দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

অবিদ্যা-তত্ত্ব-দীপিকা: উনত্রিশ



অদ্বৈতবাদী দর্শনে, জড় জগতের মিথ্যাত্ব (মিথ্যাত্ব) একটি কেন্দ্রীয় ধারণা, যা ব্রহ্মের একমাত্র পরম সত্তা হিসাবে অদ্বিতীয় অবস্থাকে তুলে ধরে। এই ধারণার মূল ভিত্তি হলো যে, জড় জগৎ স্বতন্ত্রভাবে অস্তিত্বশীল নয়, বরং এটি ব্রহ্মের উপর নির্ভরশীল এবং অবিদ্যা (অজ্ঞান) দ্বারা সৃষ্ট একটি আপেক্ষিক বাস্তবতা। অদ্বৈতবাদীরা জোর দিয়ে বলেন, জড় বস্তুর নিজস্ব 'সত্তাত্ব' বা স্ব-অস্তিত্ব নেই; এটি একটি মায়াময় সৃষ্টি, যা ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপকে ঢেকে রাখে। তাঁদের মতে, যখন আমরা জড় জগৎকে বাস্তব বলে মনে করি, তখন আমরা অবিদ্যার প্রভাবে থাকি, যা ব্রহ্মের অখণ্ড, নির্গুণ এবং নির্বিশেষ সত্তাকে উপলব্ধিতে বাধা দেয়। এই জড় জগৎ, যা আমরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করি, তা এক চূড়ান্ত বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিতে দেখলে ব্রহ্মেরই একটি প্রতিভাস, যা রজ্জুতে সর্পভ্রমের মতো। রজ্জু যেমন আদতে সর্প নয়, তেমনি জড় জগৎও ব্রহ্ম ব্যতীত অন্য কিছু নয়, এটি ব্রহ্মেরই একটি প্রক্ষেপিত রূপ।

তবে, এই অদ্বৈতবাদী দাবি দ্বৈতবাদী দর্শনের প্রেক্ষাপটে একটি গভীর সমালোচনার সম্মুখীন হয়। দ্বৈতবাদীরা জড় জগৎকে মিথ্যা বলার ধারণার সাথে মৌলিকভাবে একমত নন। তাঁদের মতে, জড় বস্তুর নিজস্ব অস্তিত্ব রয়েছে, যা ব্রহ্মের মতো অসীম বা শাশ্বত না হলেও, এটি একটি স্বাধীন বাস্তবতা। দ্বৈতবাদী দর্শন, যেমন মধ্বাচার্যের দ্বৈতবাদ বা রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, ঈশ্বরকে (ব্রহ্ম) পরম সত্তা হিসেবে স্বীকার করলেও, তারা জড় জগৎ এবং জীবাত্মাকে ঈশ্বরের থেকে স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে দেখে। এই দর্শনগুলো ঈশ্বরের সৃষ্টির ক্ষমতা এবং বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেয়, যেখানে জড় জগৎ ঈশ্বরের ইচ্ছারই একটি বাস্তব প্রকাশ। তাঁদের মতে, জড় জগৎ যদি মিথ্যাই হতো, তাহলে ঈশ্বরের সৃষ্টি নিরর্থক হয়ে যেত, এবং জীবাত্মার কর্মফল বা মোক্ষলাভের ধারণাও অসংগত বলে প্রতীয়মান হতো।

দ্বৈতবাদীরা যুক্তি দেন যে, জড়তাকে মিথ্যাত্বের সাথে সহজভাবে সমীকৃত করা একটি যৌক্তিক ত্রুটি। তাঁরা এটিকে 'অপর্যাপ্ত যৌক্তিক লম্ফ' হিসেবে অভিহিত করেন, কারণ সমস্ত জড় জিনিসকে সর্বজনীনভাবে বা যৌক্তিকভাবে মিথ্যা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। এই ধারণায় প্রয়োজনীয় 'ব্যাপ্যত্ব' (pervasion)-এর অভাব রয়েছে; অর্থাৎ, 'জড়' হলেই যে 'মিথ্যা' হবে, এমন কোনো অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক নেই। উদাহরণস্বরূপ, একটি পাথর জড় হলেও, এর বাস্তব অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। দ্বৈতবাদীরা বিশ্বাস করেন যে, ব্রহ্মের উপর নির্ভরতা মানে এই নয় যে, জড় বস্তুর কোনো অস্তিত্বই নেই; বরং এটি ব্রহ্মের সর্বময় কর্তা হওয়ার একটি প্রমাণ। ব্রহ্ম যেমন মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের কারণ, তেমনি জড় জগৎ তাঁরই এক বাস্তব সৃষ্টি, যা তাঁর লীলার অংশ।

অতএব, অদ্বৈতবাদের এই অনুমানটি, যারা ব্রহ্মকেই একমাত্র সত্য সত্তা হিসাবে স্বীকার করেন না, তাদের কাছে অবিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। দ্বৈতবাদী এবং অন্যান্য বাস্তববাদী দর্শনগুলি নিজস্ব যুক্তিতর্ক এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জড় জগতের বাস্তবতাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। তাদের মতে, আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা, যেখানে আমরা জড় জগৎকে বাস্তবিক বলে অনুভব করি, তা কেবল অবিদ্যার ফল হতে পারে না। এই দর্শনগুলি প্রায়শই ব্যাবহারিক বাস্তবতা এবং অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণের উপর জোর দেয়, যা অদ্বৈতবাদের জড় জগৎকে মিথ্যা বলার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। অদ্বৈতবাদের এই মৌলিক দাবিটি দ্বৈতবাদী দর্শনের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট শক্তিশালী নয় এবং এর একটি ব্যাপক বা সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা নেই। এটি একটি দার্শনিক বিতর্ক, যেখানে উভয় পক্ষেরই নিজস্ব শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে এবং চূড়ান্ত বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে এই বিতর্ক ভারতীয় দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

"জগৎ মিথ্যা।" এই উক্তিটি জগতের মিথ্যাত্বের একটি আরও প্রত্যক্ষ, দৃঢ় এবং অযোগ্য ঘোষণা হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। এটি প্রায়শই একটি অন্তর্নিহিত এবং গভীরভাবে প্রোথিত দার্শনিক ভিত্তিকে বোঝায়, যা অদ্বৈত বেদান্তের জন্য নিবেদিত, যেখানে জগৎ মৌলিকভাবে ব্রহ্মের চূড়ান্ত, একক বাস্তবতার ওপর একটি মায়াময় অধ্যাস (adhyāsa) হিসাবে বিবেচিত হয়। অদ্বৈতবাদী বৃত্তের মধ্যে ইতিমধ্যেই নিমজ্জিতদের জন্য, এই দাবিটি একটি সিদ্ধান্ত (siddhānta, একটি প্রতিষ্ঠিত উপসংহার বা মতবাদ) হিসাবে অনুভূত হতে পারে, যার জন্য আরও অনুমানমূলক প্রমাণের প্রয়োজন নেই, তাদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক উক্তি হিসাবে পরিবেশন করে।

এই আলোচনাটি একটি অদ্বৈতবাদী দাবিকে কেন্দ্র করে, যা অদ্বৈত দর্শন-কাঠামোর বাইরে, বিশেষত দ্বৈতবাদী বা ন্যায় দর্শনের প্রবক্তাদের কাছে উপস্থাপন করা হলে তার যৌক্তিক দুর্বলতাকে তুলে ধরে। যখন এই ধরনের দাবি কোনো দ্বান্দ্বিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়, তখন এটি আর স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয় না, বরং কঠোর প্রমাণ ও যুক্তির দাবিদার একটি অনুমান হিসেবে কাজ করে।

অদ্বৈতবাদী কাঠামোকে পূর্বাহ্নেই স্বীকার করেন না, এমন ব্যক্তিদের কাছে এই ধরনের দাবির কোনো সুস্পষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না। ফলস্বরূপ, পর্যাপ্ত সমর্থন ছাড়া এটির নিছক একটি উক্তি বা দাবি হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। মূলত, এটি "প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে," অর্থাৎ যে-সিদ্ধান্তটি প্রমাণিত করার কথা, তাকেই পর্যাপ্ত বা সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য ভিত্তি ছাড়াই অনুমান করে নেয়। ভারতীয় দর্শনে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সুপরিচিত যৌক্তিক ত্রুটি হিসেবে দেখা হয়, যা 'সত্তা-সিদ্ধি' বা 'প্রমাণ-সিদ্ধি' ত্রুটি নামে পরিচিত। এটি এমন একটি সমস্যা, যেখানে আলোচনার শুরুতে প্রমাণ করা প্রয়োজন, এমন বিষয়কে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়া হয়। সত্তা-সিদ্ধি/প্রমাণ-সিদ্ধি ত্রুটি হলো: যে-জিনিসকে প্রমাণ করতে চাই, সেটাই যদি আগে থেকেই প্রমাণিত না হয়, তাহলে সেই জিনিস দিয়ে আবার অন্য কিছু প্রমাণ করা যায় না। এটা যেন অস্তিত্বহীন বা অপ্রমাণিত জিনিসকে ভিত্তি বানিয়ে নতুন কিছু প্রমাণ করতে যাওয়া।

অদ্বৈত বেদান্তে অবিদ্যা-ব্রহ্ম সম্পর্ক ধরেই “সত্তা-সিদ্ধি” বা “প্রমাণ-সিদ্ধি” ত্রুটি ব্যাখ্যা করা যাক। অদ্বৈত বেদান্তে বলা হয়—ব্রহ্ম হলো একমাত্র সত্য। জগৎ ও ভেদবুদ্ধি অবিদ্যার কারণে প্রকাশিত। কিন্তু সমস্যা হলো—এই অবিদ্যা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?

যদি কেউ বলে: “অবিদ্যা আছে, কারণ আমরা জগতকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখি।” এখানে আপত্তি দাঁড়ায়—“অবিদ্যা আছে”—এই কথাটিই তো এখনও প্রমাণিত নয়, অথচ সেই অপ্রমাণিত “অবিদ্যা”-র অস্তিত্ব ধরে আবার জগতের ভিন্নতাকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, অবিদ্যার সত্তা (অস্তিত্ব) প্রথমেই সন্দেহজনক, সেটিকে ভিত্তি বানিয়ে নতুন কিছু (জগত মিথ্যা) প্রমাণ করতে যাওয়াটাই হলো সত্তা-সিদ্ধি ত্রুটি।

কখনো বলা হয়: “অবিদ্যা আছে, কারণ শাস্ত্রে (উপনিষদে) অবিদ্যার কথা বলা হয়েছে।” এখানে বিরোধী পক্ষের আপত্তি—প্রথমে তো প্রমাণ করতে হবে যে, শাস্ত্র এখানে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। যদি শাস্ত্রের প্রমাণশক্তি আগে থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ থাকে, তবে সেটিকে ধরে আবার অবিদ্যা প্রমাণ করা যায় না। এটাই প্রমাণ-সিদ্ধি ত্রুটি।

যদি কেউ বলে, “স্বপ্নের ঘোড়া আছে, কারণ আমি স্বপ্নে ওকে দেখেছি”—এখানে সত্তা-সিদ্ধি ত্রুটি হলো, স্বপ্নের ঘোড়ার অস্তিত্বই তো আগে প্রতিষ্ঠিত নয়। আবার যদি বলে, “ভূতের অস্তিত্ব আছে, কারণ পুরাণে লেখা আছে”—এখানে প্রমাণ-সিদ্ধি ত্রুটি হলো, পুরাণকে প্রমাণ হিসাবে আগে বৈধতা দেওয়া হয়নি। তাই অদ্বৈত বেদান্তে অবিদ্যা প্রমাণ করতে গিয়ে অনেক সময় এই অভিযোগ ওঠে যে, যুক্তি সত্তা-সিদ্ধি/প্রমাণ-সিদ্ধি ত্রুটিতে পড়ে যাচ্ছে—অর্থাৎ অবিদ্যার নিজের অস্তিত্বই অস্পষ্ট, অথচ তার ওপর দাঁড়িয়েই জগতের ভিন্নতা ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

অদ্বৈতবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিমধ্যে বিশ্বাসী নন, এমন ব্যক্তিদের জন্য, এই দাবিটি যে সাধ্যের দিকে পরিচালিত করবে, তার জন্য কোনো বাধ্যতামূলক হেতু বা যুক্তি উপস্থাপন করতে এটি ব্যর্থ হয়। ফলস্বরূপ, বৃহত্তর, আন্তঃ-ঘরানা দার্শনিক বিতর্কে এই দাবিটি অনুমানগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে পরিগণিত হয়। এটি দর্শনের বিভিন্ন ধারার মধ্যে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি গুরুতর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, কারণ এটি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত যৌক্তিক মানদণ্ড পূরণ করে না।

একটি দার্শনিক দাবি তখনই সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে, যখন তা শুধু একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বরং বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির কাছেও যৌক্তিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যথায়, এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিশ্বাস হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় এবং বৃহত্তর দার্শনিক বিতর্কে তার প্রাসঙ্গিকতা ও বৈধতা হারায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে, দার্শনিক আলোচনার ক্ষেত্রে অনুমান-নির্ভরতার পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য যুক্তির উপর নির্ভর করা উচিত।

মিথ্যাত্বকে বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার জন্য বার বার যা-ই প্রচেষ্টা চালানো হোক না কেন, তা সত্ত্বেও "ত্রুটি"-টি অবিচলভাবে বিদ্যমান থাকে। এই পুনরাবৃত্তিমূলক এবং জোরপূর্বক পর্যবেক্ষণ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, এই বিকল্প যুক্তিগুলো, যেমন বৃত্তি-ব্যাপ্যত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক অনুমান, চূড়ান্তভাবে যৌক্তিকভাবে অসংগতিপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে। এগুলি শক্তিশালী পালটা-যুক্তিগুলির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, এবং প্রায়শই অপ্রমাণিত বা বিতর্কিত অধিবিদ্যাগত অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে দেখা যায়। ফলস্বরূপ, এই যুক্তিগুলি দার্শনিক ঐতিহ্যের কঠোর মানদণ্ড দ্বারা দাবি করা কঠোর যৌক্তিক নিশ্চয়তা এবং সর্বজনীন প্রদর্শনযোগ্যতার সাথে জগতের মিথ্যাত্বকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়।

এই ত্রুটিগুলির স্থায়ীভাবে চিহ্নিতকরণ দার্শনিক কঠোরতার অপরিহার্যতাকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরে, যা যে-কোনো অনুমানকে সতর্ক যাচাই-বাছাই সহ্য করতে এবং সমস্ত যৌক্তিক ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হতে বাধ্য করে। এই সমালোচনামূলক এবং অবিরাম মূল্যায়ন নিশ্চিত করে যে, বাস্তবতার মৌলিক প্রকৃতি সম্পর্কে যে-কোনো গভীর দার্শনিক প্রস্তাব শুধুই একটি বিশ্বাস হিসেবে দাবি করা হয় না, বরং তা যৌক্তিকভাবে রক্ষণযোগ্য, সর্বজনীনভাবে প্রদর্শনযোগ্য এবং বৌদ্ধিক চ্যালেঞ্জের মুখে অভেদ্য। এটি ভারতীয় যুক্তির কঠোর মানগুলিকে স্পষ্ট করে তোলে।

মিথ্যাত্বকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কেবল পৃষ্ঠের যুক্তি বা সরল ঘোষণার চেয়ে অনেক গভীর এবং সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের প্রয়োজন। এই নিরন্তর অনুসন্ধান প্রমাণ করে যে, ভারতীয় দর্শন কেবল অনুমাননির্ভর নয়, বরং কঠোর যৌক্তিক বিশ্লেষণ এবং প্রমাণভিত্তিক যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই অনুসন্ধানের মাধ্যমে দর্শনের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ সত্যের উন্মোচন এবং মিথ্যার অপনোদন, সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়।

কাপড় এবং সুতোর উপমা: মিথ্যাত্বের একটি মূর্ত চিত্রণ

মিথ্যা-র বিমূর্ত ধারণাটির একটি আরও বাস্তব, সম্পর্কযুক্ত এবং স্বজ্ঞাতভাবে বোধগম্য উপলব্ধি সরবরাহ করার জন্য, একটি ক্লাসিক উপমার সাহায্য নিচ্ছি, যা অদ্বৈত বেদান্ত ঐতিহ্যের মধ্যে গভীরভাবে অনুরণিত হয় এবং গভীরভাবে শক্তিশালী একটি চিত্রাত্মক উদাহরণ হিসাবে কাজ করে। উপমাটি বিমূর্ত দার্শনিক নীতিসমূহ এবং প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধানের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে:

"এই কাপড়টি (Paṭaḥ) এই সুতোগুলির মধ্যে স্থিত পরম অনস্তিত্বের প্রতিযোগী (Etat-tantu-niṣṭha-atyantābhāva-pratiyogī), কারণ এর দৃশ্যত্ব (Dṛśyatvāt), যেমন একটি ঘট (Ghaṭavat)।"

এই যুক্তিতে বলা হচ্ছে: “এই কাপড় (পট/Paṭa) আসলে সুতো থেকে আলাদা কোনো স্থায়ী সত্তা নয়। কাপড় বলতে বোঝায় সুতোর মধ্যেই একধরনের পরম অনস্তিত্বের (সম্পূর্ণ অভাবের) প্রতিযোগী বা বিপরীত বস্তু, কারণ কাপড়কে আমরা চোখে দেখি (দৃশ্যমানতা আছে), যেমন আমরা একটি ঘড়া (মাটির পাত্র) চোখে দেখি।” অর্থাৎ, কাপড় আলাদা কোনো সত্য সত্তা নয়; কাপড় হলো সুতোর সমষ্টিকে আমরা যেভাবে দেখি, সেই নামমাত্র ধারণা।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *