গল্প ও গদ্য

অপ্রস্থান



আমি কি তোমাকে ছেড়ে সত্যিই থাকতে পারব?—এমন চিন্তা…তোমার কাছে কেবলই অতি-ভাবনামাত্র; তাই ওসব বলতে যাই না আর; কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর জানাটা আমার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

ভেবেছিলাম—আমি নিশ্চয়ই পারব, তুমি তো আমার জন্য অপরিহার্য কেউ নও, আর আমিও তোমার ভালোবাসার মানুষটা ন‌ই।

তুমি জানো, আমি লেখালেখি করতে পারি না, ওসব আমি কক্ষনো রপ্ত করতেই চাইনি, বড়ো কঠিন কাজ—ও আমাকে দিয়ে হবে না। কিন্তু, তুমি আমার খুউব কাছাকাছি থাকলে…আমার মনের ভেতরে কে যেন গুনগুন করে এত বেশি কথা বলতে থাকে…আমার অসহ্য লাগে—আমি লিখতে শুরু করি, শুধু তোমার জন্য, তোমাকে ভেবে—এটা মনে হয় একটা ম্যাজিক; আমার ভালো লাগে না, জানো!

প্রায় সময়, এসব আমি সহ্য করতে পারি না। আমি তোমার কাছ থেকে অনেক অনেক বেশি দূরে চলে যেতে পারি—মানুষের কাছ থেকে গায়েব হবার অভ্যেস আমার আছে; কিন্তু এবার মনে হচ্ছে, আমি পুরোপুরি ব্যর্থ!

আমি সম্মতি দিলাম—তুমি এবার নিজে থেকেই চলে যেয়ো, ও আমাকে দিয়ে সম্ভব হবে না; আমি অবশ্য দূরে যেতে চেয়েছি বেশ কয়েক বার, চেষ্টাও করেছিলাম—কিন্তু আমাকে একজন বাধা দেয়, প্রতি বার, প্রতিনিয়ত। আচ্ছা, ও কি অসুস্থ নাকি?

আমি কার কথা বলছি...তুমি জানো? তুমি নিশ্চয়ই তাকে চেনো; তুমি একবার আমাকে ভীষণ শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলে, মনে আছে? মনে নেই তোমার; কারণ—তুমি আমাকে বহু বার এমন শক্ত করেই জড়িয়ে ধরেছ এ জীবনে—তখনই হয়তো তার সাথে তোমার পরিচয়টা হয়েছিল।

তুমি আমার চোখে কখনো তোমার জন্য জল দেখেছ? দেখোনি তো? কিন্তু আমি দেখি, প্রতিক্ষণে—আমার ভেতরের মানুষটার বিশ্রী রকমের কোলাহল আমি থামাতে পারি না—যেন এখানে হস্তক্ষেপের বিন্দুমাত্র অধিকার আমার নেই, যা আমার স্বভাবের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

তোমার সাথে শারীরিক দূরত্বটা একপ্রকারে মেনে নিলেও, মানসিক দূরত্বটা মেনে নিতে পারছি না। শুনেছি—আত্মার নাকি কোনো দূরত্ব হয় না। আমি আগের জন্ম, পুনর্জন্ম…এসবে বিশ্বাস করি না; জন্মান্তর মিথ্যে হলে, এটিই হবে—আমাদের শেষ দেখা।

কোনো এক ইউনিভার্সে আমরা নিশ্চয়ই পরস্পর দু-জনের ঘনিষ্ঠ কেউ ছিলাম; কাউকে খুউব বেশি ভালোবেসে ফেললে এরকম হয় আর কি! তার জন্য সব কিছু দিয়ে ফেলি, এমন মনে হয়…এসবই বলবে তো?—সত্যি, এসবের কিছুই নয়; এটা ঠিক ভালোবাসা টাইপের ভালোবাসা নয়, তুমি বুঝতে পারছ? আই মিন—কাউকে যদি তুমি তোমার সৌলের কিছু কিছু অংশ দিতে শুরু করো, আর এমন হতে পারে...সেগুলো দেবার খেলায় তুমি মরিয়া হয়ে উঠেছ!

নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্য, আচরণ, প্রয়োজনীয়তা মেটানোর সাথে এমন উপলব্ধির কোনো সম্পর্কই নেই—আমি যে-সব প্রচ্ছন্ন রূপের ব্যাপ্তির কথা বলছি, তা সচরাচর কেউ কাউকে ভাগ করে দেয় না—এমন কিছু, যা তোমার বাহ্যিক কিছু নয়, বরং তুমি নিজেই। এই সমস্যাটা কঠিনতম এক বাস্তবতা, আমার দৃষ্টিতে; বুঝেছ?

আমি ভীষণ অসুস্থ, সুস্থ হতে পারব বলে মনে হয় না—আস্থা হারিয়ে গেছে; নিজের ওপর বড্ড রাগ হয়...আমার ভেতরের মানুষকে গলা টিপে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করে প্রায়ই, বকাঝকা করি, তবুও চুপ থাকে না; বড়ো অভিমানী, আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়, সহ্যক্ষমতার পরীক্ষা নেয়—আমি আর কত বার হেরে গেলে…ও শান্ত হবে?

তবুও, এক সংযমের রাত পেরিয়ে…আমি জেগে থাকি তারই অপেক্ষায়, আমার ভেতরের সত্তার সংস্পর্শে এলেই, ধীরে ধীরে আমি আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠি—এভাবেই আমাদের সখ্য বাড়ে, জীবন পেরিয়ে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি আমাদের দৃষ্টি স্থায়ী হতে থাকে, প্রারম্ভিকে...দীর্ঘনিঃশ্বাসে, এক বিশ্বস্ত সঙ্গী পরম যত্নে…আমায় আগলে রাখে, নিঃশব্দে; শান্তির ঘ্রাণে আমার আত্মাকে…আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে—এই অনুভবটি কেবল তোমার আলিঙ্গনে এসে বহুগুণে বাড়ে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *