কণ্ঠ ১ (কৌতূহলে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়): সাংখ্যদর্শন বলে—"একটি প্রকৃতি, একটি পুরুষ", যোগ বলে—"ধ্যান করো, যোগস্থ হও", ভক্তি বলে—"জপো ঈশ্বরের নাম"—এসব পথের মধ্যে কোনটা ঠিক?
কণ্ঠ ২ (অভিজ্ঞতার গভীর থেকে): সব পথ এক। সব দর্শন অভিন্ন সত্তার চারপাশ ঘিরে ঘোরে। যে বলে "আমি", সে–ই যাত্রাপথ, সে–ই গন্তব্য।
(কণ্ঠ ১): কর্ম বলে—“কাজ করো নিঃস্বার্থভাবে”, জ্ঞানে বলা হয়—“জেনো, আত্মা একমাত্র সত্য”…এই মতগুলো কি পরস্পরবিরোধী?
কণ্ঠ ২ (গম্ভীর মৌনস্বরে): না, তারা সবই সেই এক চৈতন্যের ধ্বনি, যা বিভিন্ন রূপে আত্মাকে ডাকে। একজন বলে—“তুমি দেহ নও”, আরেকজন বলে—“তুমি ভগবানের অংশ”, কিন্তু শেষে সবাই বলে—“তুমি ব্রহ্ম”।
কণ্ঠ ১ (একটু থেমে, গভীর অনুধ্যানে): তবে কি সব সাধনা-রীতি অবশেষে ফুরিয়ে যায়?
(কণ্ঠ ২): না, তারা মুছে যায় বলে নয়—তারা নিজেই পরিণত হয় নিঃস্বর মৌনব্রতে। যেখানে থাকে না কোনো ভাষ্য, মত, মতভেদ—থাকে কেবল এক চৈতন্যবিন্দু।
দু-জন একসাথে (ঐক্যস্বরের তালে, যেন আত্মা একাকার—ছন্দে, স্থির ও প্রজ্ঞায় দীপ্ত স্বরে): সকল দর্শন একই দিকে—নামহীন নির্গুণের দিকে, যেখানে ব্রহ্মই সকল পথ, সকল গন্তব্য। সব পথ শেষমেশ এক। কেউ বলে জ্ঞান, কেউ বলে প্রেম, কেউ বলে কর্ম, কেউ বলে ধ্যান। কিন্তু সবই পথ, সবই সেই চিরন্তনের সন্ধান। মতবাদ বদলায়, পথ বদলায়—বদলায় না শেষের নাম। ব্রহ্মই শেষকথা, মৌনই আসল বাণী—সব পথ, সব দর্শন—মিলে যায় এক চেতনার পানে।
কণ্ঠ ১ (আকুল দৃষ্টিতে প্রশ্ন রাখে): তুমি বলো, ব্রহ্ম সব…কিন্তু ব্রহ্ম কি নিঃসঙ্গ, নীরস এক শূন্যতা? না কি তাঁর মধ্যেই আছে প্রেম, স্পন্দন, আনন্দ?
কণ্ঠ ২ (চির-আলোকের কণ্ঠে): ব্রহ্মই আনন্দ। তিনি কোনো উপলব্ধি নন, তিনি নিজেই সকল অনুভবের উৎস—যা চায় না কিছু, চায় না কাউকেই—তবু পূর্ণ।
কণ্ঠ ১ (চমকে উঠে): তবে কি আনন্দ কোনো বস্তু নয়? কোনো অভিজ্ঞতা নয়?
(কণ্ঠ ২): আনন্দ কোনো প্রতিক্রিয়া নয়—আনন্দ হলো সত্তা। তুমি যাকে খোঁজো—তা তুমি নিজেই। তোমার চেতনার গভীর স্তরেই জেগে আছে সে।
(কণ্ঠ ১): কিন্তু আমি তো সুখ-দুঃখে ভাসি! কখনো হাসি, কখনো কাঁদি!
(কণ্ঠ ২): সেই দুঃখও ব্রহ্ম—তুমি তাঁকে বিচ্ছিন্ন ভাবো বলেই কষ্ট পাও। আনন্দ সব কিছুর মধ্যেই আছে, তুমি শুধু ভুলে গেছ—তুমি কে।
দু-জন একসাথে (নিরবধি স্বরে, চেতনার গভীর মিলনে—ধীর, সুরভিত ছন্দে, যেন ভেতরের নীরব হাসিতে): আমি ব্রহ্ম, আমি চৈতন্য, আমি আনন্দ। আমার মধ্যে নেই চাওয়া, নেই পাওয়া, নেই হারানোর ভয়। আনন্দই আমার নাম—কারণ আমি নিজেকে জানি। আমি আনন্দ—কারণ আমি চাওয়ার বাইরে, আমি পূর্ণ—কারণ আমি সব কিছুর ভেতরে। আনন্দ হলো অস্তিত্বের ভাষা, যেখানে নেই ভেদ, নেই আশা। আমি সেই চির-আনন্দ-স্বরূপ—যার গভীরতায় হারায় সমস্ত অনুভব।