নাগার্জুনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান দ্বি-সত্য তত্ত্ব (two truths)। তিনি বলেন: সত্য দুটি স্তরে দেখা যায়। সংবৃতিসত্য (saṃvṛtisatya, ব্যাবহারিক সত্য)—দৈনন্দিন জীবনে জগৎ 'আছে' বলে মনে হয় এবং সেই 'আছে' ব্যাবহারিকভাবে কাজ চালানোর জন্য যথেষ্ট; আমরা 'রথ' বলি, 'ব্যক্তি' বলি, 'আমি' বলি—এগুলো কাজ চালায়, যদিও চূড়ান্ত বিশ্লেষণে টেকে না। এবং পরমার্থসত্য (paramārthasatya, চূড়ান্ত সত্য)—গভীরে তাকালে সব কিছুই শূন্য, কোনো কিছুরই নিজস্ব সত্তা নেই। এই দুটি সত্যের কোনোটিকে বাদ দিলে বুদ্ধের শিক্ষা বোঝা যায় না—শুধু ব্যাবহারিক সত্য ধরলে আত্মবাদে আটকে যাই, শুধু চূড়ান্ত সত্য ধরলে শূন্যবাদে পড়ি। এই মধ্যম পথ বৌদ্ধ মূলনীতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকে: শূন্যতা জগতের উৎস নয় (যেমন ব্রহ্ম জগতের উৎস), শূন্যতা কেবল সমস্ত ধারণা ও সত্তার অনির্বচনীয় অতলতা—যার সাথে জগতের কোনো জন্মগত বা সৃষ্টিমূলক সম্পর্ক নেই।
অসঙ্গ ও বসুবন্ধু: যোগাচার ও আলয়বিজ্ঞান
অসঙ্গ ও বসুবন্ধু (আনু. চতুর্থ শতক)—দুই ভাই, যাঁরা বৌদ্ধ দর্শনের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাযান সম্প্রদায় গড়ে তুলেছেন—তাঁদের 'বিজ্ঞপ্তিমাত্র' (Vijñaptimātra) মতবাদে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। 'বিজ্ঞপ্তিমাত্র' মানে 'কেবল চেতনা' (Consciousness Only)—অর্থাৎ, আমরা যা-কিছু দেখি, শুনি, অনুভব করি, সবই চেতনার নিজস্ব প্রক্ষেপণ; চেতনার বাইরে কোনো স্বতন্ত্র বাস্তবতা নেই। এই মতবাদে তাঁরা বৌদ্ধ মূলনীতি থেকে কিছুটা সরে এসেছেন—কারণ তাঁরা স্বীকার করেছেন যে, সমস্ত দৃশ্যমান বাস্তবতার মূলে একটি ইতিবাচক সত্তা রয়েছে। যোগাচার সম্প্রদায়ের কাছে সেই সর্বোচ্চ বাস্তবতা হলো আলয়বিজ্ঞান (ālayavijñāna)—আক্ষরিক অর্থে 'গুদাম-চেতনা' বা 'বীজভাণ্ডার-চেতনা'। এটি সমস্ত অভিজ্ঞতার বীজ ধারণ করে—যেমন একটি গুদামে অগণিত বীজ সঞ্চিত থাকে এবং উপযুক্ত শর্ত পেলে অঙ্কুরিত হয়, তেমনি আলয়বিজ্ঞানে সমস্ত কর্মের বীজ জমা থাকে এবং উপযুক্ত শর্তে ফল দেয়। এই ধারণা বেদান্তের ব্রহ্মের অনেক কাছাকাছি এসে পড়ে।
তবে পুরোনো বেদান্তের স্রোতে মিশে গিয়ে তাঁরা বলেননি যে, এই সত্তা জগতের সাথে অভিন্ন—সম্পর্কটিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে 'ভিন্নও নয়, অভিন্নও নয়' হিসেবে—একটি সতর্ক, সীমান্তবর্তী অবস্থান। পূর্ব এশিয়ার পরবর্তী বৌদ্ধ মতবাদে (বিশেষত দাশেং কিসিন লুন বা 'মহাযানে বিশ্বাসের জাগরণ' গ্রন্থে, যার রচনাকাল ও রচয়িতা নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু প্রভাব অপরিসীম) এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে—অখণ্ড পরম চেতনাকে বহুবিচিত্র জগতের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই 'একমন' (one mind)-এর দুটি দিক: পরম দিক (তথাগতগর্ভ—যা বিশুদ্ধ, অপরিবর্তনীয়) এবং প্রপঞ্চিক দিক (আলয়বিজ্ঞান—যা বিভ্রান্ত, পরিবর্তনশীল)। তবে কখনও বলা হয়নি যে, জগৎ সেই পরম সত্তার 'বিকাশ' বা 'প্রকাশ' (যেমন বেদান্তে ব্রহ্ম থেকে জগতের উদ্ভব); বরং জগতের দুঃখ ও কামনাকে জাগতিক বিভ্রমে প্রত্যানয়ন করা হয়েছে—অর্থাৎ জগৎ পরম সত্তার সৃষ্টি নয়, পরম সত্তার ভুল বোঝা।
তথাগতগর্ভ: সবচেয়ে বিতর্কিত সেতু
মহাযান বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে বিতর্কিত ধারণা হলো তথাগতগর্ভ (tathāgatagarbha)। 'তথাগত' মানে বুদ্ধ (যিনি 'এভাবে গেছেন' বা 'এভাবে এসেছেন'—পালি/সংস্কৃত শব্দটি দু-ভাবেই ভাঙা যায়)। 'গর্ভ' শব্দটি বহু অর্থ বহন করে—গর্ভ, সার, ভ্রূণ, বীজ, ভাণ্ডার। তাই তথাগতগর্ভ মানে হতে পারে 'বুদ্ধের গর্ভ' (যার মধ্যে বুদ্ধত্ব লুকিয়ে আছে) বা 'বুদ্ধ-প্রকৃতি' (প্রতিটি প্রাণীর অন্তর্নিহিত বুদ্ধত্ব) বা 'বুদ্ধত্বের বীজ'।
তৃতীয় শতকের তথাগতগর্ভ সূত্রে এবং শ্রীমালাদেবী সিংহনাদ সূত্রে ঘোষণা করা হয়েছে: সমস্ত প্রাণীর মধ্যে বুদ্ধত্বের বীজ সুপ্ত অবস্থায় আছে—ক্লেশের (মানসিক অপবিত্রতার—রাগ, দ্বেষ, মোহ ইত্যাদির) আবরণে ঢাকা। সূত্রগুলো নয়টি উপমা দিয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত দুটি: যেমন ময়লা কাপড়ে ঢাকা স্বর্ণমূর্তি—মূর্তি সোনারই, শুধু ময়লা সরাতে হবে; যেমন কলির আবরণে ঢাকা পদ্মফুল—ফুল ভেতরে প্রস্তুতই আছে, শুধু আবরণ ভেঙে বেরোতে হবে। পঞ্চম শতকের রত্নগোত্রবিভাগ (Ratnagotravibhāga, সম্ভবত মৈত্রেয়নাথ বা সারমতি রচিত) এই তত্ত্বকে সুসংহত করেছে—তথাগতগর্ভ হলো 'সমলা তথতা' (samalā tathatā)—অর্থাৎ মলিন-সমেত যথার্থতা: সত্য আছে, কিন্তু ময়লায় ঢাকা; আর বুদ্ধত্ব বা ধর্মকায় হলো 'নির্মলা তথতা' (nirmalā tathatā)—নির্মল যথার্থতা: সেই একই সত্য, ময়লা সরে যাবার পর। একই জিনিস, শুধু মলিনতার তফাত।
এই ধারণাটি বেদান্তিক আত্মন ও ব্রহ্মের সাথে বিস্ময়কর সাদৃশ্য বহন করে—এতটাই যে, সাদৃশ্যগুলো প্রায় এক-এক করে মিলিয়ে দেওয়া যায়: বুদ্ধ-বীজ যেন জীবাত্মা (ব্যক্তির ভেতরের সুপ্ত সত্তা), বুদ্ধ-প্রকৃতি যেন ব্রহ্ম (সর্বজনীন পরম সত্তা), ক্লেশের আবরণ যেন অবিদ্যা বা মায়া (যা সত্যকে ঢেকে রাখে)। তাকাসাকি জিকিদো (জাপানি পণ্ডিত, তথাগতগর্ভের ওপর সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণা তাঁরই), ওবারমিলার, লামোত ও ফ্রাউভালনারের মতো পণ্ডিতেরা এতে একত্ববাদের প্রবণতা দেখেছেন। জাপানি পণ্ডিত মাৎসুমোতো শিরো আরও কঠোর—তিনি এই মতবাদকে সরাসরি 'অ-বৌদ্ধ' (dhātu-vāda, অর্থাৎ একটি স্থায়ী 'ধাতু' বা মূলতত্ত্বে বিশ্বাস, যা বৌদ্ধ অনাত্মার বিরোধী) বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তাঁর 'সমালোচনামূলক বৌদ্ধধর্ম' (Critical Buddhism, hihan bukkyō) আন্দোলন এই সমালোচনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে—১৯৯০-এর দশকে যা জাপানি বৌদ্ধ পণ্ডিত-মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
তবে লঙ্কাবতার সূত্রে—যে-গ্রন্থটি চান/জেন ঐতিহ্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় এবং যা বোধিধর্মের সাথে সংযুক্ত—বুদ্ধ নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন: 'তথাগতগর্ভ আত্মা নয়'—এটি কেবল উপায় (upāya)। 'উপায়' মানে 'দক্ষ কৌশল'—বৌদ্ধ দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় ধারণা, যেখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীর অবস্থান বুঝে তার উপযোগী ভাষায় কথা বলেন, পরম সত্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা শ্রোতার পক্ষে গ্রহণযোগ্য। যারা আত্মবাদে অভ্যস্ত—অর্থাৎ যারা সারাজীবন 'আত্মা আছে' বলে ভেবে এসেছে—তাদের বৌদ্ধপথে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের পরিচিত ভাষায় কথা বলা। ঠিক যেমন একজন ডাক্তার শিশুকে তেতো ওষুধ খাওয়াতে মিষ্টি মিশিয়ে দেন—ওষুধটাই আসল, মিষ্টি শুধু কৌশল। তথাগতগর্ভের 'আত্মা-সদৃশ' ভাষাও তেমনি—অনাত্মা শিক্ষাই আসল, আত্মবাদী ভাষা শুধু সেতু।
এই দ্বৈত ব্যাখ্যা—তথাগতগর্ভ একই সাথে বেদান্তের সবচেয়ে কাছের ও সবচেয়ে দূরের বৌদ্ধ ধারণা—দুই দর্শনের সম্পর্কের জটিলতাকে তীব্রভাবে প্রকাশ করে। কাছের, কারণ ভাষা প্রায় অভিন্ন; দূরের, কারণ সেই ভাষার পেছনে দাঁড়ানো দর্শন সম্পূর্ণ বিপরীত।
বেদান্তের ওপর বৌদ্ধ প্রভাব
প্রভাব শুধু এক দিক থেকে আসেনি—বৌদ্ধধর্মও বেদান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। গৌড়পাদ (আনু. সপ্তম শতক)—শঙ্করের পরমগুরু (গুরুর গুরু)—তাঁর মাণ্ডূক্যকারিকায় এমন একটি দর্শন শেখান, যাঁকে পণ্ডিতেরা বলেন 'ভ্রমবাদী অবিশ্ববাদ' (illusionistic acosmism)। সহজ ভাষায়: ব্রহ্ম প্রকৃতপক্ষে জগতে পরিণত হননি—জগৎটাই অবাস্তব, স্বপ্নের মতো। ব্রহ্ম 'নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাব'—শাশ্বতভাবে বিশুদ্ধ, জাগ্রত ও মুক্ত। জগৎ তাঁর অপরিবর্তনীয় পটভূমি—ঠিক যেমন সাদা পর্দায় ছায়ানাটকের পরিবর্তনশীল চিত্র; পর্দা বদলায় না, শুধু ছায়া বদলায়। গৌড়পাদের এই 'জগৎ অবাস্তব' ধারণাটি বৌদ্ধ মধ্যমকের 'জগৎ স্বভাবশূন্য' ধারণার সাথে এতটাই মিল যে, পণ্ডিতেরা ওতে সরাসরি বৌদ্ধ প্রভাব চিহ্নিত করেছেন—গৌড়পাদ নিজেই তাঁর কারিকায় বৌদ্ধ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন (যেমন 'অস্পর্শযোগ', যা মধ্যমক শব্দভাণ্ডারের অংশ)।
শঙ্কর (আনু. অষ্টম শতক) তাঁর ব্রহ্মসূত্রভাষ্যে বৌদ্ধ দর্শনকে সরাসরি খণ্ডন করেছেন—বৌদ্ধদের যুক্তি ধরে ধরে ভুল দেখিয়েছেন, বিশেষত যোগাচার ও সর্বাস্তিবাদ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাঁর নিজের অদ্বৈতবাদে বৌদ্ধ যোগাচার ও মধ্যমকের প্রভাব এতটাই গভীর যে, পরবর্তী বৈষ্ণব ভাষ্যকাররা—বিশেষত রামানুজ (বিশিষ্টাদ্বৈত) ও মধ্ব (দ্বৈত)—তাঁকে 'প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ' (pracchanna bauddha) অর্থাৎ 'ছদ্মবেশী বৌদ্ধ' বলে সমালোচনা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ: শঙ্কর জগৎকে 'মায়া' বলে যা শেখান, সেটি আসলে হিন্দুত্বের মোড়কে বৌদ্ধ শূন্যতারই পুনরাবৃত্তি।
খ্রিস্টীয় যুগ থেকে এই পারস্পরিক প্রভাব গভীর হয়েছে—দুই দর্শন একে অপরের ভাষা ধার করেছে, একে অপরের যুক্তি-কাঠামো শুষে নিয়েছে, একে অপরকে খণ্ডন করতে গিয়ে একে অপরের কাছাকাছি এসে পড়েছে। কিন্তু এই রঙের বিনিময় মূল প্রকৃতি বদলায়নি।যেমন দুটি নদী সমান্তরাল প্রবাহে অগ্রসর হতে হতে কোনো সংযোগচ্যানেলে সাময়িকভাবে যুক্ত হলেও তাদের উৎস ও পরিণতি পৃথক থাকে, তেমনি বেদান্তের আত্মবাদ এবং বৌদ্ধ অনাত্মবাদও কিছু ধারণাগত স্পর্শবিন্দু সত্ত্বেও সত্তাতত্ত্ব ও মুক্তিতত্ত্বের স্তরে মৌলিকভাবে ভিন্ন। একদিকে আত্মা বা আত্মনের স্থায়ী সত্তার স্বীকৃতি, অন্যদিকে সকল সত্তাধারণার অনিত্যতা ও অনাত্মতা—এই দুই অবস্থানকে নিছক ভাষাগত পার্থক্য বলে মীমাংসা করা দার্শনিকভাবে টেকসই নয়।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: গ্লাজেনাপের আটটি সুসংহত যুক্তি
এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা দুটি দর্শনের সাধারণ পরিচয় দিয়েছি, তাদের মিল ও অমিল দেখিয়েছি, মুক্তির দুটি বিপরীত ধারণা ব্যাখ্যা করেছি এবং পারস্পরিক প্রভাবের জটিল ইতিহাস আলোচনা করেছি। ভারতীয় ধর্ম ও দর্শন নিয়ে কাজ করা জার্মান পণ্ডিত গ্লাজেনাপ এখন তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি বের করেন—আটটি সুনির্দিষ্ট যুক্তি, যা দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চান যে, প্রাচীন বৌদ্ধধর্ম ও বেদান্ত কেবল 'ভিন্ন' নয়, মৌলিকভাবে বিপরীত। এই আটটি যুক্তি একে একে দেখা যাক।
(১) পালি গ্রন্থে উপনিষদিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতা
গ্লাজেনাপের প্রথম যুক্তি ঐতিহাসিক। পাঁচটি প্রাচীন গদ্য উপনিষদ—বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয় ও কৌষীতকি—বুদ্ধের আগেকার রচনা, এটি প্রায় সব পণ্ডিতই মানেন। মৈত্রায়ণীয় উপনিষদ থেকে শুরু করে পরবর্তীগুলো বৌদ্ধধর্মের পরে রচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো: বুদ্ধ কি এই প্রাক্-বৌদ্ধ উপনিষদগুলোর শিক্ষা জানতেন এবং সচেতনভাবে তার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন?
গ্লাজেনাপ দেখাচ্ছেন: পালি ক্যাননে—অর্থাৎ বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রামাণিক গ্রন্থসমূহে—উপনিষদিক মতবাদের প্রত্যক্ষ আলোচনা আশ্চর্যজনকভাবে কম। হ্যাঁ, কর্ম, পুনর্জন্ম, জ্ঞানের মাধ্যমে মুক্তি—এই ধারণাগুলো পালি গ্রন্থে আছে, কিন্তু এগুলো উপনিষদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। বুদ্ধের সময়ে গাঙ্গেয় উপত্যকায় এই ধারণাগুলো ছিল সর্বব্যাপী—জৈন, আজীবিক, পরিব্রাজক সবার মধ্যেই ছড়িয়ে ছিল। এগুলো তৎকালীন 'দার্শনিক আবহাওয়া'র অংশ, কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উদ্ভাবন নয়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়: আত্মন ও ব্রহ্মান—উপনিষদের দুটি কেন্দ্রীয় ধারণা—পালি গ্রন্থে কোথাও 'জগতের আদিভিত্তি, পরম সত্তা' অর্থে ইতিবাচকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। কোথাও বুদ্ধ বলেননি: 'হ্যাঁ, একটি পরম আত্মা আছে এবং সেটিই চূড়ান্ত সত্য।' বরং যেখানেই এই ধারণা উল্লিখিত হয়েছে, সেখানেই তাকে ভুল দৃষ্টি (মিচ্ছা-দিট্ঠি) হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
গ্লাজেনাপ আরেকটি চমকপ্রদ প্রমাণ দেন: একই অনুপস্থিতি প্রাচীন জৈন সাহিত্যেও দেখা যায়। জৈনরা আত্মায় বিশ্বাস করে, কিন্তু তাদের 'জীব' ধারণা উপনিষদিক 'পরম আত্মন'-এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এর মানে: বুদ্ধ ও মহাবীরের সময়ে পূর্ব ভারতের মগধ অঞ্চলে বেদান্তিক চিন্তাধারা—'সব কিছু এক, ব্রহ্মই একমাত্র সত্য'—বিশেষ প্রভাবশালী ছিল না। বেদান্ত তখনও মূলত পশ্চিম ভারতের কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলের ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ।
আলো ও নৈঃশব্দ্য: ৩
লেখাটি শেয়ার করুন