গীতায় অবতারতত্ত্ব: ৪



স্বামী বিবেকানন্দ এই অর্থেই বলেছেন—“He who works without selfishness is already free।” কর্মের মধ্যেই মুক্তি আছে, যদি কর্ম অহংকারমুক্ত হয়। রমণ মহর্ষি বলেন, “যখন কর্তার ধারণা লুপ্ত হয়, তখনও কর্ম ঘটে, কিন্তু তখন তা ঈশ্বরের লীলা মাত্র।”

দ্বিতীয় শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেন, মন দ্বারা সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করো এবং বুদ্ধিযোগের আশ্রয় নিয়ে সর্বদা আমার চিন্তায় নিবিষ্ট থাকো। শঙ্করাচার্যের ভাষ্যে “সংনস্য” মানে বাহ্যকর্ম ত্যাগ নয়, বরং কর্তার অহংকারবোধের ত্যাগ। তিনি বলেন, “যিনি কর্মে নিযুক্ত থেকেও নিজের কর্তা-ভাব ত্যাগ করেছেন, তিনিই প্রকৃত সংন্যাসী।” ‘বুদ্ধিযোগ’ মানে সেই জ্ঞানযোগ, যা বোঝে যে, সমস্ত কর্মই প্রকৃতপক্ষে মায়ার অন্তর্গত, আর আত্মা সেই কর্মের নিঃসঙ্গ সাক্ষী। অদ্বৈত দৃষ্টিতে এই ‘বুদ্ধিযোগ’-ই কর্ম ও জ্ঞানের মধ্যে মায়ার রেখা মুছে দেয়। যখন চেতনা উপলব্ধি করে যে, সমস্ত কর্ম ঈশ্বররূপ, তখন কর্মই হয়ে ওঠে উপাসনা, আর জ্ঞান হয়ে যায় প্রেম।

শ্রী অরবিন্দ এই শ্লোক ব্যাখ্যা করতে বলেন, বুদ্ধিযোগ মানে চেতনার রূপান্তর—যেখানে জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের বিভাজন বিলুপ্ত হয়। কর্মকে ঈশ্বরে সমর্পণ করা মানে কর্মের মধ্যেই ঈশ্বরকে দেখা। এই অবস্থাই “মচ্চিত্তঃ সততং ভব”—অর্থাৎ, মন যখন ক্রমাগত চেতনার স্বরূপে স্থিত থাকে, তখন কর্ম আর বাহ্য নয়; তা অন্তর্লীন সাধনা হয়ে ওঠে।

আধুনিক দার্শনিক আলান ওয়াটস বলেন, এটি এমন এক letting go of control—যেখানে মানুষ জীবনের প্রবাহে ঈশ্বররূপে অংশগ্রহণ করে। “Let the universe happen through you, not by you”—এই উক্তি গীতার “ময়ি সংনস্য” শব্দের মর্ম অনুবাদ করে। কর্ম তখন আর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা নয়, চেতনার স্বাভাবিক নৃত্য।

তৃতীয় শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অহঙ্কার ও আত্মসমর্পণের মধ্যে চূড়ান্ত পার্থক্য প্রকাশ করেছেন। “মচ্চিত্ত” মানে চিত্ত সম্পূর্ণ ঈশ্বরে নিবিষ্ট, আর “অহঙ্কার” মানে চিত্ত নিজের শরীর ও মনকে আত্মা বলে ভুল করে। শঙ্কর বলেন—“অহঙ্কারঃ দেহাদি আত্মবুদ্ধিরূপঃ”—অর্থাৎ, যে দেহকে নিজের সত্তা মনে করে, সে বিভ্রমেই পতিত। যখন চেতনা ঈশ্বরে স্থিত হয়, তখন সমস্ত “দুর্গ”—অর্থাৎ মায়ার প্রতিবন্ধকতা—অতিক্রম করা যায়। কিন্তু যদি অহঙ্কারবশে আত্মস্বরূপ-বোধ উপেক্ষা করো, তবে পতন অনিবার্য, কারণ তখন ব্যক্তি নিজের প্রকৃত রূপ ভুলে যায়। এই পতন আসলে আত্মবিস্মৃতি, আর মুক্তি মানে আত্মস্মৃতি।

শ্রীকৃষ্ণের “মৎপ্রসাদাত্ তরিষ্যসি”—এই বাক্যটি অদ্বৈত দৃষ্টিতে নিজের ব্রহ্মস্বরূপের জাগরণকে নির্দেশ করে। রমণ মহর্ষি বলেন, “যদি তুমি নিজের সত্য স্বরূপে স্থিত হও, তবে সমস্ত দুঃখের স্রোত অতিক্রম করবে; কিন্তু যদি ‘আমি দেহ’ বলে মনে করো, তবে ডুবে যাবে।” জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি বলেন, “The ego resists the flow of intelligence”—অহঙ্কার বুদ্ধির স্বচ্ছ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। গীতা সেই বাধা ভাঙার নির্দেশ দেয়: মচ্চিত্ত হও, অর্থাৎ বুদ্ধিকে ঈশ্বরচেতনার সঙ্গে একীভূত কর, যাতে অস্তিত্বের প্রজ্ঞা অবরুদ্ধ না হয়।

এই তিনটি শ্লোকের সমন্বিত ব্যাখ্যায় দেখা যায়, গীতা এখানে কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তিকে একত্রে সংহত করছে। কর্ম করো, কিন্তু কর্মে আসক্ত হয়ো না; সমর্পণ করো, কিন্তু সমর্পণের কর্তা হয়ো না; বুদ্ধি দিয়ে বোঝো, কিন্তু বুদ্ধির গর্ব রেখো না। যখন চেতনা ঈশ্বররূপে একীভূত হয়, তখন মানুষ লাভ করে “শাশ্বতং পদমব্যয়ম্”—অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপে স্থিতি। তখন কর্ম আর বদ্ধতার কারণ নয়, মুক্তিরই সোপান। কর্তা ও কর্মের ভেদ মুছে যায়; ভক্ত ও ভগবানের দূরত্ব বিলীন হয়।

এভাবেই গীতার এই তিনটি শ্লোক অদ্বৈত দর্শনের গভীরতম সত্যকে ধারণ করে—যেখানে জীবনই সাধনা, কর্মই ধ্যান, আর আত্মাই ঈশ্বর। যখন চেতনা নিজেকে ব্রহ্মরূপে চিনে ফেলে, তখন “সর্বকর্মাণ্যপি সদা কুর্বাণো মদ্ ব্যপাশ্রয়ঃ”—এই বাক্যটি আর কোনো ধর্মীয় নির্দেশ নয়; এটি হয়ে ওঠে অস্তিত্বের সহজ স্বরূপ।

তখন কর্মের মধ্যে জ্ঞান, জ্ঞানের মধ্যে প্রেম, আর প্রেমের মধ্যে মুক্তি—সব মিলেমিশে যায় এক অনন্ত চেতনার সাগরে, যেখানে আর কোনো ভেদ থাকে না, কেবলই অনন্ত ঐক্যের স্বাদ—“মদ্‌গতচিত্তঃ, মদ্‌ভক্তঃ, মদ্‌পরায়ণঃ”—আমি ও ঈশ্বর এক; আমার প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি শ্বাসই তাঁরই লীলা।

উল্লেখ্য, এখানে ‘প্রসাদ’ (অনুগ্রহ) শব্দটি কেবল করুণার ইঙ্গিত নয়; এটি ঈশ্বরচেতনার সঙ্গে ঐক্যের সূক্ষ্ম অভ্যন্তরীণ অনুগ্রহ। সাধক যতই কঠোর পুরুষার্থ করুক না কেন—জিতেন্দ্রিয়তা, পরিশ্রম, অধ্যবসায়, যোগ্যতা—এসব কিছুই পরমাত্মপ্রাপ্তির নির্ণায়ক কারণ নয়, বরং ঈশ্বরের অনুগ্রহ প্রকাশের নিমিত্তমাত্র।

অদ্বৈত বেদান্ত এই সত্যকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছে। শঙ্করাচার্য বলেন—“নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাবঃ”—পরমাত্মা চিরশুদ্ধ, চিরবুদ্ধ, চিরমুক্ত; তাঁকে কোথাও থেকে ‘লাভ’ করতে হয় না, কারণ তিনি সর্বদা প্রাপ্ত। সমস্যা একটাই—অহংকার। সাধক যখন ভাবে, “আমি সাধনা করছি, আমার শক্তিতেই সিদ্ধি আসবে,” তখন সেই ‘আমি’-ভাবই তাঁকে পরমচেতনার অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত করে। যেমন সূর্য সর্বদা জ্বলছে, কিন্তু মেঘ আচ্ছাদনের জন্য দেখা যায় না; তেমনি পরমাত্মাও সর্বদা বর্তমান, কিন্তু ‘আমি কর্তা’ এই মেঘই তাঁকে আড়াল করে।

কঠোপনিষদের এই শ্লোক—“নায়মাত্মা বুদ্ধ্য ন লভ্যো ন বহুনা শ্রুতেন। যমেবৈষ বৃত্তে তেন লভ্যঃ তস্যৈষ আত্মা বিবৃণুতে তনুং স্বাম্‌।” (২.২৩)—আত্মপ্রাপ্তির এক গূঢ়, পরমার্থিক সত্য প্রকাশ করে। এটি বলে যে, আত্মা কোনো ‘বাহ্যপ্রয়াস, বুদ্ধিগত বিশ্লেষণ বা শাস্ত্রপাঠের বহুলতা’ দ্বারা লাভ হয় না, বরং আত্মা স্বয়ং সেই যোগ্য অন্তঃচেতনার মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেন।

শংকরাচার্য এই শ্লোকের উপর তাঁর ভাষ্যে স্পষ্ট করে বলেছেন—“আত্মা ন তর্কণেন, ন বুদ্ধিবলাত্‌ লভ্যঃ, কারণ তর্ক সীমিত ও অবিদ্যার অধীন।” অর্থাৎ, যে-মন অবিদ্যার দ্বারা সীমাবদ্ধ, সে আত্মাকে বুঝতে পারে না, কারণ বুদ্ধি নিজেই সেই মায়ার অন্তর্গত, যার আচ্ছাদনে আত্মা ঢাকা পড়ে আছে। তাই আত্মা কখনও কোনো চিন্তন-প্রক্রিয়ার ‘বিষয়’ হতে পারে না; আত্মা চেতনার স্বরূপ, যা সব চিন্তার ভিত্তি।

এইজন্যই শংকর বলেন—“আত্মা প্রাকাশকঃ, ন তু প্রাকাশ্যঃ”—আত্মা আলোকদাতা, নিজে আলোকিত নয়। সূর্যের আলো যেমন চোখ দিয়ে দেখা যায় না, তেমনি আত্মাও বুদ্ধি দিয়ে ধরা যায় না। আত্মা নিজেই যখন মায়ার আচ্ছাদন থেকে মুক্ত হয়, তখন সে নিজেরই জ্যোতিতে নিজেকে প্রকাশ করে।

এই ভাবকেই মন্ত্রের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে—“যমেবৈষ বৃত্তে তেন লভ্যঃ”—যাঁর চিত্ত পূর্ণ প্রস্তুত (শুদ্ধ অন্তঃকরণ), যিনি নিজের অহং, আসক্তি ও দ্বৈতবোধ ত্যাগ করেছেন, আত্মা নিজে তাঁকে ‘গ্রহণ’ করেন। এখানে “বৃত্তে” মানে ‘যে অভ্যন্তরীণ মনোভাব বা চেতনা-কেন্দ্র’—যদি সেটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়, তবে আত্মা তাতে প্রতিফলিত হন, যেমন পরিষ্কার আয়নায় সূর্য প্রতিফলিত হয়।

“তস্যৈষ আত্মা বিবৃণুতে তনুং স্বাম্‌”—এই অংশে শংকর ব্যাখ্যা করেন, আত্মা নিজেকে প্রকাশ করেন তাঁরই কাছে, যিনি প্রস্তুত—এটি ঈশ্বরকৃপা নয়, বরং আত্মার নিজস্ব স্বরূপ প্রকাশ। আত্মা সর্বদা প্রকাশমান, কিন্তু মনের মলিনতা সেই প্রকাশ ঢেকে রাখে। মলিনতা দূর হলে আত্মা ‘নিজ তনু’ অর্থাৎ নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেন।

আধুনিক নন-ডুয়ালিস্ট দার্শনিকরা এই শ্লোকটিকে অভিজ্ঞতার স্তরে ব্যাখ্যা করেছেন। ড. রাধাকৃষ্ণন বলেন, “The Spirit reveals itself not through logic but through living surrender and purity.” আত্মা কোনো মানসিক অর্জন নয়, বরং অন্তঃসমর্পণের ফসল। শ্রী অরবিন্দ এটিকে চেতনার বিকাশের উচ্চতম স্তর হিসেবে দেখিয়েছেন—যেখানে মানবচেতনা আত্মার সঙ্গে ঐক্যলাভ করে এবং আত্মা নিজের ‘রূপ’ প্রকাশ করে চেতনার মধ্যেই।

রমন মহর্ষি এই শ্লোকের সারবস্তুটিকে আত্ম-অনুসন্ধানের ভাষায় বলেছেন: আত্মাকে তুমি খুঁজে পাবে না চিন্তায়, কারণ চিন্তা নিজেই আত্মার ওপর নির্ভর। আত্মা তখনই প্রকাশিত হয়, যখন চিন্তার উৎসে তুমি নিজেই লীন হয়ে যাও। তাঁর কথায়—“It is not you who reach the Self; when your seeking ends, the Self reveals itself as that which always was.”

নিসর্গদত্ত মহারাজ এই মন্ত্রের অর্থে বলেন—“Understanding is not knowledge, it is being.” আত্মা লাভ করা মানে কিছু বোঝা নয়, বরং নিজের চেতনার আসল অবস্থায় ফিরে আসা।

এই উপনিষদবাণী এক চিরন্তন সত্য ঘোষণা করে: আত্মা কোনো বস্তুর মতো প্রাপ্তব্য নয়, কারণ তিনি ইতিমধ্যেই সর্বত্র, সর্বকালে প্রকাশিত। বুদ্ধি, তর্ক, শাস্ত্র—সবই কেবল আয়না পরিষ্কার করার উপায়; কিন্তু প্রতিফলন আসে তখনই, যখন সেই আয়না নিঃমল হয়। তাই আত্মাপ্রাপ্তির অর্থ অর্জন নয়, বরং অবিদ্যার অপসারণ; এবং যাঁর অন্তঃচেতনা প্রস্তুত, আত্মা স্বয়ং তাঁর মধ্যে জেগে ওঠেন—যমেবৈষ বৃত্তে তেন লভ্যঃ।

এই শিক্ষার সঙ্গে গীতার “নিমিত্তমাত্রং ভব” (১১.৩৩)-এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাধক নিজের সাধনায় পূর্ণতর হোক, কিন্তু যেন কখনোই মনে না করে—“আমি করছি”—বরং বোঝে, ঈশ্বর আমার মধ্য দিয়েই করাচ্ছেন। গীতা (৩.২৭)-এ কৃষ্ণ তাই বলেন—“প্রকৃতির গুণই সমস্ত কর্ম করছে, কিন্তু অহংকারে মূঢ় মানুষ ভাবে, আমি কর্তা।”

পরমাত্মপ্রাপ্তির জন্য সাধকের কর্ম, সাধনা, উপাসনা সবই প্রয়োজনীয়—কারণ ঈশ্বর সেই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই নিজেকে প্রকাশ করেন। কিন্তু সেই সাধনা সফল হয় কেবল তখনই, যখন প্রচেষ্টার সঙ্গে অহংকার মিশে থাকে না। যে-সাধক ভাবে, “আমার জ্ঞানেই অর্জন,” সে জ্ঞানের বন্ধনে আবদ্ধ হয়; আর যে ভাবে, “আমি কেবল নিমিত্ত,” তার জ্ঞানই মুক্তি দেয়।

এই অবস্থাই গীতার পরম সমতা—কর্ম করো, কিন্তু কর্তার অহংকার রেখো না; প্রচেষ্টা করো, কিন্তু মনে রেখো, ফল ঈশ্বরের। এই অহংকারবর্জিত পুরুষার্থই আসল যোগ। কারণ পরমাত্মা কখনও ‘নতুন করে’ লাভ হয় না; তিনি সর্বদা নিত্যপ্রাপ্ত—শুধু অহংবোধের পর্দা সরলেই তাঁর স্বরূপ প্রকাশিত হয়।

‘নিমিত্তমাত্র’ হওয়া মানে তাই নিষ্ক্রিয় থাকা নয়; বরং সম্পূর্ণ সজাগ, নিবেদিত, এবং অনাসক্ত থাকা। সাধক যদি এই অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, তবে তৎক্ষণাৎ তার হৃদয়ে জাগে সেই চিরন্তন উপলব্ধি—“আমি নই কর্তা, তিনিই আমার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছেন।” আর এই অবস্থাই গীতার ভাষায় পরম মুক্তি, সেই “শাশ্বতং পদমব্যয়ম্‌”—চিরস্থায়ী, অবিনাশী অবস্থায় প্রবেশ।

এই অংশটি গীতার কর্মযোগের হৃদয়স্থলে পৌঁছে দেয়, যেখানে ‘অহংকার’ ও ‘অকর্তৃত্ব’—এই দুই বিপরীত মনোভাবের মধ্য দিয়ে জীবনের আধ্যাত্মিক গতি নির্ধারিত হয়। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বার বার বলেছেন, কর্মের আসল বন্ধন নিহিত কর্মে নয়, বরং কর্মের সঙ্গে যুক্ত অহংকার ও ফলেচ্ছায়। মানুষ যখন ভাবে—“আমি করলে তবে হবে, আমি না করলে কিছুই হবে না”—তখনই সে নিজেকে ঈশ্বরের স্থান দখল করতে চায়। অথচ এই ‘আমি’-ভাবটাই অজ্ঞতার মূল।

কর্মে অহংকারের মূল কারণ—অবিদ্যা বা আত্মভ্রান্তি। যখন মানুষ নিজেকে চেতনার কেন্দ্র না ভেবে ক্রিয়ার কর্তা ভাবে, তখন সে বন্ধনের মধ্যে প্রবেশ করে। কিন্তু যখন সে বোঝে যে, সে কেবল ঈশ্বরের ইচ্ছার যন্ত্র, তখন কর্ম আর তাকে বেঁধে রাখে না।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে, এই ‘কর্তৃত্ববোধ’ আসলে অভিমানরূপ অবিদ্যা—চেতনার উপর অকারণভাবে আরোপিত এক মায়া। বৃহদারণ্যক উপনিষদের (৪.৪.৫) এই উক্তি—“এইষ ত আতমা সর্বানন্তরঃ।” অর্থাৎ, “এই আত্মাই তোমার অন্তঃস্থিত নিয়ন্তা”—একটি মৌল দর্শনপ্রতিষ্ঠা করে: কর্তা হিসেবে আমরা যাকে ভাবি, সে প্রকৃত কর্তা নয়; প্রকৃত কর্তা হল আত্মা—সর্বব্যাপী, অনাদি, নিঃস্পৃহ চেতনা।