গল্প ও গদ্য

অতৃপ্তির অভিমান



রোদ্দুর! আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে। না পারছি কিছু করতে, না পারছি বুঝতে। আমি যে নেহাতই ভীষণ তুচ্ছ।

ভয় লাগছে, রোদ্দুর; এরপর হয়তো দূরে নিক্ষিপ্ত হব।

রোদ্দুর! আমি তো চলছি, বেঁচে থাকতে যা যা করতে হয় করছি, কিছু স্বপ্নও রেখে দিয়েছি যেন বেঁচে থাকতে ভালো লাগে। সব কিছুই ঠিকঠাক, অথচ কোথাও যেন একটুও তৃপ্তি নেই, শান্তি নেই। আমার যা ভালো লাগা, আনন্দ—সব কিছুই মেনে-নেওয়া ভালো লাগা, ভালো থাকা। স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দটুকু, ভালো লাগাটুকু কোথায় যেন জীবনের শুরুতেই বিসর্জন দেওয়া।

এই অতৃপ্তিটুকু ঘোচাতে ঈশ্বরের দ্বারস্থ হই; আমার প্রেমের জায়গায়, আমার সেই মানুষটার জায়গায় ঈশ্বরকে বসাতে চেষ্টা করি, অথচ ঈশ্বরও সেই স্থানটা নিতে পারেন না। যা ত্যাগ করেছি, যার কোনো অস্তিত্ব নেই আমার জীবনে—সে-ই কেন সবচেয়ে বড়ো আসনটা এভাবে দখল করে আছে?

আমি চাই, তার সাথে আমার যেন কখনও দেখা না হয়, কোনো রকম কোনো যোগাযোগ না হয়। একটা গোটা জীবনের অতৃপ্তির অভিমান তার কাছে। স্রেফ ভালো থাকতে চাই।

ভেতরের অশান্তি, যন্ত্রণা, কষ্টের কথা কাউকেই বলা যায় না, শেয়ার করা যায় না—নিজের মানুষ, আপন মানুষ, কাছের মানুষ, কারও সাথেই না। সবাইকেই একটা হাসিমুখ দেখাতে হয়; দেখাতে হয়, ভালো আছি।

যে ভালো থাকে না, সে বিরক্তিকর। কত যন্ত্রণা নিয়ে কত মানুষ যে বেঁচে আছে! এ পৃথিবী ভালোবাসতে জানে না। এ পৃথিবীতে আছে শুধু জাজমেন্ট আর স্বার্থ। মানুষ যেদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, সেদিন থেকে তার জাজমেন্ট শেষ।

আগে সুন্দর ছিলাম, পৃথিবীটা সুন্দর দেখতাম, মানুষকে সুন্দর দেখতাম। এখন কুৎসিত হয়ে গেছি, তাই সব কিছু কুৎসিত লাগে। খুব ভয়ংকর রকমের কুৎসিত।

একজনের যন্ত্রণা আরেকজনের মন খারাপ করে দেয়, এজন্য যন্ত্রণার কথা বলতে চাই না। জীবনে কিছুই চাইনি, রোদ্দুর! জীবন কী—এটা বুঝতেই অনেক সময় লেগেছে। যাকে ভালোবাসি, তার কাছে কখনও পৌঁছুতে পারব না; যার সাথে থাকতে চেয়েছি, তারা আমাকে মেনে নেবে না—এসব সহজেই মেনে নিয়েছিলাম।

কার‌ও কাছে ছোটো হতে চাইনি। যার সাথে আছি, তার কাছে কখন‌ও ভালোবাসা, যত্ন এসব চাইনি—শুধু একটু শান্তি আর সম্মান চেয়েছি। শুধু কোনোরকম বেঁচে থাকতে চাওয়া একটা মানুষের পেছনেও মানুষ লাগে, তাকেও ফ্যামিলি পলিটিক্সের শিকার হতে হয়। কীসের জন্য এত হিংসে, তা-ও বুঝতে পারি না। এসব সামলে নিতে নিতে দুনিয়াটাকে কুৎসিত দেখি।

আমার কোথাও কোনো দুঃখ নেই, শুধু একটাই যন্ত্রণা—কিছু মানুষ আমাকে হেয় করে, অপমানিত করে, ছোটো করতে চায়। আমি শুধু একটু সম্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছি। আমার কপালটাই এমন।

আজকাল শারীরিকভাবে প্রায় সময়ই খারাপ থাকি, কোনোকিছু গভীরভাবে ভাবতেই পারি না।
এত কিছুর ভিড়েও আমার একটা সান্ত্বনা আছে। আমি জানি, গোটা দুনিয়া একদিকে গেলেও, আমার একটা মানুষ আছে, যে আমাকে বুঝবে।

একটা সত্যি কথা বলি—আমি সত্যিই চাইনি একজন অর্ধমৃত মানুষের সাথে একজন টগবগে স্বপ্নবাজ মানুষের কোনো যোগাযোগ থাকুক, একজন চরম দুঃখী মানুষের সাথে একজন সফল মানুষের কোনো আলাপ থাকুক। কোনোরকম বেঁচে থাকতে চাওয়া একটা মানুষের সাথে দুনিয়া কাঁপানো সফল একটা মানুষের কোনো সম্পর্ক হোক। কত বার এখান থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে সেটা করতে দেয়নি। আমাকে প্রতিনিয়ত কথা বলিয়েছে তোমার সাথে।

আমি সবার মুক্ত থাকায় বিশ্বাসী। বিশেষত যে-বন্ধন পীড়াদায়ক, সেখান থেকে তাড়াতাড়ি মুক্তি দেওয়া উচিত। কিন্তু পারিনি তোমাকে মুক্তি দিতে, নিজে মুক্ত হতে। এখন আর মুক্ত হতে চাই না। যা হচ্ছে, তা ভালোই হচ্ছে; যা হবে, তা-ও ভালোই হবে। তোমার এবং আমার দ্বারা কখনও কোথাও খারাপ হওয়ার নেই। আমাদের দিয়ে কখনও অন্যদেরও খারাপ হবে না।

তুমি আমি তো একই। দুনিয়ার সমস্ত কষ্ট নিজেরা মাথা পেতে নিয়েও কোথাও কার‌ও একটুকুও ক্ষতি হতে দেবো না কখন‌ও। একসঙ্গে দুঃখ বয়ে চলাই সত্যিকারের মিলন।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *