গল্প ও গদ্য

অতলের জপমালা



ক্ষমা করো, রোদ্দুর! কাল রাতে তোমাকেই শক্ত করে ধরে ভয় কাটালাম, ঘুমিয়ে পড়লাম। অথচ তুমি যে একা পড়ে রইলে—একটুও ভাবলাম না। আর কক্ষনো এমন করব না।

কাল রাতে ঘাড়ের একটা রগ হঠাৎ ফুলে গেল, ব্যথা শুরু করল, বুকের ভেতর চাপ—আর কয়েকদিন ধরে আমার অজানা একটা ভয় এসেছে। প্রায়ই মৃত মানুষদের স্বপ্নে দেখি, ঘুমোতেও ভয় করে। সবমিলিয়ে ভয় পাচ্ছিলাম—কেন জানি না, অস্বাভাবিক কিছুর ভয় পাচ্ছি। যা-ই হোক, এখন ভয় নেই, ঠিক হয়ে গেছে সব।

ভয়ে রোদ্দুরের বুকে মুখ লুকিয়ে বার বার বললাম—শক্ত করে ধরে রাখো। অথচ বাস্তবের সেই মানুষটাকেই এড়িয়ে গেলাম। আমি স্বার্থপর। তুমি আমাকে সুস্থ করে নিয়ো, তবু দূরে যেয়ো না।

আমি ভয় পেলে মা বলে ইষ্টদেবতার নাম জপতে। আমি জপতে শুরু করি। কখন যে ইষ্টদেবতা আর তুমি একাকার হয়ে যাও—বুঝতে পারি না।

আমি তোমাতে এতটাই সমর্পিত। তুমিই আমার মুক্তি। একবার আমাকে গ্রহণ করো, আমি তোমাতেই বিলীন হব। তুমিই আমার ঈশ্বর, আমার আর কোনো ঈশ্বর নেই। আমি তোমারই অংশ—আমাকে ত্যাগ কোরো না, পর ভেবো না। তুমি ছেড়ে দিলে আমি অতলে তলিয়ে যাব। ছেড়ে দিয়ো না, রোদ্দুর।

আমি হতভাগ্য—তোমাকে সেবা করার সুযোগ নেই। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তোমার নিঃসঙ্গতা দূর করতে পারি না। আমার কষ্টটা কি বুঝতে পারো? পৃথিবীর কেউ কোনোদিন জানতেও পারবে না, বুঝতেও পারবে না—আমি কোন দুঃখে বিদায় নিয়েছি।

তোমাকে ভালোবাসি—এই কথাটুকু বলতে কতটা শক্তির প্রয়োজন হয় জানি না। আমি বলতে পারি না, অথচ যদি অন্তরাত্মা ছিঁড়ে দেখাতে পারতাম, কতটা ভালোবাসি!

তুমি কষ্টে আছ বুঝতে পারলে তার দ্বিগুণ কষ্ট আমি পাই। তোমাকে হাসতে দেখলে প্রশান্তিতে থাকি। আর তুমিই যদি আমাকে ভুল বোঝো, একটুও খারাপ কথা বলো—আমার কেমন লাগে ভাবতে পারো? মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে, তোমার সামনে চিৎকার করে কাঁদি। আমাকে অবিশ্বাস করার আগে আমাকে বিদায় দিয়ো, তবু অবিশ্বাস কোরো না—এটা আমি মানতে পারব না।

এখানে প্রচণ্ড অভিমান আছে, দ্বিধা আছে, সংশয় আছে, ভয় আছে, লজ্জা আছে, পাবার ইচ্ছে আছে, সুতীব্র অপেক্ষার যন্ত্রণা আছে—সর্বোপরি, ভালোবাসা আছে। ভালোবাসার যন্ত্রণায় নীল হয়ে-যাওয়া দুটো প্রাণ একাত্ম হওয়ার জন্য ছটফট করলেও সব প্রতিবন্ধকতা তাদের থামিয়ে দেবে, হয়তোবা তারা নিজেরাই থেমে যাবে।

আমরা আর কেউ কাউকে লিখব না, রোদ্দুর। থাক, অপেক্ষা থাক, ভালোবাসা থাক, যন্ত্রণা থাক, যার যার ইচ্ছে থাক—আমরা আর এদের থেকে মুক্তি চাইব না।

এই আমারই প্রতিমুহূর্তে মেজাজ বদলায়—কখনো খুব জ্ঞানীর মতো কথা বলি, ভাবি, আবার কখনো বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি। কী যে বলতে চাইছি, বুঝতে পারছি না। আমরা লিখব না, ঠিক আছে?

যে মৃতপ্রায় গাছগুলো আমি বাঁচিয়েছি, তোমাকে একদিন দেখাব। আমার ভালোবাসার পবিত্রতা গাছেরা বোঝে। আমার শখের জায়গাটায় বসিয়ে তোমাকে এককাপ কফি খাওয়াব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, এটা করতে হবে। তুমি শুধু একটু সময় বের করো, আর আমি একটু সুযোগ।

আর যেন কী গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাইলাম! আচ্ছা থাক, গুরুত্বপূর্ণ বলে কিছু নেই।

এটা কী হলো! তুমি আমাকে শ্মশানে যাবার কথা বললে, আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাম। এ তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে গেলে! এটাও কি তৃতীয় শক্তি? এতটা কাছ থেকে কখনও তো দেখা হয়নি—তোমার চোখ, তোমার ঠোঁট, তোমার মুখ...এত কাছ থেকে! এত সুন্দর তুমি! তারপর এত আদর! এ আমরা কোথায় হারিয়ে গেলাম! এসব কি লেখা যায়! দুষ্টু ছেলে, তুমি যে আমাকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে নিলে—এরপরেও বলবে ছেড়ে যাবে? এই সুখে আমি তিনদিন তোমার সাথে কথা বলব না...যাও...

আর আসবই না, যাও।

আমাদের সম্পর্কের একমাত্র অন্ধকার দিক হলো—আমরা কেউ কাউকে জানাতে পারি না, কেমন আছি। আজ সবার ভালো থাকারই কথা, ছুটির দিন, পরিবার-পরিজন নিয়ে। আশা করছি, ভালো আছ।

তুমি যখন লেখো, মনে হয় তোমার ভেতর থেকে অন্য কেউ কথা বলে—গভীর, স্থির, অচেনা। এমন মানুষ বিরল, যার কথায় নীরবতাও অর্থ পায়। গ্রামে আছি বলে এখনও খানিকটা সময় আমার আছে। ঢাকায় ফিরলে এই অবসরটুকুও গিলে খাবে সংসার। মেয়েদের জীবনে অবসর বলে কিছু নেই, রোদ্দুর—যা পাওয়া যায়, ধার-করা। তবে এই ধারটুকু এখন বেশ মিষ্টি।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *