্ধ ছিল আর এখন একটু ফাঁক হলো, আর সেই ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকল—ঠান্ডা, পরিষ্কার, জোছনার গন্ধওয়ালা বাতাস।

ছাই কথা বলে না। ছাই অতীতের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অনুবাদ—হাজার পাতার উপন্যাস পুড়ে যে মুঠোভর্তি ধূসর গুঁড়ো পড়ে থাকে, তার ভেতরেই আছে নায়ক, নায়িকা, তাদের প্রথম দেখা, যখন বৃষ্টি নেমেছিল আর তার ভেজা চুলের ডগা থেকে জল গড়াচ্ছিল আর সেই জলের ফোঁটায় আলো ভেঙে রামধনু হচ্ছিল—সব আছে…সব, ওই একমুঠো ছাইয়ে—চূর্ণ, মিশ্র, অবিভাজ্য, যেমন অবিভাজ্য মাটি, যেমন অবিভাজ্য সেই একটি দীর্ঘশ্বাস, যার ভেতরে একটি পুরো জীবন ঢোকে—জন্ম থেকে মৃত্যু, প্রথম কান্না থেকে শেষ শ্বাস, মায়ের বুকের গন্ধ থেকে শ্মশানের কাঠের গন্ধ—সব এক নিঃশ্বাসে, সব একমুঠোয়।

আর জোছনা? জোছনা কথা বলে, কিন্তু এমন ভাষায়, যা শুধু তারাই শোনে, যারা ঘুমোয় না—যারা রাত জাগে, কারণ ঘুম আসে না, বা কারণ স্রেফ এটুক…ঘুমের চেয়ে জাগা দরকার, বা কারণ এ-ই…ঘুমোলে স্বপ্ন আসবে আর স্বপ্ন সত্যের চেয়ে সুন্দর আর সেই সুন্দর থেকে জেগে ওঠা সবচেয়ে কঠিন কাজ। যারা জানালা খুলে রাখে শীতের রাতেও, যাদের গায়ে কম্বল নেই, কিন্তু জোছনা আছে—সেই জোছনা, যা গায়ে পড়লে ঠান্ডা লাগে না, গরমও লাগে না, শুধু মনে হয়, কেউ হাত রাখল কাঁধে, হালকা করে, বলল না কিছু, কিন্তু হাত রাখল, আর সেটুকুতেই চোখ ভিজে এল—কেন, তা বলা যায় না, যেমন বলা যায় না, কেন কোনো গান শুনলে গলা আটকে আসে, কেন কোনো গন্ধ পেলে হাঁটু ভেঙে যায়, কেন কোনো আলো দেখলে মনে হয়, এই আলো আগে দেখেছি, কোথায় দেখেছি, কোন জন্মে দেখেছি—বলা যায় না, শুধু টের পাওয়া যায়, শুধু ভেজা চোখে স্বীকার করা যায়—হ্যাঁ, কিছু-একটা আছে, নাম জানি না, জানবও না হয়তো, কিন্তু আছে।

রূপকথা ফুরোয়নি। শুধু গলা বদলেছে—যে-গলায় ঘুমপাড়ানি গান গাওয়া হতো, সেই গলায় এখন সন্ধ্যারতির সুর, তারপর সেই গলাও একদিন থামবে, আর অন্য কোনো গলায় একই সুর উঠবে, একটু অন্যরকম, একটু নতুন, কিন্তু চিনতে পারবে, যে শুনবে—যেমন চিনি কালোমেঘের তেতো, যেমন চিনি ছাইয়ের গন্ধ, যেমন চিনি জোছনার স্পর্শ—এসব তো শেখানো নয়, এসব তো জন্মের সঙ্গে আসা, মাটির সঙ্গে আসা, সেই প্রথম শ্বাসের সঙ্গে আসা, যা নিজেই তেতো ছিল, কারণ বাতাস ঠান্ডা ছিল আর ফুসফুস ছিল কাঁচা। যেমন বদলায় নদীর খাত বছরে বছরে, কিন্তু নদী একই থাকে—একই জল নয়, একই তীর নয়, কিন্তু একই নদী, একই নামে, একই দিকে বয়ে যাওয়া, একই সমুদ্রের দিকে। যেমন বদলায় মানুষের মুখ বয়সে বয়সে, কিন্তু চোখ একই থাকে—সেই চোখ, যা শিশুকালে জিজ্ঞেস করত, কেন আকাশ নীল, কেন পিঁপড়ে সারি দিয়ে চলে, কেন মা কাঁদে রাতে…যখন ভাবে…কেউ দেখছে না—বুড়োকালেও তেমনই জিজ্ঞাসু, শুধু প্রশ্ন বদলেছে, এখন জিজ্ঞেস করে…কতদিন আর, আর দুটো প্রশ্নের উত্তরই—কেন…আর কতদিন—একই নীরবতায় ডুবে যায়, একই আকাশের দিকে তাকায়, একই বাতাসে মেশে।

আমি জানি না, আমরা আছি কি না। জানি না, এই লেখা কেউ পড়বে কি না। জানি না, ছাই থেকে কিছু ফেরে কি না, জোছনা কাউকে সত্যিই ছোঁয় কি না, না কি সেটাও আমাদের বানানো গল্প—আমরা যা ছাড়া বাঁচতে পারি না…সেই গল্প, সেই বিশ্বাস, সেই একটু আলো, যা দেখে পথ চলি অন্ধকারে। শুধু এটুকু জানি—কোথাও একটা মাঠ আছে, অনেক দূরে না হয়তো, বিনা বেড়ার মাঠ, যেখানে ঘাসের গায়ে কান পাতলে মাটির ভেতর থেকে একটা শব্দ আসে—ধীর, গভীর, পুরোনো—সেই শব্দ কী বলে, তা বুঝি না, কিন্তু শুনি, শুনতে থাকি, কারণ শোনাটাই তো থাকা, শোনাটাই তো বেঁচে থাকা, শোনাটাই তো সেই চিরকুট লেখা, যা হয়তো পৌঁছোবে না কোথাও, কিন্তু লেখা হলো, আঙুলে ছাই লেগে আছে, চোখে জোছনা লেগে আছে, আর এই দুইয়ের মাঝখানে যেটুকু সময় পাওয়া গেছে—সেটুকুই জীবন, সেটুকুই পাণ্ডুলিপি, সেটুকুই—সমাপ্তি আর সূচনার মধ্যকার বৈরিতা।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *