১। ধুলোয় যাদের ঠিকানা
কেউ বলেনি আসতে। তবু এসেছি—যেমন আসে নদীর ধারে সেই কুকুর, যে কারও নয়, যে রাতে একা হাঁটে রেললাইনের ধার দিয়ে, যার চোখে আলো পড়লে জ্বলে ওঠে সবুজ—ভয়ের সবুজ, একাকিত্বের সবুজ—কিন্তু সে ভয় পায় না, কারণ ভয় পেতে হলে কাউকে নিজের বলে জানতে হয়, কিছু হারানোর থাকতে হয়, আর তার যে কিছুই নেই, শুধু এই শরীর আছে, যা ক্ষুধায় চলে, তৃষ্ণায় চলে, অভ্যেসে চলে—যেমন চলে ভোরের প্রথম ট্রেন, যার যাত্রী নেই, কিন্তু চলতে হয়, সময়সূচি মানতে হয়, কারণ থামলেই মৃত্যু, থামলেই মরচে, থামলেই লতা উঠবে চাকায়, পাখি বাসা বাঁধবে ইঞ্জিনে, আর একদিন কেউ এসে বলবে—এখানে একটা ট্রেন ছিল, এখন শুধু ঝোপ আছে।
আমিও তেমন। আমিও চলছি, কারণ থামলে কী হবে জানি না, কিন্তু চলতে থাকলে অন্তত রাস্তা আছে, রাস্তার ধুলো আছে, আর সেই ধুলোয় পায়ের ছাপ আছে—আমার, আর আমার আগে যারা হেঁটেছে, তাদের; আর আমার পরেও কেউ হাঁটবে, আর সেই ধুলো সবার পা মনে রাখবে সমান মমতায়, কারণ ধুলো বিচার করে না, ধুলো শুধু গ্রহণ করে—রাজার পায়ের ছাপও, ভিখিরির পায়ের ছাপও, আর বৃষ্টি এলে দুটোই মুছে যায় একই নিরপেক্ষতায়, একই করুণায়।
ধুলো সবচেয়ে সৎ পদার্থ। ধুলো কিছু লুকোয় না, কিছু সাজায় না, কিছু বাড়িয়ে বলে না। যে-জুতোয় হেঁটেছ সারাদিন, ধুলো বলে দেবে, কোন রাস্তায় গেছ, কতদূর গেছ, কোথায় থেমেছিলে দু-দণ্ড—সেই চায়ের দোকানে, যেখানে বুড়ো লোকটা বসে বসে হুক্কা টানে, কাউকে বলে না কিছু—কিন্তু সব জানে, সব দেখে সেই চোখে, যা ধোঁয়ায় ঢাকা, কিন্তু ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে পৃথিবীকে দেখে এমন পরিষ্কার, যেমন দেখে শিশু, যেমন দেখে মৃত্যুপথযাত্রী—দু-জনেরই চোখে ভান নেই, দু-জনেই জানে, পৃথিবী আসলে কী—একমুঠো ধুলো, একটু জল, একটু আলো, আর বাকিটা গল্প—আমাদের বলা, আমাদের শোনা, আমাদের বিশ্বাস-করা গল্প, যা ছাড়া বাঁচা যায় না, কিন্তু যা সত্য নয়, কখনও ছিল না, কোনোদিন হবে না।
মৃত্যুর পর সব কিছু ছাই হয়ে যায়—এ কথা কে না জানে? কিন্তু কেউ বলে না যে, জীবিত থাকতেও আমরা ছাই হয়ে যাচ্ছি প্রতিমুহূর্তে—ত্বকের কোষ ঝরছে ধুলো হয়ে, চুল পড়ছে বালিশে, নখ কাটছি…ফেলে দিচ্ছি, আর এই ঝরে-যাওয়ার ভেতরেই কোথাও, খুব গভীরে, চাপে চাপে তৈরি হচ্ছে একটুকরো হীরে—তাপে তাপে শুদ্ধ, অন্ধকারে অন্ধকারে স্বচ্ছ—যার নাম দিতে পারি না, কিন্তু টের পাই—রাতে, একা, যখন ঘরের সব আলো নেভানো আর শুধু জানালা দিয়ে আসছে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের কমলা আলো, আর সেই আলোয় ঘরের জিনিসগুলো অচেনা লাগে, নিজের হাত অচেনা লাগে, আর তখনই, ঠিক তখনই, ভেতর থেকে কেউ বলে—আমি, এই যে আমি, এই ছাই আর হীরের মাঝখানে, দেখো, এখনও আছি।
ধুলো পায়ে মাখে, ছাই আঙুলে লাগে। দুটোই ধূসর, দুটোই হালকা, দুটোই বাতাসে ওড়ে—কিন্তু ধুলো আসে মাটি থেকে আর ছাই আসে আগুন থেকে। এই তফাত ভুলে যাওয়া যায় না। যা পুড়েছে, তার ছাই অন্যরকম—তার ভেতরে তাপ ছিল, আলো ছিল, সেই মুহূর্ত ছিল, যখন শিখা সবচেয়ে উঁচুতে ওঠে আর সব কিছু দেখা যায় স্পষ্ট, নির্মম স্পষ্ট—তারপর নিভে আসা, তারপর এই ধূসর নরম গুঁড়ো, যা ছুঁলে ভেঙে যায়, ফুঁ দিলে উড়ে যায়।
বাবা-মা যখন মরলেন, চিতার ছাই হাতে তুলে দেখেছিলাম—এটাই? এতটুকু? একটা পুরো মানুষ, তার হাসি, তার রাগ, তার রান্না-করা ডালের গন্ধ, তার হাতের উলটোপিঠে ফুলে-ওঠা শিরার নকশা, তার ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করা—সব এই একমুঠোয়? হ্যাঁ। এই একমুঠোয়। আর এই মুঠো থেকেই জানা—আমরা যা ভারী মনে করি, তা আসলে হালকা, আমরা যা স্থায়ী মনে করি, তা আসলে ফুঁয়ে উড়ে যায়, আর তবু…তবু—আমরা ভারীই থাকি, স্থায়ীই থাকি, কারণ জ্বলে থাকাটাই তো আসল, ছাই তো পরের কথা।
২। কালোমেঘ, অথবা যে-ভাষায় বৃষ্টি কথা বলে
বৃষ্টি কোনো ভাষা মানে না। বৃষ্টির কোনো বর্ণমালা নেই, কোনো ব্যাকরণ নেই, কোনো যতিচিহ্ন নেই—শুধু পতন আছে, অবিরাম পতন, আর পতনের পর মাটিতে গিয়ে ভেঙে যাওয়ার সেই শব্দ আছে, যা এক অর্থে সংগীত, অন্য অর্থে প্রলাপ, আর আরেক অর্থে—যা কেউ স্বীকার করে না—প্রার্থনা। প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা আকাশ থেকে পড়ছে মাটির দিকে, যেমন পড়ে সিজদায় এমন কেউ, যে জানে না কার কাছে মাথা নামাচ্ছে, কিন্তু নামাচ্ছে—মাথা নামানো ছাড়া আর কিছু পারছে না সে, কারণ ভেতরে এত ভার জমেছে যে, দাঁড়িয়ে থাকাই অসম্ভব।
তুমি বলেছিলে, বৃষ্টি তোমাকে মনে করিয়ে দেয় সেই দুপুরের কথা—কোন দুপুর, কোন বছর, কোন শহর, তুমি বলোনি; আমিও জিজ্ঞেস করিনি, কারণ কিছু দুপুর বলার জন্য নয়, শুধু বহন করার জন্য—যেমন বহন করে নদী তার তলদেশে পাথর, মসৃণ হতে হতে গোল-হয়ে-যাওয়া পাথর, যার ধার ক্ষয়ে গেছে জলের ধৈর্যে, সময়ের ধৈর্যে—তেমনই কিছু দুপুর আমরা বহন করি বুকের ভেতরে, তাদের ধারালো কোণগুলো ক্ষয়ে গেছে, কিন্তু ভার যায়নি, শুধু ব্যথা বদলেছে, তীব্র থেকে মৃদু হয়েছে, মৃদু থেকে হয়েছে এমন একটা স্থায়ী নিচু সুর, যা সারাক্ষণ বাজে, কিন্তু কানে এত অভ্যস্ত যে, শোনা যায় না; শুধু বৃষ্টি এলে, হঠাৎ সেই সুর জোরে বাজে, আর তখনই মনে পড়ে—ওই দুপুর, ওই জানালা, ওই মুখ।
তুমি বলেছিলে, সব কিছু লিখে রাখো। আমি লিখতে বসেছিলাম—কিন্তু কোন কালিতে? কালো কালিতে লিখলে শোকের চিঠি হয়, নীল কালিতে লিখলে দরখাস্ত হয়, লাল কালিতে লিখলে সতর্কবাণী হয়—কোন রঙে লেখা যায় সেই বিকেলের কথা, যখন তুমি চুল বেঁধেছিলে জানালার আলোয় আর আমি দেখেছিলাম তোমার ঘাড়ের ওপর একটা তিল, ছোট্ট, যা আগে দেখিনি, আর সেই তিলটুকুই সেদিন আমার কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি তথ্য, সবচেয়ে গোপন মানচিত্র, সবচেয়ে পবিত্র পাঠ।
তাই লিখতে পারিনি। শুধু বসেছিলাম খাতা খুলে, কলম ধরে, আর কালি শুকিয়ে যাচ্ছিল নিবে—যেমন শুকায় চোখের জল, যদি কেউ না দেখে, যেমন শুকায় সেই সমস্ত বলার কথা, যা বলার মানুষটা চলে গেলে আর বলা যায় না, শুধু জমে থাকে কলমের নিবে, খাতার মলাটে, টেবিলের ড্রয়ারে, যেখানে একদিন কেউ খুঁজে পাবে একটা খালি খাতা আর ভাববে—এতে কিছু লেখা হয়নি, অথচ এতে সব লেখা হয়ে গেছে—সেই কালিতে, যা চোখে দেখা যায় না, শুধু বুকে পড়া যায়।
কালোমেঘ ভেষজ গাছ—তেতো, ঔষধি, সারায়। আমিও তোমাকে সেই নামে ডাকি মনে মনে—কারণ তোমার কথাও তেতো ছিল, সেই তেতো, যা ওষুধে থাকে, যা মা জোর করে খাওয়াত জ্বরের ঘোরে, চা-চামচে ঢেলে বলে—গিলে ফেলো, এখন কষ্ট হলেও পরে সুস্থ হবে। তোমার সত্যও তেমনই ছিল—তেতো, অপ্রিয়, এমন কথা, যা শুনতে চাইনি, কিন্তু শোনা দরকার ছিল, যেমন দরকার ছিল জানা যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে—সূর্য আমাদের চারদিকে নয়—যদিও চোখ বলে উলটো, যদিও মন চায় নিজেকে কেন্দ্রে রাখতে। তোমার নীরবতাও সারাত—সেই নীরবতা যা চিৎকারের চেয়ে তীব্র, অভিযোগের চেয়ে ভারী, যা ঘরে ঢুকে বসে থাকত চেয়ারে, টেবিলে, বিছানার ওই পাশে, যেখানে তুমি শুতে।
আর এখন যে তুমি নেই—এই বিশাল, এই অন্ধকারময় না-থাকা—ঘরের প্রতিটি কোণে আছে, চায়ের কাপের তলানিতে আছে সেই দাগ, যা তুমি রেখে গেছ—চায়ের নয়, থাকার দাগ, না-থাকার দাগ—আর ঘুমের ঠিক আগের সেই মুহূর্তে আছ তুমি, যখন চোখ বুজলে অন্ধকারে তোমার মুখ ভেসে ওঠে—স্পষ্ট নয়, ঠিক যেমন মনে আছে তেমনও নয়, বরং এমন যেন জলের তলায় দেখছি, স্রোত কাঁপাচ্ছে, ভাঙছে, আবার জুড়ছে—আর আমি জানি না, কোনটা তুমি আর কোনটা আমার বানানো তুমি, কোনটা স্মৃতি আর কোনটা কল্পনা—হয়তো তফাত নেই, হয়তো স্মৃতিই কল্পনা, হয়তো কল্পনাই একমাত্র সত্য—আর তখন যে-মুখ থাকে রাতে, বালিশের পাশে, খোলা, কাঁচা, অসুরক্ষিত—সেই মুখেই বৃষ্টি পড়ে, সেই মুখেই কালোমেঘের তেতো ওষুধ লাগে, সেই মুখেই তোমার স্মৃতি এসে ঘুম ভাঙায়।
৩। যে-ঘড়ি সময় দেখায় না
দেয়ালে একটা ঘড়ি টাঙানো আছে—বন্ধ। কাঁটা আটকে আছে তিনটে বেজে সাতে। ঘড়ির নিচে একটা পেরেক, পেরেকে একটা ক্যালেন্ডার—গত বছরের, পাতা ওলটানো হয়নি, চিরকাল মার্চ, চিরকাল সেই ছবি—নদীর ধারে একটা গাছ, গাছের নিচে কেউ বসে আছে; কে, তা বোঝা যায় না, কিন্তু বসে আছে। ঘড়ি আর ক্যালেন্ডার—দু-জনে মিলে ঠিক করেছে, সময় আর যাবে না এই ঘর থেকে, সময় আটকে থাকবে এই দেয়ালে, এই পেরেকে, এই মার্চে, যেমন আটকে আছে দেয়ালের হুকে ঝোলানো ব্যাগটায় তোমার ফেলে-যাওয়া চশমা, যেমন আটকে আছে রান্নাঘরের তাকে তোমার হাতে বানানো আচারের শেষ বয়ামটা—মুখ খুলিনি এখনও, খুলব না, কারণ খুললেই গন্ধ বেরোবে আর গন্ধ বেরোলেই তুমি ঘরে ফিরে আসবে একমুহূর্তের জন্য, আর সেই একমুহূর্তের পর যখন আবার চলে যাবে, তখন যে-শূন্যতা হবে, তা আগের বারের চেয়ে বড়ো হবে, আরও বড়ো, আরও গভীর, আর আমি সেই গভীরে পড়তে চাই না—তার চেয়ে বন্ধ ঘড়ির তিনটে সাতেই থাকি, বন্ধ বয়ামের ঢাকনায় হাত রাখি শুধু, খুলি না, শুধু জানি—ভেতরে আছ, এইটুকু যথেষ্ট।
বাবা বলতেন—সময় পেরিয়ে যায় না, সময় জমা হয়। প্রতিটি মুহূর্ত শরীরের কোথাও-না-কোথাও জমা হয়ে থাকে—হাঁটুতে জমে সেই সিঁড়ি, যা প্রতিদিন ওঠা হয়েছে তিনতলায়, ভারী বাজারের থলে হাতে, সবজির গন্ধ আর মাছের আঁশটে ভার কনুইতে; কোমরে জমে সেই ঝুঁকে-থাকা বছরগুলো—ধানক্ষেতে, সেলাইকলে, রান্নাঘরে, যেখানে উনুনের আগুন মুখে লাগে আর চোখে ধোঁয়া লাগে, আর কেউ বলে না কিছু, কারণ ধোঁয়ায় চোখ-জ্বলা তো রোজকার, ওটা কান্না নয়; চোখের কোণে জমে প্রতিটি বিদায়—রেলগাড়ির জানালায় হাত-নাড়া ক্রমশ ছোটো-হয়ে-যাওয়া মুখ, বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে-থাকা শাড়ির আঁচলে চোখ-মোছা মা, শ্মশানে আগুন জ্বলে ওঠার পর পেছন ফিরে হাঁটা, যখন পায়ে চটি বাঁধতে হয়, কিন্তু আঙুল কাঁপে; কপালের ভাঁজে জমে প্রতিটি দুশ্চিন্তার রাত, যখন ছেলে ফেরেনি বাড়ি, টেলিফোন বেজেছে আর হৃৎস্পন্দন থেমে গেছে একমুহূর্তের জন্য—সেই একমুহূর্ত, যা ঘড়িতে মাপা যায় না, কিন্তু শরীর মাপে, শরীর মনে রাখে; শরীর কখনও কিছু ভোলে না।
বুড়ো মানুষের শরীর, তাই ভারী—বয়সের ভারে নয়, জমে-থাকা সময়ের ভারে, যেমন ভারী হয় নদীর তলদেশ পলি জমে জমে, যেমন ভারী হয় পুরোনো বাড়ি স্মৃতি জমে জমে—প্রতিটি ঘরে কারও হাসি আটকে আছে দেয়ালের ফাটলে, প্রতিটি দরজায় কারও আঙুলের ঘষায় ক্ষয়ে যাওয়া কাঠের দাগ, প্রতিটি জানালায় কারও তাকিয়ে-তাকিয়ে ক্ষয়ে-দেওয়া কাচ।
ছাই ও জোছনার ব্যাকরণ: ১
লেখাটি শেয়ার করুন