অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান (৬/২)


- কেমনে মুখে তুলবাম আমি! তোরা রান্ধিস না এগুলান আমার সামনে!
আগে যহনই রানতাম, তোরার বাপে আমার চাইরপাশত ঘুর ঘুর করত। তাইর আবার অভ্যাস খারাপ আছিল। খালি পাতিলত হাত ঢুকায় দিয়া খাইত। আর কইত, তোমার হাতের পোলাও'র সুবাস আমারে জান্নাতে লইয়া যায়, তুমি বুজোনা ক্যারে, সাভেরার মা!
এডি হুইনা আমার শরম করত। তোরার নানির সামনেতও ছারতো না হেই। আমার মায়ে কইত, আমগো জামাইডা অনেক বালা, তোরে প্রেম করে অনেক, হেরে দেইখা রাহিস। যহন যা খাইতে চায় খাইতে দিস।
আইজ যদি তোরার নানি বাঁইচা থাকত, হেই যদি হুনত, আমি তারে পোলাও রাইন্ধা খাওয়াইতে পারি নাই, বহুত গোস্‌সা হইত। মানুষ দুইডা আমারে একলা রাইখা গেলো গা। আমার কইলজা ফুড়ে, তারা বুজে না ক্যারে?

কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায়, দুঃখে মায়ের কণ্ঠ আড়ষ্ট হয়ে আসে। স্বর বেরোতে চায় না। বড়ো আপা, ছোটো আপাও খেতে চাইত না পোলাও। মেহমান এলে জোরপূর্বক বাসায় পোলাও রান্না হতো। তবে আমরা কেউ মুখে তুলতাম না। বাবাকে ভালোবাসি কি না আমি জানি না। তাঁর প্রতি আমার কোনো অনুভূতি আছে কি না, তা-ও জানি না। কিন্তু আমার গলা দিয়েও পোলাও নামতে চাইত না। বিষয়টা অদ্ভুত কি না, আমি সেটাও জানি না। তবে বাবা যেদিন মারা যাবেন, সেদিন রাতে বাবার যে-ভালোবাসা আমি পেয়েছি, তা কখনও ভুলতে পারব না। মাঝে মাঝে সেই প্রত্যেকটা মুহূর্ত ফিরে পেতে কেমন যেন লোভী হয়ে উঠি! কষ্ট লাগে, ঘেন্নাও হয় নিজের প্রতি। সেদিনই প্রথম আর সেদিনই কিনা শেষ!

ভালোবাসারও কত রকমফের হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি ভালোবাসা বুঝতেই পারি না, অনুভূতিই নেই আমার। এই যেমন বাবাকে ভালোবাসি কি না, এই পরিবারটাকে ভালোবাসি কি না আমি আদৌ বুঝে উঠতে পারি না। ঘোর প্যাঁচের মতন মনে হয় সব কিছু। আর কমলিকা! আমি কি ওকে ভালোবাসি? একসময় আমি বিয়ে করব, হয়তো সে কমলিকা নয়, অন্য কেউ হবে। আমি তাকে ভালোবাসব, কিন্তু কমলিকা! ওকে তো আমি ভুলতে পারব না, আমার প্রতি নেওয়া ওর প্রত্যেকটা যত্ন আমাকে ওর কথা মনে করিয়ে দেবে। তাকে দেখতে মতিঝিল আইডিয়ালের পেছনের কলোনিতে চলে যাওয়া, আমার সব আনন্দের সময় ওর কথা মনে পড়ে যাওয়া, আমার মাথায় বাদামের খোসা ফেলে তার বাঁধভাঙা হাসি, গাজীপুরে সেদিন পাহাড়ের পথে একসাথে চলা, তারপর ওকে ফেলে চলে আসা, প্রত্যেকটা স্মৃতি তার কথা মনে করিয়ে দেবে। তাহলে কি আমি ওকে ভালোবাসি? আর যদি ভালো না বাসি, তাহলে এই ভুলতে না পারাটা কি? বাবার আদর পেতে লোভী হয়ে উঠি কেন? এই পরিবারকে ছেড়ে থাকতে পারি না কেন? এসব তাহলে কী? আমি যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারি না!

আবার পরক্ষণেই মনে হয়, আমিই ভালোবাসা বুঝি—নাহার চৌধুরির ভালোবাসা। আমার জীবনে যে ভালোবাসার বড্ড আকাল! একটু ভালোবাসার জন্য, কাঙ্ক্ষিত হবার জন্য আমার যত লড়াই। তাহলে আমি ভালোবাসা বুঝি না, এ আবার কেমন কথা! কেউ কেউ বলে, এ শুধুই মায়া, ভালোলাগা কিংবা নিছকই পছন্দ করা। ভালোবাসা সহজ নয়। সত্যিই কি ভালোবাসা সহজ নয়? এই যে মায়া, ভালোলাগা বা পছন্দ…এই অনুভূতিগুলো একসাথে চলার জন্য যদি আরও খানিকটা সময় পায়, তাহলে এগুলো ভালোবাসাতেই রূপান্তরিত হয়, শেষগন্তব্য তো একটাই—ভালোবাসা। মায়া, ভালোলাগা, পছন্দ…এই অনুভূতিগুলো আমার মতোই অসহায়। তাদের সময়ের বড্ড অভাব। কেউ তাদের সময় দেয় না, তাই ভালোলাগা কখনো কখনো পছন্দ অবধি যেতে পারে, আবার কখনোবা পছন্দ মায়া অবধি পৌঁছয়, শেষগন্তব্যে তার আর যাওয়া হয় না। কিন্তু যারা তাড়াহুড়ো না করে সময় দেয়, তাদের অনুভূতিগুলো ঠিকই পরিপক্ব হয়, গন্তব্যে পৌঁছয়।

আমার কী মনে হয় জানেন, মানুষের জীবনের মূল অধ্যায় মূলত চারটা—এক, জন্ম। দুই, মৃত্যু। তিন, ভালোবাসা। চার, ঘৃণা। মানুষের গন্তব্যও এই চারচক্রে আবদ্ধ। জন্ম নিলে যেমন মৃত্যু অবধারিত, তেমনি জন্ম নিলে ভালোবাসতেই হবে, এটাও অবধারিত। থাকুক-না তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ, ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়। যে ভালোবাসতে পারে, সে ঘৃণাও করতে পারে; বরং যে প্রচণ্ড ভালোবাসতে জানে, সে-ই তার দ্বিগুণ ঘৃণা করতে পারে। যে সোহাগ করতে জানে, তারই শাসন করা সাজে। প্রত্যেকটা অনুভূতিরই বিপরীত দীর্ঘসূত্রতা থাকে। পৃথিবীতে বোধ হয় একদমই ভিন্ন ঘরানার হয়ে কেউ জন্মায়নি, অমন করে কিছুই সৃষ্টি হয়নি । ভালোবাসার ভেতরে ঘৃণার বীজবপন সহজ নয়, তবে অসম্ভব কিছুও নয়।

সময় এমন একটা ক্ষমতার নাম, যেটাতে অন্যকিছুর শাসন চলে না। সময় তার গতিবিধির কোনো কোনো পর্যায়ে এসে এমন কিছু পরিস্থিতির জন্ম দেয়, সেখানে ভালোবাসা ঘৃণাতে পরিণত হয়, আবার ঘৃণা ভালোবাসাতেও পরিণত হয়, কারণ মানুষের ভাবনা, বাস্তব আর পরিস্থিতি…এই তিনের মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকে। মানুষকে শুধু তার মস্তিষ্ক বা হৃদয় নিয়ন্ত্রণ করে না, সাথে আনন্দ, দুঃখ, ক্রোধ, আক্রোশ, অপূর্ণতা, হতাশা, জমিয়ে-রাখা আঘাত বা জমিয়ে-রাখা সুখ…এরকম অনেক কিছুই প্রভাবক হিসেবে যুক্ত হয়। এই জায়গাতে এসেই মানুষের ভাবনা আর পরিকল্পনার সাথে পরিস্থিতি আর সময়ের সংঘর্ষ বেধে যায়। এক্ষেত্রে ধৈর্য একটা বিশাল ভূমিকা পালন করে। যে ধৈর্য ধারণ করতে পারে, সে নিজের মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের সাথে এই দুইয়ের সাঙ্গোপাঙ্গ প্রভাবকদেরকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যেমন, আমি একটা সময় পযর্ন্ত ভাবতাম, আমি আমার বাবাকে ঘেন্না করি, ঠিক সে-ও আমাকে ঘেন্না করে। এই ভাবনার পেছনে একটাই ক্ষমতা দায়ী, তা হচ্ছে…’সময়’। তখন এমন সব পরিস্থিতির জন্ম সময় বাবাজি দিয়েছেন যে, ঘেন্না করতেই হতো আমাদের।

আমার ভাবনা আর বাহ্যিক দৃষ্টির সঙ্গে বাস্তবতা আর পরিস্থিতির গরমিল আমাকে সহজ-স্বাভাবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু এখন আমি বাবাকে ঘেন্না করি না আর, বরং মায়া হয় তার জন্য। আমি এ-ও জানি, সে-ও আমাকে ঘেন্না করে না। তবে ভালোবাসে কি না, তা জানি না, জানার অবকাশই পাইনি। সময় বদলে গেছে, সাথে পরিস্থিতি আর অনুভূতিগুলোও। ভালোবাসা, ঘৃণা এই অনুভূতিগুলো আসলে সময়ের খেলার পুতুল। আমাদের যে শুধুই দেরি হয়ে যায়, এই কথাটা সময়-বাবাজি বিলক্ষণ জানেন। তাই খেলাটা বেশ জমিয়েই খেলেন। সময়ের থেকে শক্তিশালী আর বুদ্ধিসম্পন্ন আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। ভাগ্যিস, সৃষ্টিকর্তা সময়ের অবয়ব দেননি!

একটা প্রশ্ন ভীষণ খোঁচাচ্ছে, তাই না।? ভাবছেন, তাহলে মানুষকে আর আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা কেন বলা হয়? আরে মশায়, সময়ের যে দুর্বলতা নেই, এমন ভাবছেন কেন? আগেই তো বলেছি, পৃথিবীতে অপরিবর্তনীয় বলে কিছু নেই। তার ঊর্ধ্বে সময়ও নয়। সময়ের দুর্বলতা কী, জানেন? সময় মৃত্যুতে থমকে যায়, কিন্তু মানুষের যাত্রা তখনও চলতে থাকে, আত্মার গমন সময় ঠেকাতে পারে না। এখানেই মানুষ শক্তিশালী সময়কে মাত দেয়, তাই তো মানুষ সৃষ্টির সেরা।

তবে আমি মানুষ হিসেবে সৃষ্টির সেরা কি না, এ বিষয়ে এখনও যথেষ্ট সন্দিহান। ভালোবাসতেই তো শিখিনি! অথচ ভালোবাসা পেতে আমার কত আয়োজন! আসলে মাকে দেখলেই আমার ভালোবাসার ভূত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন ভালোবাসা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি।

একটা চাদর, একটা চশমা, দুটো বই আর পুরোনো একটা মশারি—এটাই ভালোবাসা। এটাই যত্ন। হ্যাঁ, এটাই ভালোবাসা।