দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

অরূপের আরতি: ৪



পনেরো।

মানবের কোনো জাতি নেই, যেমন পরমাত্মা, ব্রহ্ম বা ঈশ্বরেরও জাতি নেই। জাতি কেবল কর্মের; কর্মের গুণানুসারে মানুষকে সত্ত্বগুণী, রজোগুণী ও তমোগুণী হিসেবে ভাগ করা হয়। কর্মের মাধ্যমেই গুণের উদ্ভব হয়। মানুষের মধ্যে এমন কর্মশক্তি আছে, যার সঠিক অনুশীলনে সে স্থায়ী জ্ঞান, ভক্তি ও প্রেমের অধিকারী হতে পারে। কেননা মানবদেহই স্বভাবের পূর্ণ দেহ, যে দেহকে কেন্দ্র করেই স্বভাবের পূর্ণ প্রকাশ সম্ভব।

মানবসমাজে তিন প্রকার কর্মী দেখা যায়—

১) তমোগুণী: যারা ক্ষুদ্র বিষয়, যেমন—আহার, বিহার, মৈথুন ইত্যাদি নিয়ে সর্বদা অবশ থাকে।
২) রজোগুণী: যারা মান, সম্মান, অর্থ, ঐশ্বর্য বৃদ্ধি নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
৩) সত্ত্বগুণী: যারা এর ক্ষণস্থায়ী স্বভাব উপলব্ধি করে আত্মবিষয়ে বিভোর থাকে।

প্রকৃতপক্ষে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই এই তিন গুণ বিদ্যমান, তবে যার কর্মপ্রগতি যে-গুণকে আশ্রয় করে, সেই গুণই তার মধ্যে প্রধান হিসেবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই তিন গুণের ঊর্ধ্বে যারা অবস্থান করে, তারাই প্রকৃত সৎ-মানব বা স্বভাব-মানব। এরাই সমগ্র মানবজাতির আদর্শ, এবং এ মানব হবার অধিকার সবারই আছে। যতক্ষণ মানুষ তিন গুণে আবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ সে অন্যের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কিছুই ভাবতে পারে না।

মানুষ যোগসাধনের নাম শুনে ভয় পায়—ভাবতে থাকে, এটি কেবল আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবে সাধন বা যোগ ছাড়া সামান্যতম কাজও সম্পূর্ণ হয় না। কোনো একটি কর্মকে আয়ত্ত করার প্রয়াসই হলো সাধনা, আর কর্মকে পূর্ণ করতে প্রয়োজনীয় উপকরণের যোগসূত্রই হলো যোগ। সুতরাং সাধন ও যোগ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ—এই তিন স্তর নিয়েই আধ্যাত্মিক জগৎ গঠিত। এর যে-কোনো একটি বাদ দিলে আধ্যাত্মিক জগতকে বোঝা যায় না; আবার আধ্যাত্মিক জগতকে বাদ দিয়েও বিষয়জগতকে বোঝা যায় না। এরা পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত—একটিকে বাদ দিয়ে অপরটির পূর্ণতা কখনোই প্রমাণ করা যায় না। অথচ মানুষ দীর্ঘকাল ধরে আধ্যাত্মিক ও বিষয়জগতকে একে অপরের বিরোধী ভেবে এসেছে, কিন্তু কেউই গভীরে গিয়ে এর মর্মার্থ উপলব্ধি করতে চায়নি।

বস্তুত, বিষয়জগত থেকে আধ্যাত্মিক জগতকে পৃথক ভাবা এক ভয়াবহ ভুল ধারণা। বিষয় ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। যেখানে অণু ও পরমাণুর যোগসূত্রেই জীবন, আর সংযোগের অভাবেই মৃত্যু—সেখানে যোগ ছাড়া কোনো কর্ম সম্পূর্ণ হতে পারে না।

মানুষেরা কর্ম, ব্যবহার, আচার-আচরণে একত্রিত হয়েই একটি জাতির রূপ নেয়। কিন্তু মানবের পূর্ণতা যেখানে জাতির পূর্ণতার সাথে জড়িত, সেখানে কর্তব্যবোধ ও চিন্তার গভীরতম স্তরে পৌঁছেই জাতীয় জীবনের পূর্ণতার বিশ্লেষণ করতে হবে। অথচ আজ পর্যন্ত কেউ সেই গভীরতম প্রদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেনি।

ষোলো।

জাতীয় জীবন নিয়ে সর্বত্র সর্বদাই চলছে একধরনের ছিনিমিনি খেলা।

মানুষের কেবল বাহ্যিক প্রয়োজন মেটানোই কি তার জাতীয় জীবনের পূর্ণতার পথে যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে? যদি মানুষ প্রকৃত মনুষ্যত্বই অর্জন করতে না পারে, তবে সে নিজের কর্তব্য কীভাবে স্থির করবে? মানুষ যদি মনুষ্যত্বহীন হয়, তবে সে সমগ্র মানবজাতির অভাবকে নিজের অভাব হিসেবে উপলব্ধি করবে কীভাবে?

আজ পৃথিবীতে এমন একজন নেতাও চোখে পড়ে না, যে সত্যিকার অর্থে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ নিয়ে চিন্তা করছে। সকলেই নিজ নিজ সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ মতবাদী। যে যে-দেশে বাস করে, সে শুধু সেই দেশের মানুষের কথা ভাবে—তা-ও আবার যতটুকু তার নিজের স্বার্থসিদ্ধির সঙ্গে জড়িত। জাতীয় জীবন ও মনুষ্যত্বের গঠনের দিকে কারুরই লক্ষ নেই। রাষ্ট্রের প্রচেষ্টা কেবল মানুষ কীভাবে বাঁচতে পারে ও উপায়ক্ষম হতে পারে, সেই সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ মানুষের দিন দিন মনুষ্যত্বহীন হয়ে আত্মস্বার্থান্বেষী হয়ে পড়ার দিকে কারুরই কোনো দৃষ্টি নেই।

মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব মানবসমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধারদের ওপর বর্তায়। কিন্তু রাষ্ট্র সে দিকে একটুও মনোযোগ দিচ্ছে না। বরং অতীতে যে-সব সনাতন, সুন্দর ও কল্যাণকর গঠনমূলক পথপ্রণালী ছিল, রাষ্ট্রীয় সহায়তার অভাবে সেগুলোও মানুষ ভুলতে বসেছে। অপরদিকে সাধুসমাজ বা আধ্যাত্মিক জগত থেকেও এখনো মানুষের স্থায়ী গঠনমূলক কোনো পথ আবিষ্কৃত হয়নি; তারাও তাই উদাসীন হয়ে পড়েছে।

ফলত, বিষয়জগত ও আধ্যাত্মিক জগতের কর্ণধারগণের অবহেলা এবং পারস্পরিক বিরোধী শিক্ষা, ধর্ম, আদর্শ, সত্য ও ন্যায়ের সংঘাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত ও আহত হয়েছে। তারা কোথাও আর আস্থা রেখে আশ্রয় নিতে পারছে না।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ তার প্রাকৃতিক আদর্শ, স্বাভাবিক ধর্ম এবং স্বাভাবিক জাতীয়তাবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। আর এই কারণেই মানুষ না বিষয়জগতে, না ধর্মজগতে—কোথাও শান্তি পাচ্ছে।

এই পরিস্থিতির সরাসরি ফলস্বরূপ আজ সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি—অসন্তোষ, অসহযোগ, বিশৃঙ্খলা, বিদ্রোহ এবং প্রচলিত রীতি-নীতি ও অনুশাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধ।

সতেরো।

ধর্মজগত ও বিষয়জগতের নেতৃবৃন্দ আজ বিশ্বশান্তি ও বিশ্বমৈত্রীর জন্য ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার করছেন। কিন্তু তাঁরা যে-সকল মত ও পথ নির্দেশ করেছেন, সেগুলো অতীতে ব্যর্থ হয়েছে, সময়ের প্রবাহে বার বার বিফল হয়েছে, আর ভবিষ্যতেও কোনোদিন সেগুলো দ্বারা কাম্য ফল লাভ সম্ভব হবে না।

কারণ, যে-ধর্ম, যে-সমাজ, যে-জাতীয়তাবোধ বিভেদের বীজ থেকে অঙ্কুরিত—তার শিক্ষা কখনোই বিশ্বশান্তি, বিশ্বমৈত্রী, বিশ্বভ্রাতৃত্ব বা সাম্য আনতে পারে না। এটি যেমন অসম্ভব, তেমনি অস্বাভাবিকও।

অন্যদিকে, যে-ভাব, যে-বোধ, যে-আদর্শ, যে-জাতীয়তা ও যে-ধর্ম নিত্যসত্য, সহজ ও সরল—যার অনুধ্যান ও অনুভবমাত্রেই সব সংশয়, সব বিচ্ছিন্নতা দূরীভূত হয়ে যায়—মানবজাতি সেই সত্যের প্রতিই এতকাল অজ্ঞ ও অমনোযোগী থেকে এসেছে।

এটি নিতান্ত সহজ, নিতান্ত সরল, নিত্যসত্য—কারণ এটি স্বাভাবিক। আর এই ভাব, বোধ, আদর্শ ও জাতীয়তা একমাত্র স্বভাব-মানবতায় নিহিত।

আঠারো।

মানবমাত্রই এক জাতি—এ কথা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ এই মৌলিক সত্য, এই স্বতঃসিদ্ধ মানব-জাতীয়তা সম্পর্কেই মানুষ আজ উদাসীন। যে-মহাসত্য নিজেই স্বতঃপ্রমাণিত, আমরা তাকে জেনেও বুঝতে চাই না, জানিয়েও জানতে চাই না।

মানুষের খণ্ড দেশ-জ্ঞাপক জাতীয়তা—যেমন বাঙালিত্ব, ফরাসিত্ব, জার্মানত্ব—এসবের ভেতরেও আসলে মানবত্বই প্রধান। একইভাবে ধর্ম-জ্ঞাপক জাতীয়তা—যেমন হিন্দুত্ব, মুসলমানত্ব, খ্রিস্টানত্ব—সবই মানবত্বকে অবলম্বন করেই গড়ে উঠেছে। মানুষ যদি মানবজন্মই না পেত, তবে সে বাঙালি বা ইংরেজ, মুসলমান বা খ্রিস্টান—কোনো কিছুই হতে পারত না। আদি মানবসমাজে কি হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান ভেদ ছিল? বা এশীয়-ইউরোপীয় বিভাজন? না, এগুলো সবই মানুষের খণ্ড মন ও বিভক্ত ভাবের সৃষ্টি।

মানুষ মানুষকে খণ্ড ধর্ম, খণ্ড জাতীয়তার সংকীর্ণ গণ্ডিতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। অথচ মানবেতর প্রাণীর দৃষ্টিতে মানুষের মধ্যে কোনো ভেদ নেই। যেমন, ব্যাঘ্রের কাছে মানুষ মানুষই—সে ইংরেজ হোক বা রাশিয়ান, ঈশ্বরবাদী হোক বা নাস্তিক—কোনো ভিন্নতা নেই। তেমনি মানব-জাতির কাছেও নিশ্চয়ই দেশ-বাচক ও স্থান-বাচক এই খণ্ড জাতীয়তার কোনো তাৎপর্য নেই।

মানুষ মানবেতর প্রাণীর তুলনায় অধিক বোধ-বুদ্ধি নিয়ে জন্ম নিয়েছে বিভেদ ও অসাম্য সৃষ্টি করার জন্য নয়। অথচ ইতিহাস জুড়ে সে তা-ই করে চলেছে—জ্ঞান-উন্মেষকাল থেকে আজ পর্যন্ত, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে ধ্বংস করেছে অপরের অস্তিত্বকে। শান্তির নামে উদ্ভাবন করেছে স্বজাতি-বিধ্বংসী অস্ত্র, ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে ডেকেছে সংগ্রাম। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, ধর্মও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যদি হতো, তবে আজ বিশ্বের নেতারা শান্তির জন্য হাহাকার করতেন না, ধর্ম-ধর্ম বলে চারদিকে হইচই তুলতেন না।

মানবমাত্রই এক জাতি—যখন এই স্বাভাবিক জাতীয়তাবোধ মানুষের মধ্যে জাগ্রত হবে, তখন মানবসমাজে একতা ও সমতার পূর্ণ প্রতিষ্ঠা কোনো প্রকার আয়াস ছাড়াই সম্ভব হয়ে উঠবে।

উনিশ।

মানবমাত্রই মানবতায় এক। যে-জীবন তাকে স্বতঃসিদ্ধভাবে ধারণ করে আছে, সেই জীবনকে ধারণ করাই তার একমাত্র ধর্ম। আর মানব-জাতীয়তাই তার একমাত্র স্বাভাবিক জাতীয়তা।

এই বোধ, এই চিন্তা, এই ভাব অনুক্ষণ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত থাকতে হবে—যেন সমগ্র মানবজাতিই একে অপরের স্বজন। কারণ, এটাই মানবের কাম্য, ধ্যেয় এবং সাধ্য। আর এই স্বতন্ত্র ও স্বাভাবিক জাতীয়তাবোধের উন্মেষই মানবের পূর্ণতার প্রথম সোপান।

যখন মানুষ প্রচলিত খণ্ড দেশ, কাল ও জাতীয়তার সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে মুক্ত হতে পারবে, তখনই আজকের সীমিত দেশ, জাতীয়তা ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য যে প্রভূত জ্ঞান, বুদ্ধি, শক্তি ও প্রতিভা ব্যয় করছে—সেই শক্তিকে সম্মিলিতভাবে নিয়োগ করতে পারবে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে এবং ব্যক্তি-মানবের আত্মিক উন্নতিতে।

কিন্তু মানুষ তার এই স্বাভাবিক জাতীয়তাবোধ বিস্মৃত হয়ে বিভেদের মোহে আবদ্ধ থেকেছে যুগের পর যুগ। খণ্ড জাতীয়তার গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকে আত্মকলহে নিমগ্ন হয়েছে এবং নিজের শক্তিকে পঙ্গু করে রেখেছে।

তবুও এই স্বাভাবিক জাতীয়তাবোধ মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হবেই—আমরা সচেষ্ট হই বা না হই। বর্তমান বিশ্বের এই বিশৃঙ্খল, বাষ্পাচ্ছন্ন অবস্থা আসলে সেই কাম্য দিনের প্রতিই ইঙ্গিত করছে।

আর মানুষ যেহেতু শ্রেষ্ঠ জীব, সে তার মেধা ও শক্তি নিয়ে নিশ্চেষ্ট থাকতে পারে না। সে অবশ্যই সচেষ্ট হবে—তার স্বাভাবিক মানব-জাতীয়তাবোধের প্রতিষ্ঠাকে ত্বরান্বিত করবে।

মানুষ জাতীয়তাবোধ প্রতিষ্ঠিত হলেই আরেকটি মহাসত্য তার কাছে উদ্ভাসিত হবে—সেটাই ধর্ম। তখনই সে বুঝতে পারবে যে, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—এ সবই মানুষকৃত সংস্কার মাত্র। এগুলো ধর্ম নয়। ধর্ম হলো যা নিত্য, যা সত্য, যা অপরিবর্তনীয়, যা স্বভাবজাত—যা কোনো কালের, কোনো যুগের, কোনো সীমিত জ্ঞানের প্রভাবে পরিবর্তিত হতে পারে না।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *