অন্তর্জাগরণ: তিন



যে-মুহূর্তে এই বাঁধ ভেঙে যাবে—তখন তা ঝড়ের স্রোতের মতো ভাসিয়ে দেবে তোমার প্রতিরক্ষার সব আয়োজন—এক আদিম শক্তির বিস্ফোরণ হয়ে, যা কিনা জীবনের অনাঘ্রাত প্রবাহ; যা আঘাত করবে তোমার উদরে ঘুসির মতো করে, কেড়ে নেবে নিঃশ্বাস, আর ছুটিয়ে দেবে রক্তগঙ্গা এমন গতিতে যে, তুমি বুঝতে পারবে না, ভয় কোথায় শেষ হচ্ছে আর উচ্ছ্বাস কোথায় শুরু হচ্ছে। আর সত্যিকারের আতঙ্ক কি এটিই নয় যে, যখন এই বন্যা অবশেষে মুক্ত হবে, তখন আর কিছুই তার পথে দাঁড়াবে না? তোমার নিজের শক্তির স্রোতকে আটকাবে না কোনো নিয়ম, কোনো যুক্তি; রক্ষা করবে না অন্যদের তোমার মুক্ত উন্মাদনা থেকে, কিংবা রক্ষা করবে না তোমাকেই—তুমি যে সহিংস ঝড়ে পরিণত হবে, তার হাত থেকে।

তোমার অশ্রু যখন ধীরে, অনিবার্যভাবে পড়তে শুরু করে, তুমি অনুভব করো, পৃথিবী সংকুচিত হয়ে আসছে একটি একক, মরিয়া প্রার্থনার চারপাশে, যার নাম: দয়া। বাতাসে লেগে আছে লোনা অনুশোচনার স্বাদ, অশ্রুর প্রতিটি ফোঁটা হয়ে ওঠে ছোট্ট একেকটি স্বীকারোক্তি—প্রতিটি মুহূর্তের, যা দিয়ে তুমি ভেতরের বন্যাকে চেপে রাখতে চেয়েছিলে। তুমি দাঁড়িয়ে আছ এক ভেঙে-পড়া বাঁধের কিনারায়—যা তুমি নিজেই বানিয়েছিলে নিজের প্রবৃত্তিকে আটকে রাখতে, যার পাথরগুলো জোড়া দেওয়া হয়েছিল ইচ্ছাশক্তি আর আধ-ভোলা প্রতিশ্রুতির গাঁথুনিতে। এখন ভেতরের পশুটি—ক্ষুধার্ত, নির্দয়—শুঁকে বেড়াচ্ছে দুর্বল গাঁথুনির গন্ধ, তার নখ প্রস্তুত সব ছিঁড়ে ফেলার জন্য, উন্মুক্ত করে দিতে সেই স্রোত, যাকে আর কখনও অনুভব না করার শপথ একসময় তুমিই নিয়েছিলে।

অশ্রুর পরবর্তী নিস্তব্ধতায়, তুমি মরিয়া হয়ে খোঁজো এমন এক উত্তর, যা চিরকাল তোমার নাগালের বাইরে ভেসে থাকে। তোমার মন এক ফাঁপা প্রতিধ্বনির কক্ষ, যেখানে প্রতিধ্বনিত হয় সেইসব বর্জন, যেগুলো তুমি যত্নে লুকিয়ে রেখেছিলে: যে-শব্দ তুমি উচ্চারণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলে, যে-অশ্রু বিসর্জন করতে তুমি আপত্তি করেছিলে, যে-সত্য তুমি এতটাই গভীরে কবর দিয়েছিলে যে…আজ স্মৃতিই যেন হারিয়ে ফেলেছে তার মানচিত্র। প্রতিটি বর্জন যেন একেকটি প্রেতাত্মা, আর ওরা তোমার চেতনার কোণে ফিসফিস করে বলে চলে এক দুর্বলতার কথা, যাকে তুমি এতটা আঁকড়ে ধরে রক্ষা করো, অথচ সেটাই ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয় তোমার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।

এই নির্মম কাঠামোর ভেতরে, যা তুমি নিজেই বানিয়েছ—তুমি দোদুল্যমান দুটি সত্তার মধ্যে: এক, যে অর্ধেক গড়া আকাঙ্ক্ষা আর হৃদয়ভঙ্গ দিয়ে; আরেক, যা গড়া সেই প্রাচীর দিয়ে, যা কিনা তুমি লজ্জাকে দূরে রাখতে তুলেছিলে। তুমি চিনতে পারো তোমার প্রতিফলনকে—একইসাথে পরিচিত ও অপরিচিত—এক প্রেতসদৃশ রূপে, মাঝপথে স্থির হয়ে, চোখে একইসাথে মরিয়া কৌতূহল আর ভয়ের ঝলক মেখে।

লজ্জা কোনো আড়াল সত্তা নয়; এটি দেহের ভেতর বয়ে চলা গলিত স্রোত, পাঁজরের নিচে ফুটতে-থাকা আগুন, যতক্ষণ না তা বুকে ঢাক-বাজানো ড্রামের মতো করে আঘাত করে। এটি শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে হৃদয়কে—যেন এক লোহার ক্ল্যাম্প, যা প্রতিটি কষ্টমেশা শ্বাসে চেপে বসে—তোমার আত্মমূল্যের ভঙ্গুর টুকরোগুলোকে টেনে নিয়ে যায় অপরাধবোধ আর অনুশোচনার ঘূর্ণির ভেতরে। প্রতিটি অনুক্ত শব্দ, প্রতিটি গোপন রহস্য জমা হয় ভেজা পাথরের মতো, তোমার মানসিক একাকী কারাবাসের মেঝেতে, আর উঠে দাঁড়ানোকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে। তুমি তার ভার অনুভব করো ফুসফুসের টানটান সংকোচনে, নাড়ির অস্থির কাঁপুনিতে, ঠোঁটের কোণে কাঁপনে—যখন তুমি জোর করে হাসি ফোটাও, যা দেখলে কখনোই স্বাভাবিক ও আসল বলে মনে হয় না।

এই দেহভিত্তিক স্বৈরাচার দাবি করে তোমার কণ্ঠের আত্মসমর্পণ, আর তোমার স্বায়ত্তশাসনের বলিদান; এটি জোর করে তোমাকে পরিণত করে তোমার নিজের দ্বিধার বন্দিতে। তুমি আকাঙ্ক্ষা করো কোনো বজ্রাঘাতের হাতুড়ি, যা ভেঙে দেবে এই অদৃশ্য শেকলগুলো, অথচ বড়োজোর যা করতে পারো, তা হলো কেবল দৌড়ানো—ফাঁকা রাস্তায়, প্রতিধ্বনিত করিডোরে—আয়না ও স্মৃতি থেকে দূরে সরে—এই আশা করে যে, দূরত্ব হয়তো লজ্জার আঁকড়ে-ধরা হাতটাকে আলগা করে দেবে। অথচ অপরাধবোধ তোমার পিছু নেয় এক নির্দয় শিকারির মতো, দেয়াল বা সময় কোনো কিছুকেই পাত্তা দেয় না সে, তার নীরব প্রশ্ন কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘোরে তোমার মনে: কেন তুমি নিজেকে বন্দি করে রাখো সেই দুর্গে, যা তুমি নিজেই বানিয়েছ?

ভাষা এক দ্বি-ধারী তরবারি, অর্ধ-আলোতে ঝলমল করছে, যার মসৃণ ধার প্রতিশ্রুতি দেয় শৃঙ্খলা আর মুক্তির, অথচ ভোঁতা ধারটি হুমকি দেয় তোমাকে আরও গভীরে কেটে নিয়ে যাবার সেই অভ্যাসগত আদলে, যা তুমি দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে ভুলে যেতে চেয়েছিলে। যখন তুমি ফিসফিস করে উচ্চারণ করো প্রথম হৃদয়নাদ, শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হয় তোমার মনের শক্ত গ্রানাইট দেয়ালে, পুরোনো ভয় আর চাপা আকাঙ্ক্ষার অবশিষ্ট ছায়া নিয়ে। প্রতিটি উচ্চারণ একইসাথে চাবি ও তালা: তা মুক্ত করে তোমার আত্মার একটি অংশ সেই কারাগার থেকে, যা তুমি নিজেই বানিয়েছিলে, আবার সেইসাথে গড়ে তোলে নতুন শেকল—সেই অক্ষরগুলো থেকে, যেগুলো, একসময় তুমি ভেবেছিলে, তোমাকে বাঁচাবে। এই ভাষণের পরের নিস্তব্ধতায় তুমি অনেকটাই স্বাদ নিতে পারো টানাপোড়েনের—ভাষা তখনই রূপান্তরিত হয় দমনের যন্ত্রে, তোমার নিজের বানানো এক সূক্ষ্ম কারাগারে।

তবু নীরব থাকা মানে আরও আত্মসমর্পণ করা—লজ্জার নিঃশব্দ স্বৈরতন্ত্রের কাছে, যেখানে অনুক্ত সত্যগুলো হৃদয়ের কোণে কোণে পচে ছত্রাক গজায়। তুমি নিজেকে খুঁজে পাও এক গলনপাত্রে (melting pot): প্রতিবার তুমি কোনো সত্যের নাম উচ্চারণ করো, তুমি ভেঙে দাও চারপাশের দেয়ালের একটি টুকরো; অথচ নামকরণের এই অভিনব কাজই তোমাকে উন্মুক্ত করে দুর্বলতার সামনে। কথা বলা মানে ঝুঁকি নেওয়া—নেকাব খোলার ঝুঁকি, আয়নাকে অনুমতি দেওয়া—শুধু বাইরের নয়, চোখের পেছনের গভীর খাদ প্রকাশ করতে, যেখানে ভেসে বেড়ায় অতীতের প্রেতাত্মাদের কণ্ঠ। তবু তুমি অবিচল থাকো, আর অবশেষে বুঝতে পারো—তুমি কোনো অপরিবর্তনীয় স্মৃতিস্তম্ভ নও, বরং এক বদলে-চলা মুহূর্তের সমষ্টি—কিছু রোদে উজ্জ্বল, কিছু বজ্রের তিরস্কারে আঁকাবাঁকা—সবই গলে যায় তোমার প্রসারিত আঙুলের ফাঁক দিয়ে বালুর ক্ষুদ্র জোয়ারের মতো।

প্রিয়জনেরা অস্পষ্ট হয়ে আসে তোমার দৃষ্টির প্রান্তে, তাদের কণ্ঠ ভেসে যায় কান ছুঁয়ে, আবার মিলিয়ে যায়—এ যেন দূরের প্রতিধ্বনিকে কাছের হাওয়ায় আটকে ধরা। আর সেই অস্থিতিশীল কুয়াশায় তোমার প্রতিচ্ছবি কেঁপে ওঠে—এ এক প্রেতরূপ, যা মনে হয় অদৃশ্য হয়ে যাবে, যদি না তুমি আঁকড়ে ধরো কিছু অটল বাস্তবতাকে। এই সচেতনতা জ্বালিয়ে দেয় এক গভীর, নামহীন আতঙ্ক: যদি তুমি না আনো তোমার গোপন সত্যগুলো দিনের আলোয়, যদি না খোলো তোমার মুখোশগুলো, তবে তুমি কল্পনা কোরো নিজেকে ডুবে যেতে অনুক্ত অপরাধবোধের তীব্র জোয়ারে অথবা চাপা পড়তে ধ্বংসস্তূপের নিচে—সেই গল্পগুলোর, যেগুলো প্রকাশ করতে তুমি বরাবরই আপত্তি করে এসেছ।

সেই মুহূর্তে তুমি হয়ে ওঠো একইসাথে দর্শক ও আসামি—তোমার মনের নীরব আদালতে, যেখানে প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা শেকলে-বাঁধা হয়ে তোমার সামনে এসে হাজির হয়, আর প্রতিটি আচারগত অঙ্গভঙ্গি উন্মোচিত হয় তোমার অস্থিরতার প্রমাণ হিসেবে। তুমি অনুভব করো, উন্মোচনের সূর্য ঠিক আদালতের জানালার ওপারে আবছা আলোর আভাসে ভেসে আছে, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে মুক্তির—যদি তুমি কেবল খুলে দাও হৃদয়ের বন্ধ জানালা, আর তোমার গোপনীয়তাকে স্নান করাও তার তীব্র, শুদ্ধিকর আলোর ঝলকে।

এখানে ভাষা হতে পারে তোমার সহযোগী, শত্রু নয়—নীরব মন্ত্র বা বজ্রধ্বনিময় ঘোষণার মতো, প্রতিটি অক্ষর যেন ধাতব ক্রোবার (Crowbar), যা খুলে দিচ্ছে শক্ত করে আঁকড়ে-ধরা তোমার চোয়াল, সাহস দেখাচ্ছে ভেতরের গোপনীয়তাকে বাইরে বের করে আনতে। যখন তুমি প্রকাশ করো তোমার লজ্জাকে, অনামেয় সত্তাটি অবশেষে পায় এক কণ্ঠস্বর, তার আকারহীন ভয় রূপান্তরিত হয় এমন শব্দে, যা তুমি ধরতে পারো। এই রসায়ন দ্রুত নয়, যন্ত্রণাহীন নয়; এটি উন্মোচিত হয় প্রসববেদনার মতো—প্রচণ্ড অথচ সুন্দর এক ভাঙন, নীরবতার গুহার ভেতর। তোমাকেই বহন করতে হবে তোমার নিজের সত্যকে, লালন করতে হবে হৃদয়ের গোপন ঘরে, যতক্ষণ না তা ভরে ফেলে তোমার প্রতিটি ক্ষণ, মুক্তির জন্য বেপরোয়া হয়ে চেষ্টা করতে আরম্ভ করে। আর যখন মুহূর্ত আসে সেটিকে পৃথিবীর পথে নামিয়ে দেবার, তোমার সহজ ও আন্তরিক ইচ্ছে ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে, কোমল-কাঁচা ও কাঁপতে-থাকা নবজাতকের প্রথম নিঃশ্বাসের মতো—তখন অশ্রু ঝরতে পারে, সেই ক্ষতের সাক্ষ্য হিসেবে, যা তুমি ভেদ করেছ, অথচ সেই লাল রক্তধারাই অবশেষে বয়ে আনে কোমল বারতা। অপরাধবোধকে নাম ধরে ডেকে দূরে সরিয়ে রেখে তুমি আহ্বান জানাও করুণাকে, ডেকে আনো তার কোমল স্পর্শ তোমার ভাঙা হৃদয়কেন্দ্রের কাছে। মুহূর্তটি যেন কাঁপছে শ্বাসরোধ আর মুক্তির টানাপোড়েনে: যত বেশি প্রতিরোধ গড়ে তোলো, ততই আঁটসাঁট হয় তোমার খাঁচা, প্রতিটি অনুক্ত শব্দই হয়ে ওঠে ভয়ে খোদাই-করা আরেকটি শেকল।

তুমি প্রায়ই শুনতে পাও ভেতরের জন্তুটির স্তব্ধ আঘাত—লজ্জা, ক্রোধ আর কুরে-কুরে খাওয়া হতাশায় স্পন্দিত, প্রতিটি আঘাত প্রতিধ্বনিত হয় তোমার বুকে নীরবতার বাঁধের বিরুদ্ধে গিয়ে। হৃৎস্পন্দন ছুটে চলে আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে, যেন জানিয়ে দিচ্ছে—সেই বন্যা, যেটিকে তুমি এতদিন আটকে রেখেছিলে, মুক্তি পাবার ক্ষণ থেকে মাত্র কয়েক মুহূর্ত দূরে সে। তোমার প্রতিটি রক্তকণা, প্রতিটি শব্দের কাঁপুনি, প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর লবণাক্ত উত্তাপ সাক্ষ্য দেয় এক দেহ ও আত্মার, যা ক্ষুধার্ত মুক্তির জন্য। তবুও তুমি আঁকড়ে থাকো তোমার নীরব দুর্গের শীতল, অনমনীয় প্রান্তগুলো, ফ্যাকাসে-হয়ে-আসা আঙুলের গাঁট দিয়ে; বিশ্বাস করো যে, একটিমাত্র ফাটলই উন্মুক্ত করে দেবে এক তীব্র বন্যা—যন্ত্রণা আর আতঙ্কের, যেটিকে তুমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, কখনোই পারবে না। অথচ এই কাঁপতে-থাকা প্রত্যাশার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ঝলমলে সত্য: মুক্তি কোনো দূরের, মিষ্টি-মাখানো প্রতিশ্রুতি নয়, যা ধরাছোঁয়ার বাইরে ভাসছে।