গল্প ও গদ্য

ঘোরলিপি



এক।

তোমার ছোটোকালের ছবিগুলো দেখলে ভীষণ ভালো লাগে। ইচ্ছে করে, আদর করে দিই। আবার ভীষণ আফসোসও লাগে। আমিও ঠিক এতটাই নিষ্পাপ আর মায়াবী ছিলাম। দুটো মায়াবী মানুষের কেন মিলন হয়নি তখন?

পিচ্চিপাচ্চিরা বাইরে পিকনিকের আয়োজন করছে; আমি অবাক—এরা সত্যিই পিকনিক করে! বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ করে।

বৃষ্টি দেখে কী যে ভালো লাগছে! বৃষ্টিকে বললাম, থেমে যেয়ো না, সারারাত থেকো, পারলে ঝড় হয়ে এসো।

দুই।

বৃষ্টিকে বলেছিলাম, আজ সারারাত থেকো। আমার প্রিয় আজ আসবে। সব বৃষ্টিভেজা রাত শুধু আমাদের হবে। আমি হয়তো কোনো ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। ভুলেই গিয়েছিলাম, আমি কে, তুমি কে। তুমি হঠাৎ মনে করিয়ে দিলে সবটা, আমার ঘোর কেটে গেল, সমস্ত আনন্দ বিষাদে পরিণত হলো।

কিছুটা সময় অস্থিরতায় কেটে গেল। সত্যিই তো, তোমার এত বিকল্প থাকতে আমাকে ভালোবাসতে যাবে কেন! কিন্তু সত্যিটা তো আমি জানি, যা তুমিও জানো না। চিৎকার করে বললাম, ওই ঘোরলাগাটুকুই সত্যি, বাকি সব মিথ্যে।

তুমি শুনতে পেলে কি না জানি না।

ভালোবাসার কোনো সংজ্ঞা নেই, প্রিয়! তোমার ওই শরীরটা আমার বড্ড আপন। ক্লান্তিতে তোমার শরীরে ঘুমিয়ে পড়বার একটু দরকার ছিল।

বৃষ্টিরা চলে গেল কেন ধীরে ধীরে? একটা রাতই তো আমরা বৃষ্টি ভাগ করে নিতে চেয়েছিলাম।

প্রচণ্ড মাথা ঘুরছে। শোনো, আমাকে আর কখনও মনে করিয়ে দিয়ো না, আমি কে। আমি বেশিদিন থাকব না।

তুমিও খুব ক্লান্ত; এসো, একটু ঘুমিয়ে নাও।

তিন।

এই শোনো, তোমার প্রেমিকা হওয়াটা অত সহজ নয়। তোমাকে সামলানো প্রচণ্ড কঠিন। আমি ছাড়া আর কে পারবে, বলো! এত ভালোবাসা আছে কার কাছে?

চুপ থাকো, এত কথা বোলো না তো। আর একটা লাইনও তুমি লিখবে না। তুমি শুধু ঘুমোবে আমার কাছে।

চার।

এই যে সাময়িক ভালো থাকার চেষ্টা—জীবন মানেই তো যন্ত্রণা। কতদিন ধরে ভুলেই গেছি, কে আমি, কী আমার জীবন। আমার কোনো কিছু ভালো লাগে না, প্রিয়। এতটা নিরাসক্ততা নিয়ে আসলে বাঁচা যায় না। দেখো না, তোমাকে কেমন আঁকড়ে ধরে থাকি। তুমি অপমান করলেও গায়ে মাখি না, তুমি ছুড়ে ফেলে দিলেও হয়তো আবার আসব। এইটুকু ছাড়া জগতে আমার যে ভালো থাকার আর কিছুই নেই। আমি কতটা দুঃখ বয়ে চলি, তুমি ভাবতেও পারবে না।

তোমারও একটা 'তুমি' ছিল, তাই না? সে কোথায় এখন? জানতে ইচ্ছে করে—কে সে ভাগ্যবতী, সে কেমন করে তোমায় ভালোবাসত? তাকে প্রচণ্ড ঈর্ষা করব—সেই শক্তিটুকুও আমার নেই। তুমি একদিন বোলো তার কথা, আমি অধীর আগ্রহে শুনব।

তোমাকে আমার ধন্যবাদ দেওয়া হয় না কখনও। এই যে এত সুন্দর সুন্দর কথা লেখো তুমি, একটু হলেও ভালোবাসো—এটাই আমার পরম পাওয়া।

পাঁচ।

এ-ই হলো আমার জীবন। আমার ভেতরে যে কতটা বিতৃষ্ণা...

সারাদিন ঘরের মানুষের ভয়ে ফোনটাও ধরিনি, তারপরও অশান্তি। এখন দরজা বন্ধ করে তোমাকে লিখছি। কোথাও একটু ঠাঁই থাকলে আমি এই সমস্ত মানুষ থেকে দূরে চলে যেতাম।

আত্মহত্যার মতো আজেবাজে বিষয়কে প্রশ্রয় না দেবার শিক্ষা আমার আছে, কিন্তু আজকাল খুব বুঝতে পারি—আশপাশের সব কিছু কতটা যন্ত্রণাদায়ক হলে মানুষ পালানোর পথ খোঁজে। আহা, আমার যদি কোনোভাবে মৃত্যু হয়ে যেত!

আমি সব বাহ্যিকতাকে উপেক্ষা করতে চাই, কিন্তু আশপাশটা যদি এমন মানুষ দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকে যে, সবসময়ই আমাকে ছোটো করেই চলে, তাহলে উপেক্ষা করাও যায় না। অনুভূতিশূন্যতা খুব কাজের।

ছয়।

প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

আমার দুটো সত্তা, দুটো জীবন। একটা আমার ভেতরের—পরম আনন্দের, আমার আত্মার। আর একটা বাইরের—পরিস্থিতির চাপে ক্লিষ্ট নিত্যদিনের সংসার। এখান থেকে আমি পালাতে চাই, কিন্তু উপায় পাই না। অনেকসময় দুটো জগতে একসঙ্গে তাল মেলাতে পারি না; আমায় ক্ষমা কোরো। আমি নীরবে শুধুই শেষ হয়ে যাই।

দূরেই চলে গিয়েছিলাম খানিকটা। কী অদ্ভুত—আবার তোমায় স্বপ্নে দেখলাম! এত অভিমান! এত স্বর্গীয় অনুভূতি! ভেতরটা ককিয়ে উঠল তীক্ষ্ণ এক প্রিয় ব্যথায়। আমার চিন্তার জগৎটা এলোমেলো হয়ে গেল আবার।

আমার যন্ত্রণা আমি কারে দেখাই! ঈশ্বর কেন আমার দুটো জগৎ আলাদা করলেন? এখান থেকে তুমি আমায় মুক্তি দিতে পারো না?

আমার পরম আনন্দের জগতে থাকতে গেলে, আমার স্বপ্নের জগতে থাকতে গেলে, আমার প্রিয়তমের সঙ্গে অভিমানের সংসারটা করতে গেলে বোধ হয় চিরনিদ্রা ছাড়া উপায় নেই।

সাত।

একটা কথা বলব?

স্বপ্নে যাকে দেখি, সে হুবহু তোমার মতো দেখতে; তাকে আমি প্রাণ খুলে সহজ ভাষায় সব বলতে পারি, ইচ্ছে হলে আদর করতে পারি। তোমাকে প্রাণ খুলে সব কিছু বলতে এখনও কিছুটা জড়তা কাজ করে—এটাকে কি অহং বলে, না কোনো ভয়?

তুমি কি আমার কাছে সহজভাবে আসতে পারো না? স্বপ্ন আর বাস্তবের দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে দিতে পারো না?

আট।

কয়েক দিন তোমার কোনো লেখা পড়ার সময় পাইনি, সময় করেও নিইনি। আমারও তো অভিমান হয়। এই যে একটা ভুল জীবনে, ভুল মানুষের সঙ্গে বাস করছি—কতটা সংগ্রাম করে যে চলি, সে আমিই জানি—এ তো তোমাদের ওপর অভিমান করেই! এতটা অভিমান না থাকলে এত কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা কোথায় পেতাম!

আমি জানি, অভিমানের মূল্য জগতে কেউ কোনোদিনই দেয় না। ছোট্ট একটা জীবন, শেষই তো হয়ে গেল।

সব কিছু মেনে নেওয়া যায়, শুধু—আমার আদরের মানুষটা ভালো নেই—এইটুকু মেনে নিতে খারাপ লাগে।

নয়।

আমার মধ্যেও অনেক কাঠিন্য; আমি সহজে কারও সঙ্গে সহজ হতে পারি না। এই যে এখন সহজ হয়ে লিখছি—একটু অপমান বা অবহেলার লেশমাত্র পেলে আমি সেখান থেকে সরে আসি, তা যত কষ্টই হোক।

অতীতে কত বার তোমার কাছ থেকে সরে গেছি, আবার ফিরে এসেছি। এই এক জায়গায় আমি নিজের সঙ্গে পারি না; কোথায় যেন কী-একটা তৃতীয় শক্তি আমাকে আটকে রাখে।

তুমি তো আমার সঙ্গে সরাসরি কোনো কথাও বলো না। গুরুতর কোনো পরিস্থিতিতেও কিছু জানানোর উপায় নেই। সব কিছু কি আমার ধরে নেওয়া, প্রিয়?

আমার জায়গায় বসে একদিন একটু ভেবে দেখো—কতটা ভালোবাসলে শূন্যের মধ্যে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া যায়। এই ভালোবাসার দাম কি তুমি কোনোদিন দিতে পারবে?

তুমি দিতে চাইলেও আমি নেব না। তুমি জগতে সবাইকে সব কিছু দিতে পারবে, কিন্তু আমাকে কখনও কিছু দিতে পারবে না। আমি তোমার থেকেও বেশি কঠিন।

দশ।

আমার মধ্যে এত কথা আছে, এত গল্প আছে, এত প্রেম আছে, এত অভিমান আছে—যেগুলো কোনোদিন বলা হবে না। আমি ফুরিয়ে যাচ্ছি রোজ। জগতে কারও কাছে আমার বিন্দুমাত্রও কোনো প্রত্যাশা নেই। শুধু আমার একান্ত মানুষটার কাছে একটা চাওয়া আছে—একবার চোখ বন্ধ করে প্রাণভরে শ্বাস নিতে চাই তার বুকে, পরম নির্ভরতায়। আমার তিলে তিলে জমাট-বাঁধা দুঃখগুলো অশ্রুতে গলে যেত তখন। এরপর মৃত্যু হলেও আক্ষেপ ছিল না।

এগারো।

হঠাৎ করে খুব শান্ত হয়ে গেছি, প্রিয়। কী-এক মানসিক প্রশান্তি পেয়েছি তোমার সেই লেখাটা পড়ে—যেন ভেতরের সমস্ত ঝড় থেমে শান্ত নদী হয়ে গেছে। তুমি জানো, চরম খুশির পরে একধরনের বিষণ্নতা কাজ করে কখনো কখনো। ইংরেজিতে বলে না, মেলানকলি—কিছুটা সেরকম।

আচ্ছা, বাদ দাও, কাল রাতে তোমায় লেখার সুযোগ পাইনি। তুমি এত বেশি লিখো না। তুমি অনেক বেশি লিখলে আমার চিন্তা হয়—নিজের যত্ন নেওয়ার সময় পাচ্ছ তো ঠিকমতো? এই বয়সটা একটু জটিল; মানসিক প্রশান্তি প্রয়োজন—উত্তেজনা বা অতিরিক্ত কাজের চাপ কোনোটাই ভালো না।

এই, ভেবো না আবার জ্ঞান দিচ্ছি। আমি শুধু সহজভাবে গল্প করার চেষ্টা করছি।

বারো।

শিরোনামটা মনে নেই, তোমার একটা লেখা আছে—"এতটা দিলে ভালোবেসে? তুমি এলে এই ঘরে আর আলো জ্বালব না, তুমিই জ্বলবে আলো হয়ে..." কার জন্য লিখেছিলে, জানি না; কী ভীষণ প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম তখন! কিছু বলিনি কখন‌ও—সেই এক যুগ আগের কথা। আমরা সবাই ছোটো ছিলাম তখন; তোমার ওই সময়কার কিছু মানুষের নাম আমার এখনও মনে আছে। একজন ছিল একটু হাস্যরসিক ধরনের চরিত্র।

অনেক কাজ রে... একটু আসছি।

ও আচ্ছা, যা বলছিলাম—ওই লেখায় একটা লাইন ছিল: "ভালোবাসার প্রবল স্রোতে যদি ভাসিয়ে নিয়ে যাই, পারবে তো সামলাতে..."

সত্যিই, প্রবল স্রোত সামলানো কঠিন।

তেরো।

শুধুই ভালোবাসি—এটুকু বলা ছাড়া আর একফোঁটাও শক্তি নেই কিছু বলার। আমি আর নিজেকে কত সংজ্ঞায়িত করব? এই যে আমি একটা মানুষ—এলোমেলো, বিধ্বস্ত, বিস্রস্ত, মুমূর্ষু—আমাকে ভালোবাসা যায় না, প্রিয়?

তুমিই পারো আমাকে সুখে ভাসাতে, দুঃখে কাঁদাতে। যা ইচ্ছে করো, প্রিয়; আমি কাঁদতে অভ্যস্ত। আমাকে ভালোবাসার দায় পৃথিবীর কারও নেই—আমিও আবার একটা মানুষ! তোমার সব ভালোবাসা তোলা থাক তোমার সেই 'তুমি'টার জন্য। আমি তো একটা পথের ধুলো; যেটুকু দিয়েছ, এটুকুই পরম পাওয়া।

ভেবেছিলাম, কোনো দেবদূত এসে আমায় মুক্ত করবে আমার যন্ত্রণা থেকে। আমি একটু চুপ করে থাকলে আমায় ভুল বুঝতে শুরু করো। আমি চিরতরে চুপ হয়ে যাব, প্রিয়; তুমি আমায় ছুড়ে ফেলে দাও ভুল বুঝে। আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না।

চৌদ্দ।

আজকের রাতটা আমার ঘুমের জন্য নয়। আজকের রাতটা শুধু পার করার জন্য, সহ্য করার জন্য। শূন্য চোখে কোথাও তাকিয়ে থাকার জন্য, ঘড়ির অবিরাম টিকটিক আওয়াজে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য। আর আপন মানুষটার জন্য প্রার্থনা করার জন্য—যে দূরে থাকে বলে জীবনটা এলোমেলো। যাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করলেও সাধ্যের বাইরে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *